Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২০ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬

শক্তিশালী ইরান গড়ায় পরম প্রতিরোধ সক্ষমতা জরুরি: মোজতবা খামেনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:১৩, ৫ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১১:১৫, ৫ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

শক্তিশালী ইরান গড়ায় পরম প্রতিরোধ সক্ষমতা জরুরি: মোজতবা খামেনি

ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। ছবি সংগৃহীত

সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ইরানকে ক্রমাগত আরও শক্তিশালী করে তোলাই ‘পরম প্রতিরোধ সক্ষমতা’ অর্জনের একমাত্র পথ বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সামাজিক সম্প্রীতিকে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

৪ নভেম্বর ইরানের ‘বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম দিবস’ উপলক্ষে বুধবার দেওয়া এক বার্তায় এসব কথা বলেন মোজতবা খামেনি। তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী ইরান গড়ে তোলার অভিযাত্রায় জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সংহতির কোনো বিকল্প নেই। জনগণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কথাবার্তা ও কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই চেতনার প্রতিফলন থাকতে হবে।

বার্তায় তিনি বলেন, ‘পরম প্রতিরোধ সক্ষমতার পর্যায়ে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো সার্বিক অগ্রগতির পথে ইরানকে ক্রমাগত আরও শক্তিশালী করার কৌশল অব্যাহত রাখা। এই যাত্রায় ঐক্য, সংহতি ও সামাজিক সম্প্রীতিই সাফল্যের প্রধান উপাদান।’

মোজতবা খামেনির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু ৪ নভেম্বর নয়, বছরের প্রতিটি দিন ও ঘণ্টাই ‘মহাশয়তানের’ বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সংগ্রামের অংশ হয়ে উঠেছে।

পারস্য উপসাগরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অজেয় হওয়ার প্রচলিত ধারণার অসারতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে নিজ জনগণের পরিবর্তে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল সরকারগুলোর দুর্বলতা এবং তাদের রক্ষায় বড় শক্তিগুলোর অনাগ্রহও সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অপরাধের জবাবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর দাবি, তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রাথমিক প্রতিরোধের সূচনা।

মার্কিন আগ্রাসন আবার ঘটলে পাল্টা জবাবের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর তৎপরতা এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঐক্যকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে তুলে ধরেন মোজতবা খামেনি। তাঁর মতে, এসব ঘটনা সত্যের পক্ষে থাকা শক্তিগুলোর উত্থান এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, সত্যের পক্ষে থাকা শক্তিগুলো আল্লাহর ওপর আস্থা, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের চেতনায় অটল থাকলে প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তি যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও দলীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে-এমন প্রত্যাশারও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিয়ে দেশটির বৈরিতা বন্ধ করা যাবে বলে যারা মনে করেন, তারা গুরুতর ভুল করছেন।

মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানি জনগণের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লক্ষ্য। আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে সামান্যতম নতি স্বীকারও শহীদদের রক্ত এবং জনগণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্যকে নষ্ট করতে পারে। এতে প্রতিপক্ষ আরও বড় দাবি ও আগ্রাসনে উৎসাহিত হবে।

সাত দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার ইতিহাস তুলে ধরে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, এর শিকড় সাত দশকেরও বেশি পুরোনো। ১৯৫৩ সালের আগস্টে ইরানে সংঘটিত অভ্যুত্থানকে তিনি দেশটির ওপর মার্কিন নিপীড়নের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

তাঁর দাবি, ইরানের জাতীয় সম্পদ, বিশেষ করে তেলসম্পদের ওপর লুটপাট অব্যাহত রাখতেই ওই অভ্যুত্থানের আয়োজন করা হয়েছিল। ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের আগপর্যন্ত পরবর্তী কয়েক দশকেও মার্কিন শাসকেরা ইরানের সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়েছে।

মোজতবা খামেনি বলেন, ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সাভাক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে দেশটিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী বিরোধী আন্দোলন দমনে আরও স্বাধীনতা পায়। ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের প্রাক্কালেও ওয়াশিংটন তাদের ওপর নির্ভরশীল সরকারকে টিকিয়ে রাখতে নানা পরিকল্পনা করেছিল।

