Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২০ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার ০৫ নভেম্বর ২০২৬

মৌমাছির চাকই যেন জীবন্ত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা

প্রকাশিত: ১২:০৭, ৫ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

মৌমাছির চাকই যেন জীবন্ত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা

ছবি সংগৃহীত

মৌমাছির চাক শুধু তাদের আবাসস্থল নয়, রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এটি একটি সুসংগঠিত প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চাকের ভেতরে মধু, মোম ও উদ্ভিদজাত আঠালো পদার্থ প্রপোলিস এমন সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে থাকে, যা পুরো মৌ-উপনিবেশকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। গবেষকদের ভাষায়, একটি মৌমাছির চাক কার্যত জীবন্ত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মতো কাজ করে।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসংশ্লিষ্ট এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মৌমাছির রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা তাদের আশপাশের পরিবেশ ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যের ওপরও নির্ভরশীল। কোন এলাকায় কী ধরনের গাছপালা রয়েছে, তার প্রভাব পড়ে মৌমাছির সংগ্রহ করা উপাদানের রাসায়নিক গঠন এবং সেগুলোর জীবাণুনাশক ক্ষমতার ওপর।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক ড. কেনিয়া ফার্নান্দেস বলেন, ‘মৌমাছির চাক শুধু তাদের থাকার জায়গা নয়। এটি তাদের কর্মস্থল, খাবারের জায়গা, এমনকি হাসপাতালও। এবার এর সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কথাও যোগ করা যায়।’

চাকের ভেতরে স্তরে স্তরে প্রাকৃতিক সুরক্ষা
গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে থাকা চাকের অংশগুলোতে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে মধুতে শক্তিশালী জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি প্রপোলিসও বাড়তি সুরক্ষা দেয়। মৌমাছি গাছপালা থেকে এই আঠালো পদার্থ সংগ্রহ করে চাকের ফাটল ও ছোট ছোট ছিদ্র বন্ধ করতে ব্যবহার করে।

মধুতে থাকা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এবং প্রপোলিসে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড নামের উদ্ভিদজাত রাসায়নিক যৌগ এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম উপাদান।

চাকের আরও গভীরে, যেখানে ডিম পাড়া হয় এবং লার্ভা বেড়ে ওঠে, সেখানে প্রতিরক্ষার ধরন কিছুটা আলাদা। মৌমাছির মোমের তৈরি মৌচাক, সংরক্ষিত পরাগরেণু এবং মৌমাছির শরীর থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উপাদান ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে উপকারী অণুজীবের বেঁচে থাকার পরিবেশও তৈরি করে।

ফার্নান্দেস বলেন, ‘চাকের কেন্দ্রের দিকে এগোলে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা আরও নির্দিষ্ট হয়ে ওঠে। মোমের কোষ, সংরক্ষিত পরাগরেণু এবং মৌমাছির নিজস্ব দেহ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাককে আটকে দিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি উপকারী অণুজীবের উপস্থিতিও বজায় রাখে।’

মধু, মোম ও প্রপোলিসের আলাদা আলাদা জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্যের কথা বিজ্ঞানীদের আগে থেকেই জানা ছিল। তবে নতুন গবেষণায় চমকপ্রদ বিষয় হলো, চাকের ভেতরে এসব উপাদানের অবস্থান কোনো আকস্মিক বিন্যাস নয়। বরং এগুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে ডিম, লার্ভা এবং মৌমাছির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত গাঁজানো পরাগরেণু সুরক্ষিত থাকে।

আশপাশের গাছপালার ওপর নির্ভর করছে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ISME Communications(আইএসএমই কমিউনিকেশনস) সাময়িকীতে। এতে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের টোকাল কলেজের পাঁচটি মৌমাছি পালনকেন্দ্রের ২৪টি মৌ-উপনিবেশ পরীক্ষা করেন গবেষকেরা।

