Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২১ ১৪৩৩, শুক্রবার ০৬ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলাবে না, স্পষ্ট জানাল ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:২৯, ৬ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বদলাবে না, স্পষ্ট জানাল ইরান

ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখতে নারাজ ইরানের কট্টরপন্থীরা। তাঁদের মতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ রিপাবলিকানদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের আসন বাড়লেও তেহরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বরং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন তাঁরা।

বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একাধিক আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। আলোচকদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখতে হবে। যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র যাতে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ চালিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পালাবদল থেকে তেহরানের প্রতি নমনীয় আচরণের প্রত্যাশা নাকচ করেছেন।

বুধবার ইরানের জাতীয় ঔদ্ধত্যবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে পরিবর্তন আসবে কিংবা দেশটির রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে নীতিতে নতুনত্ব দেখা দেবে-এমন সামান্য আশাও যারা করছেন, তারা গুরুতর ভুল করছেন।

খামেনির সতর্কবার্তা, আত্মসমর্পণের সামান্য ইঙ্গিতও দেশের ভেতরে সরকারের জনসমর্থন দুর্বল করে দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি দাবি তোলার সুযোগ করে দেবে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ‘বে ভাগতে-ই ইরান’ (ইরান টাইম) অনুষ্ঠানের নিয়মিত আলোচক ভাহিদ খাজাব মনে করেন, নীতিগত অবস্থান থেকে ডেমোক্র্যাটরা ইরানের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধের বিরোধিতা করবেন-এমন সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন, “কেউ এগিয়ে এসে বলেছে, নৌ অবরোধ অন্যায়-এমন কথা আমি শুনিনি। অবরোধের কারণে তাদের নিজেদেরও বড় ধরনের মূল্য দিতে না হলে তারা এর বিরোধিতা করবে না।”

খাজাবের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের মতোই ব্যয়বহুল করে তুলতে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত ইরানের। তাঁর আশঙ্কা, যুদ্ধবিরতি বা আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাতের অবসান হলেও অবরোধ বহাল থাকলে কার্যত যুদ্ধের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হবে।

কট্টরপন্থী বিশ্লেষকদের এই অবস্থানের মূল কথা হলো, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যকে সমঝোতার সুযোগ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রাখাই তেহরানের জন্য বেশি জরুরি।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এবং সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির সঙ্গে যুক্ত করছেন। তাঁদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দলকে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পকে কৌশলগত পরাজয় উপহার দিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কট্টরপন্থী সংবাদপত্র ‘জাভান’ আরও এক ধাপ এগিয়ে শিরোনাম করেছে, ‘আমেরিকার নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ইরান’। পত্রিকাটির ভাষ্য, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের নীতির রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে।

খাজাবের দাবি, জ্বালানি তেল, ডিজেল ও রাসায়নিক সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্য আইওয়া ও কানসাসে রিপাবলিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ ভোটের ফলেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন তিনি।

খাজাব প্রশ্ন তোলেন, “পেট্রল, ডিজেল ও রাসায়নিক সারের দাম এত বেড়ে গেল কেন? এর জন্য কি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব দায়ী? তাঁর কিংবা তাঁর ছেলেদের দুর্নীতি? ইলন মাস্ক? না, এর কারণ যুদ্ধ।”

অনুষ্ঠানের সঞ্চালকও নির্বাচনের ফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এখানে ডেমোক্র্যাটদের জয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ইরান প্রশ্নে নেওয়া নীতির কারণে রিপাবলিকানদের পরাজয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ইরানের আলোচকেরা। তাঁদের মতে, ২০২০ সালে জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করার পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি করা ঠিক হবে না।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আরেক নিয়মিত আলোচক নিমা আকবারখানি সমালোচনা করেন ইরানের সংস্কারপন্থীদের। তাঁর বক্তব্য, বাইডেন ক্ষমতায় এলে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি পুনর্বহাল হবে-এমন আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর বাইডেন প্রশাসন ক্ষমতায় এসেও তাতে আর ফেরেনি।

আকবারখানি প্রশ্ন করেন, “তিনি কেন জেসিপিওএতে (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) ফিরে যাননি? কারণ, তারা ভাবছিল, এটাই নতুন করে আলোচনায় বসার এবং আরও ছাড় আদায় করার উপযুক্ত সময়।”

ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য মোহাম্মদ সালেহ জওকারও একই সুরে কথা বলেছেন। মেহর নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি খামেনির সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি করেন।

জওকার বলেন, “ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসায়, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদের গঠন বদলানোয় কিংবা দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটায় আলোচনা ও ছাড় দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে-এমন ধারণা কারও মধ্যে থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তবে মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন খাজাব। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরের পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। তিনি বলেন, “শত্রুপক্ষের শিবির সম্পর্কে ধারণা রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

তেহরানের কট্টরপন্থীদের বক্তব্যে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট-ওয়াশিংটনে ক্ষমতার সমীকরণ বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটার কোনো তাগিদ তাঁরা দেখছেন না। বরং হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক চাপকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখার পক্ষেই তাঁদের জোরালো অবস্থান।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

Walton
Walton