Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২০ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা, দ্বিতীয় মেয়াদে বড় সংকটে ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:২৮, ৫ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা, দ্বিতীয় মেয়াদে বড় সংকটে ট্রাম্প

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড জন ট্রাম্প ছবি সংগৃহীত

হোয়াইট হাউসে এখনো তাঁর অবস্থান অটুট, হাতে রয়েছে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতাও। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শোচনীয় পরাজয়ের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্বে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়টা তাঁর জন্য হয়ে উঠতে পারে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা।

মার্কিন রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে বলা হয় ‘লেম ডাক’ বা খোঁড়া হাঁস। অর্থাৎ, সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং নিজ দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ট্রাম্পের নির্বাচনি বিপর্যয়কে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ-দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ, আটকে যেতে পারে ট্রাম্পের পরিকল্পনা

নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ-দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাজেট অনুমোদন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ট্রাম্পকে বিরোধী দলের সঙ্গে কঠিন সমঝোতায় যেতে হবে।

নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে রিপাবলিকানদের সমর্থনই এত দিন ছিল ট্রাম্পের অন্যতম বড় শক্তি। সেই শক্তির জায়গায় এখন বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় হোয়াইট হাউসের জন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে নতুন চ্যালেঞ্জ।

প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে তদন্ত, বাড়ছে অভিশংসনের ঝুঁকি

ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার অর্থ শুধু আইন প্রণয়নে বাধা নয়, প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও। ট্রাম্প সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিরোধী দলের নেতারা।

বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত তদন্ত পরিচালনার বিষয় এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো শুনানি আয়োজন, সরকারি নথি তলব এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে।

রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে অভিশংসন উদ্যোগের মাধ্যমে। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসন প্রস্তাব আনতে পারেন। সেই প্রস্তাব পাস হলেও প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

নিজের দলেই কমতে পারে ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য

রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ গত কয়েক বছর ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনি কৌশল কিংবা দলের রাজনৈতিক অবস্থান-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর মতামত বিশেষ গুরুত্ব পেত।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের বড় পরাজয় দলের ভেতরে নতুন করে নেতৃত্বের প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই রিপাবলিকান শিবিরে উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রতিযোগিতা জোরালো হতে পারে।

দলের নেতাদের একটি অংশ ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাঁর দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র কর্তৃত্বও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ইরান যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতিতে ক্ষুব্ধ ভোটার, ভরাডুবির কারণ কী?

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়া এবং সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।

ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তাঁর দলের নির্বাচনি ক্ষতি হয়েছে। যদিও সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মানতে রাজি হননি তিনি।

ডেমোক্র্যাটদের জয়ে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এবারের ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নরের দায়িত্ব পালনের পথ তৈরি হয়েছে। জর্জিয়ায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর এবং নিউ মেক্সিকোতে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

সিনেটে প্রথম আদিবাসী ও মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও এবারের নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে উঠে এসেছে।

ক্ষমতা থাকছে, কিন্তু আগের মতো প্রভাব থাকবে কি?

নির্বাচনি পরাজয় ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে না। নির্বাহী আদেশ জারি, ভেটো প্রয়োগ এবং পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকবে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত তারা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আগামী দুই বছর হতে পারে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে টানাপোড়েনের সময়।

ট্রাম্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-নিজের অবশিষ্ট ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করবেন, নাকি বিরোধী দলের তদন্ত, নীতিগত বাধা এবং নিজ দলের নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হবে। দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই পরীক্ষায় কতটা সফল হন তার ওপর।

Walton
Walton