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, অভ্যুত্থান-পরিকল্পনাকারী এবং মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে) সংগঠনকে মার্কিন সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, এসব গোষ্ঠীর হামলায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বহু বিজ্ঞানী, রাজনীতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম হোসেন সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সমর্থন, ইরানের বেসামরিক উড়োজাহাজের যাত্রীদের হত্যার ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ইরানে দাঙ্গা ও অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়া, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং বিভিন্ন দেশে ইরানি জনগণের সম্পদ জব্দ করার অভিযোগও তোলেন মোজতবা খামেনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক আগ্রাসনে ইরানের বহু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নবজাতক, শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণরাও রয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

মোজতবা খামেনি বলেন, প্রতিটি পর্যায়েই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীরা ইরানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দেশটির জনগণকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করেছে।

তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন এখন আন্তর্জাতিক আচরণের প্রচলিত রীতিনীতি ও বাহ্যিক শিষ্টাচারও আর মানছে না। প্রকাশ্যেই ইরানকে বিভক্ত করা, জনগণকে বশীভূত করা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং দেশটির প্রাচীন ও স্বতন্ত্র সভ্যতা ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবারই ইরানের জনগণের দৃঢ় অবস্থান ও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, মার্কিন ভুল হিসাব ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণে দেশটির জনগণের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল সরকারগুলোকেও বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতনের দাবি
মোজতবা খামেনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত নয়; এটি ধারাবাহিক প্রতিরোধের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর তৎপরতা মার্কিন আধিপত্যের অবক্ষয় ও নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর নিজেদের সৃষ্ট লজ্জা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের ক্রমাবনতি-দুই ক্ষেত্রেই তাদের শক্তি অপূরণীয় পতনের মুখে পড়েছে। এই পতনের প্রক্রিয়াও দ্রুততর হচ্ছে।’

তাঁর বক্তব্য, আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর ঐক্য, আত্মত্যাগ ও অবিচল অবস্থান সত্যের পক্ষে থাকা শক্তিগুলোর চূড়ান্ত বিজয়ের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।

জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের প্রতি আহ্বান
ইরানকে শক্তিশালী করার কৌশল বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি জনগণের প্রতি সরকারের দায়িত্বের বিষয়টিও সামনে আনেন সর্বোচ্চ নেতা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের প্রতি জনগণের সমর্থন যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনগণের সেবা, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো এবং বস্তুগত ও আত্মিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।

মানুষের জীবিকা, স্বাচ্ছন্দ্য, উন্নয়ন, মর্যাদা ও স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।

দেশটির ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অগ্রণী শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন মোজতবা খামেনি। তাঁর মতে, হতাশা, নিরাশা ও অসম্ভবের ধারণাকে জয় করে তরুণদের ‘আশা ও আমরা পারব’-এই মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

এ জন্য জ্ঞান, ধর্মীয় অনুশাসন, দক্ষতা, নৈতিকতা, দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি উচ্চাভিলাষী জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

মোজতবা খামেনি আরও বলেন, ইসলামি শিক্ষার আদর্শ, ইসলামি বিপ্লবের নীতি এবং প্রজ্ঞাবান নেতাদের চিন্তাধারা থেকে ইরানি জনগণ বহু শিক্ষা পেয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনি এবং শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আদর্শের কথাও এ প্রসঙ্গে তুলে ধরেন তিনি।

তাঁর দাবি, ঐশী প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে এই পথের যথার্থতা সম্পর্কে ইরানি জনগণের বিশ্বাস দিন দিন আরও দৃঢ় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনগণের বিশ্বাস, ধৈর্য ও আত্মত্যাগই তাদের অর্জনের ভিত্তি।

বার্তার শেষাংশে আল্লাহর অনুগ্রহ এবং ইমাম মাহদির দোয়ার মাধ্যমে ইরানি জনগণের বিজয়, সমৃদ্ধি ও সার্বিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ‘মহাশয়তান’ হিসেবে অভিহিত যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতন আরও দ্রুত হবে বলে আশা জানান।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মাআরিজের ৬ ও ৭ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘তারা একে সুদূর মনে করে, আর আমরা একে নিকটবর্তী দেখি।’

Walton
Walton