তারা মধু, পরাগরেণু, মৌমাছির মোম ও প্রপোলিসের রাসায়নিক গঠন এবং জীবাণুর বিরুদ্ধে সেগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি মৌমাছির পরিপাকতন্ত্রে থাকা অণুজীব এবং তাদের শরীরের বিভিন্ন টিস্যু ও নিঃসৃত পদার্থের জীবাণুনাশক ক্ষমতাও পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, চাকের বিভিন্ন উপাদানে থাকা অনেক অণুজীবের উৎস সম্ভবত ফুলের মধুরস। আবার যেসব মৌ-উপনিবেশ স্থানীয় প্রাকৃতিক বনভূমির কাছাকাছি ছিল, সেগুলোর রাসায়নিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় কৃষিজমির আশপাশে থাকা উপনিবেশগুলোর তুলনায় পার্থক্য পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ধারণা, মৌমাছি খাদ্য সংগ্রহের সময় যেসব উদ্ভিদের সংস্পর্শে আসে, সেগুলোর বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্য চাকের সুরক্ষামূলক উপাদানের গঠনকে প্রভাবিত করে।

গবেষণার সহলেখক এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রাথমিক শিল্প ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিভাগের (ডিপিআইআরডি) মৌমাছিবিষয়ক কারিগরি বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ ফ্রস্ট বলেন, ‘এই গবেষণা দেখাচ্ছে, মৌমাছির সুস্থ উপনিবেশের সঙ্গে সুস্থ বাস্তুতন্ত্রের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বনভূমি উজাড় এবং নিবিড় কৃষিকাজের কারণে নীরবে মৌমাছির প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।’

তাঁর মতে, মৌমাছির সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে বৈচিত্র্যময় ফুল ও উদ্ভিদসমৃদ্ধ আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি।

ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা বেশি কার্যকর
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, চাকের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছত্রাকের তুলনায় ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বেশি কার্যকর। তাঁদের ধারণা, মৌমাছির জন্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ বড় ধরনের হুমকি হওয়ায় বিবর্তনের ধারায় এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এমন বৈশিষ্ট্য পেয়েছে।

এর একটি উদাহরণ আমেরিকান ফাউলব্রুড। এটি অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা মৌমাছির লার্ভাকে মেরে ফেলতে পারে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে একটি সম্পূর্ণ মৌ-উপনিবেশও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

ফ্রস্ট বলেন, ‘ভারোয়া মাইটের মতো সরাসরি হুমকির কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু পরোক্ষ বিপদগুলো নিয়ে সচেতনতা কম। সুস্থ বাস্তুতন্ত্র সংকুচিত হলে তার প্রভাব একের পর এক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভিদবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পরিবেশ মৌমাছিকে রোগের বিরুদ্ধে আরও সহনশীল করে তুলতে পারে।’

অন্য সামাজিক পতঙ্গের মধ্যেও কি রয়েছে একই ব্যবস্থা?
গবেষণাটিতে ইউরোপীয় মধু মৌমাছিকে নিয়ে কাজ করা হলেও এর ফলাফল অন্য সামাজিক পতঙ্গের ক্ষেত্রেও নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করেছে। ফার্নান্দেস এখন অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় হুলবিহীন মৌমাছির বাসায় একই ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করতে চান।

পাশাপাশি পিঁপড়া ও উইপোকার মতো সামাজিক পতঙ্গ, যারা জটিল কাঠামোর বাসা তৈরি করে, তাদের মধ্যেও এমন ব্যবস্থা কাজ করে কি না, তা জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।

গবেষক ফার্নান্দেস বলেন, ‘স্থানীয় হুলবিহীন মৌমাছি, পিঁপড়া ও উইপোকার মতো অন্যান্য সামাজিক পতঙ্গের বাসাতেও একই ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখতে চাই।’

২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর ISME Communications (আইএসএমই কমিউনিকেশনস) সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম ‘Spatially organized chemical defences shape microbial communities in honey bee colonies’(মৌমাছির কলোনিতে স্থানিকভাবে বিন্যস্ত রাসায়নিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অণুজীব সম্প্রদায়কে রূপ দেয়) । গবেষণাটিতে কেনিয়া ই. ফার্নান্দেস, আভিভা লেভিনা, এলিজাবেথ এ. ফ্রস্ট ও ডি. এ. কার্টার অংশ নেন।

গবেষণার ফলাফল বলছে, মৌমাছির অস্তিত্ব রক্ষায় শুধু তাদের নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা নয়, আশপাশের পরিবেশের সুস্থতাও সমান জরুরি। প্রাকৃতিক উদ্ভিদবৈচিত্র্য কমে গেলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মৌ-উপনিবেশের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

Walton
Walton