Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২৩ ১৪৩৩, রোববার ০৮ নভেম্বর ২০২৬

খামেনির নির্দেশ অমান্য:রেভল্যুশনারি গার্ডস দপ্তরে নারীদের বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:০৯, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

খামেনির নির্দেশ অমান্য:রেভল্যুশনারি গার্ডস দপ্তরে নারীদের বিক্ষোভ

ছবি সংগৃহীত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বিরুদ্ধে হুমকির জবাবে সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কট্টরপন্থী একদল নারী। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তেহরানে আইআরজিসির সদর দপ্তরের সামনে সাদা কাফনের কাপড় পরে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ উপেক্ষা করছে সশস্ত্র বাহিনী। দাবি, হুমকির জবাবে অবিলম্বে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে এই বিক্ষোভের সমালোচনা করেছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাবনাক। এক সম্পাদকীয় মন্তব্যে বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরোধিতায় নামার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে বলেও সতর্ক করেছে সংবাদমাধ্যমটি।

বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে সর্বোচ্চ নেতার জীবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একটি হাতে লেখা পোস্টারে বলা হয়, ‘ইমামের জীবন বিপন্ন। এখনই ব্যবস্থা নিন। আগামীকাল অনেক দেরি হয়ে যাবে।’

সামরিক কমান্ডারদের উদ্দেশে ঝোলানো একটি হলুদ ব্যানারে মোজতবা খামেনির ৩১ অক্টোবরের নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই নির্দেশে তাঁর বিরুদ্ধে হুমকির জবাবে ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অবিলম্বে কার্যকর হামলা’ চালানোর কথা বলা হয়েছিল। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘তারা আবারও ইমামকে হুমকি দিয়েছে! দেরি হওয়ার আগেই নির্দেশ পালন করুন।’

বিক্ষোভে মাইকে খামেনির বক্তব্য পড়ে শোনানোর পর অংশগ্রহণকারীরা স্লোগান দেন, ‘হে সশস্ত্র বাহিনী, নেতার অবাধ্য হওয়া থেকে সাবধান! আমরা নীরব থাকলে আমাদের জন্য লজ্জা!’

একপর্যায়ে আইআরজিসির একজন প্রতিনিধি সদর দপ্তর থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বাহিনীর কমান্ডারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কমান্ডারদের পক্ষে সরাসরি তাঁদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

বিক্ষোভকারীদের দ্রুত স্থান ত্যাগের অনুরোধ জানিয়ে ওই প্রতিনিধি বলেন, ‘এলাকাটি নিরাপদ নয়। যেকোনো মুহূর্তে শত্রুপক্ষ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। অনুগ্রহ করে জায়গাটি ছেড়ে দিন।’

কিন্তু তাতে বিক্ষোভকারীরা সরে যাননি। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এক নারী ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইমামের জীবনের হুমকির প্রতিশোধ নেওয়া না হলে আমরা বোনেরা এই জায়গাকে বাইত-এ-হজরত ফাতেমায় পরিণত করব।’

শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমাকে ঘিরে শোক ও মাতমের বিশেষ প্রতীক রয়েছে। ওই বক্তব্যে সেই ধর্মীয় প্রতীককেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এর আগেও একই গোষ্ঠীর নারীরা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সে সময় নিজেদের বিক্ষোভকে তাঁরা ‘স্নেহপূর্ণ তিরস্কার’ বলে আখ্যা দেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সামরিক কর্তাদের ফাঁকা হুমকি শুনতে শুনতে তাঁরা ক্লান্ত।

এনসাফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের এক বিবৃতিতে টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আহ্বানকে নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাঁদের দাবি, এ ধরনের চিন্তাভাবনাই শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিশোধ নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কট্টরপন্থীদের দাবি ও রাজনৈতিক অবস্থান

ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক মাসুদ কাজেমি জানান, ‘তুয়েহ’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠী নিজেদের মোজতবা খামেনির অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী বলে মনে করে। তাদের দাবি, সর্বোচ্চ নেতার নামে প্রচারিত বক্তব্য ও নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।

কাজেমির ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বিলুপ্ত করা এবং এর ক্ষমতা আবার সর্বোচ্চ নেতার হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধী। আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তাদেরও বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করেন।

গত ৫ নভেম্বরের এই বিক্ষোভের পেছনে কয়েক মাস ধরে চলা চাপের রাজনীতি রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই তাঁর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিতে সরব কট্টরপন্থীরা। তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি গত জুলাইয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এরপর ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম মাশরেঘ নিউজের প্রধান সম্পাদক হোসেইন সোলেইমানিকে উদ্ধৃত করে তাবনাক জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা এর আগেও তেহরানের একটি শোকস্থল রাভাঘ-এ কেশভারদুস্ত দখল করে অবস্থান নিয়েছিলেন। স্থানটি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার জায়গার কাছাকাছি।

গত জুনে সেখানে টানা তিন দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন কাফনের কাপড় পরা কট্টরপন্থীরা। প্রতিশোধ নেওয়ার দাবির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন তাঁরা। এরপর স্থানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিক্ষোভের নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে অনুসারীদের মধ্যে এমন ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সোলেইমানি, যাতে তাঁরা মনে করেন রাষ্ট্রের প্রায় পুরো ব্যবস্থাই সর্বোচ্চ নেতা, জনগণ ও দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাঁর মতে, এই আন্দোলনের লক্ষ্য ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নয়; বরং ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

সোলেইমানি আরও লিখেছেন, কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে গোষ্ঠীটির ওপর নজরদারি করেছে এবং একাধিকবার সতর্কও করেছে। কিন্তু তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সহনশীলতাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি হিসেবে ধরে নিয়েছে।

আন্দোলনটিকে ক্রমে বেড়ে ওঠা ‘ক্যানসারের টিউমার’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি এর চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর ভাষায়, ‘সেই অস্ত্রোপচার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।’

দেশটির রক্ষণশীল সংবাদপত্র খোরাসানও এই বিক্ষোভের সমালোচনা করেছে। পত্রিকাটির মন্তব্য, নারীরা হয়তো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বারবার ওঠা বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, অথবা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে তাঁদের কাছে বাছাই করা তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে আবেগকে কাজে লাগিয়ে সামরিক কমান্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছে পত্রিকাটি।

বিক্ষোভ দমনে ভিন্ন আচরণের অভিযোগ

ইরানের সামরিক সদর দপ্তরের মতো স্পর্শকাতর স্থানের সামনে কট্টরপন্থীদের এমন বিক্ষোভ দেশটির সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের চিত্রের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

বিভিন্ন সময়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারির আন্দোলনসহ আগের বিভিন্ন দফার বিক্ষোভেও এমন ঘটনা ঘটেছে। অথচ সর্বোচ্চ নেতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনুগত বলে পরিচিত বিক্ষোভকারীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর সামনেও সমাবেশ করতে পারছেন।

এই বৈপরীত্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক নেতৃত্বের ওপর কট্টরপন্থীদের চাপ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁদের বিরোধের নতুন দিক সামনে এনেছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

Walton
Walton