ছবি সংগৃহীত
সিরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে নতুন চুক্তি করেছে সৌদি আরব। পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির জ্বালানি, আবাসন, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতের পুনর্গঠনে ৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে রিয়াদ। বুধবার (৪ নভেম্বর) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়।
এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি আরব সফর করেন আল-শারা। তাঁর এবারের সফরে দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তিটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হিসেবে উল্লেখ করেছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।
এর কয়েক দিন আগেই সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানিয়েছিলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রস্তাবিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটে সিরিয়ার যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে দামেস্ক।
বাহরাইনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলন মানামা ডায়ালগে শনিবার তিনি বলেন, ‘মক্কা জোটে সিরিয়ার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি মূল্যায়নে আলোচনা চলছে।’
এদিকে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কাছে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক সামরিক সহায়তা চেয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
রিয়াদে বৈঠকে আল-শারা ও সৌদি যুবরাজ বর্তমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে দুই নেতা কথা বলেছেন।
তাঁরা উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি ও হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে-এমন সব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
আল-শারার স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার রিয়াদ সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সিরিয়ার রাজনৈতিক গবেষক আহমেদ কাসেম। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ব্যাপকতাও তুলে ধরছে।
কাসেমের মতে, সিরিয়ার মক্কা জোটে যোগ দেওয়া উচিত। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান ভূখণ্ডগত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দামেস্কের একটি কার্যকর প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রয়োজন।
পুনর্গঠনে ৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি সিরিয়ার পুনর্গঠনে অর্থায়নের বিষয়েও বড় সিদ্ধান্ত এসেছে। সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি উন্নয়ন তহবিল সিরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ছয়টি চুক্তির আওতায় ৪০ কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। সহজ শর্তে দেওয়া হবে এই অর্থ।
ঋণের মধ্যে ১০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে সিরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুনর্নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে। ক্ষতিগ্রস্ত আবাসন মেরামতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ কোটি ডলার। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে দেওয়া হবে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এ ছাড়া আলেপ্পোর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্বাসনে ৯ কোটি ডলার এবং দামেস্ক ও ইদলিবে সুপেয় পানির ব্যবস্থা উন্নয়নে ৩ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে।
এদিকে শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়েও আরও দুটি সমঝোতা স্মারক হয়েছে।
আসাদ সরকারের পতনের পর সৌদি-সিরিয়া সম্পর্ক
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর আহমেদ আল-শারা ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকে সিরিয়ার নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে ভূমিকা রাখছে সৌদি আরব।
গত ৬ অক্টোবর রিয়াদে দুই নেতার সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল। সিরিয়ার প্রেসিডেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও অর্থায়নের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সিরিয়ার অবস্থান ও আঞ্চলিক অংশীদারত্বের প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে।
সূত্র: রয়টার্স ও আলজাজিরা




