Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২৩ ১৪৩৩, রোববার ০৮ নভেম্বর ২০২৬

পোল্যান্ডে ভয়াবহ বন্দুক হামলা, নিহত ৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৪৬, ৮ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

পোল্যান্ডে ভয়াবহ বন্দুক হামলা, নিহত ৬

শনিবার গোলাগুলির ঘটনার পর ক্রাকোভের প্রধান বাজার চত্বরের (মেইন মার্কেট স্কোয়ার) কাছাকাছি একটি এলাকা পুলিশ সুরক্ষিত করে রেখেছে। ছবি সংগৃহীত

পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ক্রাকোভে জনাকীর্ণ মার্কেট স্কয়ারে বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৬ জন। শনিবারের (৭ নভেম্বর) এ হামলার পর সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ওই তিনজনের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার বিকেল ৩টার দিকে (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) হামলার খবর পায় তারা। এর কিছুক্ষণ আগে একটি গাড়ি নিয়ে শহরের প্রধান মার্কেট স্কয়ারে প্রবেশ করেন সন্দেহভাজন ব্যক্তি। এরপর গাড়ি থেকে নেমে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন তিনি। এতে ঘটনাস্থলেই চার নারী ও দুই পুরুষ প্রাণ হারান।

পুলিশের উপপরিদর্শক ক্যাটারজিনা সিসলো পোলিশ সংবাদমাধ্যম টিভিএন২৪-কে জানান, হামলাকারীর পরনে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো পোশাক ছিল। তিনি সামরিক ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন।

সন্দেহভাজন ব্যক্তির বয়স ২৫ বছর। তিনি পোল্যান্ডের নাগরিক। পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আর কোনো হামলাকারীকে খুঁজছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

হাসপাতালে তাঁর একাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে। আঞ্চলিক পুলিশের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও সংকটাপন্ন।

তবে হামলাকারী সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন-এমন খবর নাকচ করেছেন পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি পোলিশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, এখনো নন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর কখনো কোনো সম্পর্কও ছিল না।

এদিকে ক্রাকোভ থেকে প্রায় ১২০ মাইল উত্তরে অস্ট্রোভিয়েক শভিয়েনতোকশিস্কি এলাকায় সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সেখানেই তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের ধারণা, তাঁরা হামলাকারীর পরিবারের সদস্য হতে পারেন। শনিবার গভীর রাতে ক্রাকোভে এক জরুরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, নিহত তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নিকটাত্মীয় হওয়ার জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

সন্দেহভাজনের গাড়ি থেকেও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। ক্যাটারজিনা সিসলো জানান, গাড়িটিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদের অনেকগুলো অংশ পাওয়া গেছে।

হামলার নেপথ্যে উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ?

হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারীরা। তবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন কিয়েরভিনস্কি জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সাংবাদিকদের সামনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণে মনে হচ্ছে, হামলাকারী উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তদন্তে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

হামলায় আহতদের মধ্যে পুলিশের দুই সদস্যও রয়েছেন। তাঁদের একজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, একজন পুলিশ সদস্যের শরীরে একটি গুলি লাগে, অন্যজন তিনটি গুলিবিদ্ধ হন। অস্ত্রোপচারের পর দুজনের অবস্থাই স্থিতিশীল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন আঞ্চলিক পুলিশের এক মুখপাত্র।

তবে আহত এক পুলিশ সদস্যের একটি ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাঁর জরুরি ভিত্তিতে এবি পজিটিভ (AB+) রক্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন দেশটির বিচারমন্ত্রী ওয়ালদেমার ঝুরেক। রক্তদানে আগ্রহীদের দ্রুত রক্তদান কেন্দ্রে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশ সদস্যদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ওই দুই পুলিশ সদস্য সম্ভবত অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোসিনিয়াক-কামিশও তাঁদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তাঁর ভাষায়, দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দৃঢ়তার সঙ্গে হামলাকারীকে থামিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। তাঁরা সত্যিকারের বীর।

আহতদের মধ্যে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, পর্তুগাল, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের পাঁচ নাগরিক রয়েছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র।

ঘটনাস্থলে এখনো নিরাপত্তা জোরদার

শনিবার হামলার পর থেকেই ক্রাকোভের প্রধান মার্কেট স্কয়ার ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। রয়টার্সের ভিডিওতে দেখা গেছে, হেলমেট ও বিশেষ কৌশলগত সরঞ্জাম পরা ভারী অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছেন। পেছনে সাইরেনের শব্দের মধ্যে পথচারীদের চলাচল করতেও দেখা যায়।

ক্যাফে ও পানশালায় ঘেরা ক্রাকোভের এই প্রধান চত্বরটি পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সাধারণত সেখানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকে।

ঘটনাস্থলে এখনো উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রম চলছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহের জন্য হামলার স্থানের কাছে একটি বাসও রেখেছে পুলিশ। সেখানে গিয়ে ঘটনার বিবরণ দিতে পারবেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এদিকে হামলাকারীর গুলিতে একটি ট্রামের চালকের পাশের জানালা ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছে ক্রাকোভের পরিবহন কর্তৃপক্ষ। তবে এতে কেউ আহত হননি।

প্রাণী অধিকার সংগঠন ওটিওজেড অ্যানিম্যালসের তথ্য অনুযায়ী, শহরের কেন্দ্রস্থলে গাড়ি টানা দুটি ঘোড়াকেও গুলি করেন হামলাকারী। তবে প্রাণী দুটি বেঁচে গেছে। পশু চিকিৎসকের মাধ্যমে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং পরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের মতো পোল্যান্ডেও আগ্নেয়াস্ত্র কেনা ও বহনের ক্ষেত্রে কঠোর আইন রয়েছে। সামরিক ধরনের অস্ত্রের মালিকানা কিংবা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অনুমতি পান খুব কম মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী টাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জানান, পুলিশ ভয়াবহ এই হামলার তদন্ত করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য পাচ্ছেন।

শনিবার গভীর রাতে ক্রাকোভে মন্ত্রিসভার সদস্য, নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যুরোর প্রধান এবং নগর মেয়রকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি ও তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।

পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকি জানান, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যুরোর প্রধান ক্রাকোভের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, হামলায় নিহত, আহত এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি তাঁর সমবেদনা রয়েছে।

এদিকে হামলার ঘটনায় আগামী ১১ নভেম্বর পর্যন্ত শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছেন ক্রাকোভের মেয়র লুকাশ গিবালা।

পোল্যান্ডের প্রতিবেশী দেশগুলোও এ হামলায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে। চেক প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুরাই ব্লানার বলেছেন, এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। কঠিন এ সময়ে স্লোভাকিয়া পোল্যান্ডের জনগণের পাশে রয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, এ হামলার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
সূত্র: সিএনএন

Walton
Walton