Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ১৯ ১৪৩৩, বুধবার ০৪ নভেম্বর ২০২৬

শিক্ষার্থীদের স্কুল অবরোধ, ফ্রান্সে বৃহৎ ধর্মঘটের ডাক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:০১, ৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

শিক্ষার্থীদের স্কুল অবরোধ, ফ্রান্সে বৃহৎ ধর্মঘটের ডাক

ছবি সংগৃহীত

ফ্রান্সে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দেশজুড়ে কয়েক ডজন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সময়ে দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলো বৃহস্পতিবারের দেশব্যাপী ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দুই সপ্তাহের শরৎকালীন ছুটি শেষে সোমবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর নতুন করে আন্দোলনে সক্রিয় হন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ বাড়ানো।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার ফ্রান্সের মোট ৩ হাজার ৭০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৮টি অবরোধ করা হয়। প্যারিস, রেন ও লিয়নসহ বিভিন্ন শহরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কর্মসূচি পালিত হয়। তবে শিক্ষার্থী সংগঠন ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেনের (ইউএসএল) দাবি, অবরোধের সংখ্যা ৫০০।

এ ছাড়া দেশটির ১৮৪টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫১টিতে আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আন্দোলন দমনে পুলিশের কঠোর অবস্থানের অভিযোগ তুলেছে ইউএসএল। সংগঠনটির দাবি, বিভিন্ন স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীদের দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে রাখা হয়েছে এবং দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সংগঠনটির একজন প্রতিনিধি বলেন, বৃহস্পতিবারের নতুন অবরোধ কর্মসূচি ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘট ঠেকাতেই কর্তৃপক্ষ আন্দোলনের গতি কমানোর চেষ্টা করছে।

উত্তর-পশ্চিম প্যারিসের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ভোট দেওয়ার অধিকারও নেই। কিছু করার সুযোগও নেই। নিজেদের দাবি জানানোর এটাই আমাদের একমাত্র পথ।’

এদিকে প্যারিসসহ ফ্রান্সের আরও কয়েকটি শহরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করেছেন।

‘অন্য কোনো উপায় কাজ করেনি’
শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের এখন পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেওয়া তাদের একটি মৌলিক অধিকার-শিক্ষার অধিকার-থেকে বঞ্চিত করার শামিল।’ আন্দোলন চলাকালে কয়েকজন শিক্ষাকর্মী আবারও সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেন শহরে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী ব্রেকিনিয়ি হাইস্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করেন। এটি ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কর্মসূচি চলাকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্কুল প্রশাসনের এক সদস্যের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তোমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ নও।’

জবাবে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা এই কর্মসূচি নিয়েছি, কারণ এর আগে যা যা চেষ্টা করেছি, তার কোনোটিই কাজে আসেনি।’

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তুলুজ শহরের একটি স্কুলেও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমরা ক্ষুব্ধ, তবে উগ্র ডানপন্থী নই।’ আরেকটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তরুণেরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।’ উগ্র ডানপন্থাবিরোধী একটি জনপ্রিয় প্রতিবাদী গানের কথার সঙ্গে মিল রেখে এই স্লোগান দেওয়া হয়।

দ্রব্যমূল্য ও সরকারি সেবার সংকটেও বাড়ছে ক্ষোভ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন ফ্রান্সের বৃহত্তর জনঅসন্তোষের অংশ হয়ে উঠেছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার ঘাটতির প্রতিবাদে গত তিন সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

গত ১৭ অক্টোবরের আন্দোলনে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

ফ্রান্সের এই শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রভাব ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালি ও স্পেনের শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের কর্মসূচিতে উৎসাহিত হয়েছেন। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফরাসি শব্দ ‘ব্লোকুস’ (অবরোধ) এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গত সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের কিছু দাবি বিবেচনায় নিয়ে নতুন সংস্কার উদ্যোগের ঘোষণা দেয় ফরাসি সরকার। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রচলিত প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তনের পরিকল্পনা। ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে সরকারের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, শিক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করতে হবে। ঘোষিত সংস্কার পরিকল্পনা তাঁদের প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট নয় বলেও মনে করছেন শিক্ষার্থী নেতারা।

বিশ্ববিদ্যালয়েও অবরোধ, গ্রেপ্তার তিন কিশোর
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স বর্তমানে মন্দার আশঙ্কার মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণ কমানোর চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। ফলে শিক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

শিক্ষার্থী সংগঠন ইউনিয়ন এত্যুদিয়ঁর দাবি, মঙ্গলবার দেশটির প্রতি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিতে আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে। ৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অবরোধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

উত্তর ফ্রান্সের লিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী সাইকেল ও ময়লার পাত্র ব্যবহার করে ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ আটকে দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বাতিল করতে হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী গথিয়ে কাপিয়েজ বলেন, ‘দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন চলছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রচলিত ব্যবস্থা পারকুরসুপ বাতিলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আগামী বছর যদি আমরা পারকুরসুপসহ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে এই আন্দোলন সার্থক হবে।’

গত সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটেছে।

মঙ্গলবার কর্তৃপক্ষ জানায়, অক্টোবরে পশ্চিমাঞ্চলীয় নঁত শহরের একটি স্কুলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিন অপ্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ওই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

Walton
Walton