ছবি সংগৃহীত
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আকাশপথে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) একের পর এক বোমা হামলার হুমকিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয়। বন্ধ রাখা হয় পোল্যান্ডের ওয়ারশর একটি বিমানবন্দর। ইতালিতে রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটকে পাহারা দিয়ে রোমের বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয় দেশটির বিমানবাহিনী।
তবে তদন্ত ও তল্লাশির পর সব কটি হুমকিই ভুয়া বলে নিশ্চিত হন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কোনো উড়োজাহাজেই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। সব ফ্লাইট নিরাপদে অবতরণ করেছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত সাতটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট এবং ইসরায়েলগামী একটি প্রমোদতরিকে লক্ষ্য করে এসব হুমকি দেওয়া হয়। আক্রান্ত উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে ছিল রায়ানএয়ার, উইজ এয়ার, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনস এবং পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা লটের ফ্লাইট। সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়ে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা রায়ানএয়ার। বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া তাদের চারটি ফ্লাইটকে লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হয়।
এসব হুমকির দায় কেউ স্বীকার করেনি। কোনো দেশ বা পক্ষকে দায়ীও করেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এর আগের দিনও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। আকাশে থাকা অবস্থায় বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর বুলগেরিয়াগামী একটি উড়োজাহাজকে গতিপথ পরিবর্তন করে হাঙ্গেরিতে অবতরণ করতে হয়েছিল।
ওয়ারশতে বিমানবন্দর বন্ধ, অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ
পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশগামী দুটি ফ্লাইট বোমা হামলার হুমকি পায়।
কোপেনহেগেন থেকে আসা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইনসের এসকে৭৫১ ফ্লাইটটি ওয়ারশ শপিন বিমানবন্দরে স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে। তবে উড়োজাহাজটি পরীক্ষা করার জন্য বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
বিমান সংস্থাটির মুখপাত্র আলেক্সান্দ্রা লিন্ডগ্রেন কাউকজি পোলিশ সংবাদ সংস্থা পিএপিকে বলেন, যাত্রীরা স্বাভাবিক নিয়মেই উড়োজাহাজ থেকে নেমেছেন। জরুরি অবতরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিষয়টি পোলিশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ওয়ারশর শপিন বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা ছিল পোল্যান্ডের লট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের। নিরাপত্তা সতর্কতার কারণে সেটিকে শহরের দ্বিতীয় বিমানবন্দর ওয়ারশ মডলিনে পাঠানো হয়। পরে সতর্কতা জারির পর মডলিন বিমানবন্দরও বন্ধ রাখা হয়।
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে। মডলিন বিমানবন্দরের মুখপাত্র আদাম শাবলোভস্কি বলেন, ‘কিছুই পাওয়া যায়নি।’ পরে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু হয়।
রায়ানএয়ারের উড়োজাহাজ পাহারায় ইতালির যুদ্ধবিমান
ইতালিতে ডাবলিন থেকে রোমগামী রায়ানএয়ারের এফআর৯৬১১ ফ্লাইটটিকে পাহারা দিয়ে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে নিয়ে যায় দুটি ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান। স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে উড়োজাহাজটি নিরাপদে অবতরণ করে বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
ইতালির বিমানবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, বেসামরিক একটি উড়োজাহাজে সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকির খবর পাওয়ার পরপরই তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
এর আগে লিসবন থেকে আসা রায়ানএয়ারের আরেকটি ফ্লাইট সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে একই বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেটিতেও বোমা শনাক্তের বিশেষ নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। যাত্রী, মালপত্র ও উড়োজাহাজ পরীক্ষা করে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। পরে সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয় বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
স্পেন ও বুলগেরিয়াতেও তল্লাশি
স্পেনের জাতীয় বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা এইনা জানায়, ম্যানচেস্টার থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটে বোমা থাকার খবর পাওয়ার পর জরুরি নিরাপত্তা প্রটোকল চালু করা হয়।
উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে কোনো ধরনের বিপত্তি ছাড়াই মুরসিয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় ইতালির বার্গামো থেকে আসা উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট অবতরণের পর তল্লাশি চালানো হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ তথ্য জানান। একই সময়ে ডাবলিন থেকে সোফিয়াগামী রায়ানএয়ারের আরেকটি ফ্লাইটও হুমকির মুখে পড়ে বলে জানিয়েছে বুলগেরিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয়। দুটি উড়োজাহাজের কোনোটিতেই বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি।
সোমবার লন্ডনের লুটন বিমানবন্দর থেকে সোফিয়াগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইটেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। মাঝ আকাশে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর সেটিকে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হাঙ্গেরির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোমুলুস রুসিন-সেন্দি ফেসবুকে জানান, ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা সতর্কতা ব্যবস্থায় ওই ফ্লাইট সম্পর্কে সংকেত পাওয়া যায়। খবর পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাঙ্গেরির গ্রিপেন যুদ্ধবিমান আকাশে উড়ে যায় এবং উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে অবতরণে সহায়তা করে।
যুক্তরাজ্যে হিথ্রো ও ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরেও সতর্কতা
যুক্তরাজ্যের লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল অথবা সেখানে অবতরণের কথা ছিল-এমন চারটি উড়োজাহাজকে লক্ষ্য করে হুমকির খবর পেয়েছে তারা। ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমানবন্দর ঘিরে সতর্কতা জারি করা হয়।
ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরের একটি ফ্লাইট নিয়েও আলাদা হুমকির তথ্য পায় পুলিশ। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তারা জানায়, কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত হয়নি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলগামী প্রমোদতরিতেও বোমার হুমকি
মঙ্গলবার রাতে গ্রিসের কোস্টগার্ড জানায়, বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর সাইরোস দ্বীপের উপকূলে নোঙর করা পানামার পতাকাবাহী প্রমোদতরি ‘ক্রাউন আইরিস’ থেকে যাত্রী ও নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
জাহাজটিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। এটি ইসরায়েলের হাইফা বন্দরের উদ্দেশে যাচ্ছিল। তল্লাশি চালিয়ে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা কার্যক্রম শেষে জাহাজটির আবার যাত্রা শুরু করার কথা ছিল।
ইউরোপে ‘হাইব্রিড হামলা’ নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বোমা হামলার হুমকিগুলোর জন্য কোনো দেশকে দায়ী করেনি ইউরোপের কোনো সরকার। তবে এমন ঘটনা ঘটল এমন এক সময়ে, যখন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘হাইব্রিড হামলা’ ও নাশকতামূলক তৎপরতার অভিযোগ তুলছেন। মস্কো ও তেহরান-দুই দেশই এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চলতি সপ্তাহেই ইউরোপের কয়েকটি দেশের সুপারমার্কেটে সাইবার হামলার কারণে ফ্রিজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভুয়া বোমা হামলার হুমকিও কম খরচে এবং দায় অস্বীকারের সুযোগ রেখে পরিচালিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
বিমান চলাচলের ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনসের বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান রিস জোনস বলেন, এক দিনে সাতটি নিশ্চিত বোমা হামলার হুমকিতে ফ্লাইট আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ব্যতিক্রমী।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট দেশ, বিমান সংস্থা কিংবা রুটকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। এতে মনে হচ্ছে, বিমান চলাচলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটানোই এসব হুমকির মূল উদ্দেশ্য।’
সূত্র: আলজাজিরা, এএফপি ও রয়টার্স




