শিল্পী শওকত আরা আঁখি। ছবি: সংগৃহীত
সংগীত চর্চায় প্রায় চার দশক পার করেছেন শওকত আরা আঁখি। স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে মাতিয়ে রাখা এই শিল্পী বেতার ও টেলিভিশনেও বহুবার তাঁর সংগীত প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। সংসার আর পরিবারের পিছুটানকে পাশে ঠেলে অবিরাম সংগীতে চর্চার জন্য তাঁর সংগ্রাম অতুলনীয়। মূলধারার বিশিষ্ট সংগীত গুরুদের তালিম, অকুণ্ঠ সমর্থন ও একাধিক সংগীত বিদ্যাপীঠের স্বীকৃতিসনদ আঁখির অর্জনের পাল্লা ভারী করেছে বটে কিন্তু শিল্পী হিসেবে যোগ্য সমাদর এনে দিতে পারেনি।
সংগীত পরিমণ্ডলে এই সমাদরের মানদণ্ড যখন কেবল গায়ন প্রতিভা নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের প্রশংসায় ভাসানো-তখন অনেক গুণী শিল্পীও বিবেচিত হন অযোগ্য বলে। শওকত আরা আঁখির ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। জন্মের ৫০তম জন্মবর্ষে দাঁড়িয়ে আত্মমূল্যায়নের খাতা খুলে অজস্র অর্জনের পাশে উপেক্ষাই যেন বেশি দেখতে পান আঁখি। কিন্তু তা সত্ত্বেও অদম্য এ শিল্পী সংগীতকে উপেক্ষা করেননি। প্রাত্যহিক ও বৃহত্তর জীবনে সংগীতচর্চা আজও তাঁর নিত্যসহচর।
মোহাম্মদ মোতাহার হোসেন চৌধুরী ও সাহানা আক্তার দম্পতির কন্যা আঁখি লালমাটিয়া মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তখন কয় ঘরের মেয়েরাই বা গান জানতো? আঁখির সংগীতে হাতেখড়ি ১৯৮৩ সালে খন্দকার মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। পরবর্তীতে তিনি খায়রুন্নাহার পান্না, সুধীন দাশ, সোহরাব হোসেন ও বেদার উদ্দিন আহমেদের মত কিংবদন্তি শিল্পীর কাছ থেকে নজরুল সংগীতে প্রত্যক্ষ তালিম পান। মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কাছ থেকে লোক সংগীতে ও আখতার সাদমানীর কাছ থেকে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন আঁখি।
নজরুল একাডেমি থেকে নজরুল ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে ৫ বছর মেয়াদী কোর্স সম্পন্ন করে তিনি কবি নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে নজরুল সংগীতের ওপর ডিপ্লোমা কোর্সও সম্পন্ন করেন। ১৯৯৯ সালে বেতারে শিল্পী হিসেবে অন্তর্ভূক্তির পর ২০০১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনেও অভিষেক হয় আঁখির। সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতারে নজরুল সংগীত ও আধুনিক গানের বিশেষ শ্রেণির (স্পেশাল গ্রেড) শিল্পী হিসেবেও অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন তিনি।
সংগীত শিল্পী হিসেবে এমন বর্ণাঢ্য অভিষেকের পরেও কেন পেশাদার সফল শিল্পীদের মত সমান গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারমাধ্যম কিংবা সংগীত সভাগুলোতে ডাকা হয়নি আঁখিদের সেই বৃত্তান্ত বেশ মর্মস্পর্শী। বহুমাত্রিক.কমকে দেওয়া নাতিদীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে নিজের না বলা তেমনি অনেক কথা বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে
‘তোষামোদীতে আমাদের চারপাশ ভরে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তাব্যক্তিদের মিথ্যে প্রশংসায় ভাসাতে না পারলে শিল্পীদের ডাকা হয় না-এটা এক রকম রেওয়াজ হয়ে গেছে। কেউ কেউ নেহায়েৎ নিজেকে কায়দা করে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে ভিন্ন কথা। কিন্তু যাঁরা কায়দা জানেন না তাদের পড়ে থাকতে হয় অনাদরে’-নিজের দুঃখের কথা এভাবেই বলছিলেন শওকত আরা আঁখি।
ক্ষোভ সঙ্গে এই শিল্পী বলেন, ‘আশির দশকেই শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চে পা বাড়িয়েছিলাম। সংগীত গুরুরূপে পেয়েছিলাম অনেক বিখ্যাত সংগীতজ্ঞদের। তাদের থেকে পাওয়া জ্ঞান ও আশীর্বাদে বেতার এবং টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে অন্তর্ভূক্তি জীবনে বিরাট আশার সঞ্চার করেছিল। কুড়িয়েছিলাম অজস্র স্বীকৃতি সনদ। কিন্তু শিল্পী হিসেবে পদে পদে বঞ্ছনার শিকার হয়েছি, কারণ তোষামোদী শিখিনি।’
‘কর্পোরেট কালচার আমাদের সংগীত জগতকে চর্চানির্ভর থেকে প্রকাশনির্ভর করে তুলেছে অতিমাত্রায়, যার ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার চেয়ে আত্মপ্রকাশের ঝোঁক মাত্রাতিরিক্ত এখন প্রবল। সেজন্য যেসব সংগীত শিল্পী বা শিক্ষকদের ‘যোগাযোগ’ ভালো তাঁরা মাত্রারিক্ত শিক্ষার্থী পাচ্ছেন। অন্যরা ধুঁকছেন! এই হচ্ছে বাস্তবতা’-বলছিলেন শওকত আরা।

সংগীত সাধনায়
দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা, বিশেষ করে বেতার, টেলিভিশন কিংবা শিল্পকলা একাডেমির মত প্রতিষ্ঠানগুলো বৈষম্য দূরীকরণে কি ভূমিকা রাখছে-এমন প্রশ্ন ছিল সংগীত শিল্পী আঁখির কাছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ হয়ত চেষ্টা করেন, তবে তা সংখ্যাগরিষ্ঠদের তুলনায় নগন্য। ফলে অধিকাংশরাই স্রোতে গা ভাসান। আমরাও বিপরীত স্রোতে যুদ্ধ করে হার মানি।’
তবে এমন বৈপরিত্য আর প্রতিকূলতার মাঝেও ভালো খবর দিতে চান তিনি। সম্প্রতি বেতার ও টেলিভিশনে স্বল্প পরিমাণে সুযো্গ পেয়ে মৌলিক গান গেয়ে নিজের আক্ষেপ কিছু ঘুচানোর চেষ্টা করেছেন আঁখি। সামনের উৎসব আবহে আরও কিছু আধুনিক গান নিয়ে শ্রোতাদের মাঝে হাজির হওয়ার সুখবর জানিয়েছেন তিনি।

মেয়ে শূচিতার সঙ্গে
শিল্পী বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতায় হেরে যাওয়া মানেই নিজেকে অপমান করা। কেউ ডাকুক না ডাকুক, নিজের জন্য হলেও গাইব। প্রাণ খুলে গাইব সেই গান, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। প্রকৃত শিল্পীদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় যে তথাকথিত সমাজ তাকে চপেটাঘাত করার জন্য হলেও গাইব-এ প্রতিজ্ঞা আমৃত্যু বহন করব।’




