Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ২২ ১৪৩৩, শনিবার ০৭ নভেম্বর ২০২৬

ইরান যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ট্রাম্প-ভ্যান্স দ্বন্দ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৩৩, ৭ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

ইরান যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ট্রাম্প-ভ্যান্স দ্বন্দ্ব

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য এবং এর পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক মন্তব্য ইরানের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তেহরানের বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ভ্যান্সের বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের ইঙ্গিত স্পষ্ট। অন্য অংশের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি অসম চুক্তিতে ইরানকে রাজি করানোর কৌশল হিসেবেই এসব বক্তব্য সামনে আনা হচ্ছে।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করলেও মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ ইরান যুদ্ধ। তাঁর মতে, যুদ্ধের অবসান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনা করা এসব ভোটারের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে।

ভ্যান্সের ওই পোস্ট সামনে এনে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের সমালোচনা করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ।

এরপর থেকেই ভ্যান্সের বক্তব্যের উদ্দেশ্য এবং মার্কিন নীতিনির্ধারণে তাঁর প্রকৃত প্রভাব নিয়ে ইরানের সংবাদমাধ্যমে নানা ব্যাখ্যা উঠে আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসনে মতপার্থক্য, তবে ভাঙন নয়
বিশ্লেষণধর্মী ওয়েবসাইট ভানা নিউজের মতে, ভ্যান্সের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। তবে একে ট্রাম্প ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টের মধ্যে চূড়ান্ত বিরোধ কিংবা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ভানা নিউজ লিখেছে, প্রেসিডেন্ট ও তাঁর ডেপুটির মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য থাকলেই রাজনৈতিক সহযোগিতার অবসান ঘটে না। এমনকি তা থেকে দুজনের মধ্যে সমঝোতার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

এই মতপার্থক্য শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি।

‘নিজেদের স্বার্থেই অবস্থান বদলাচ্ছেন ভ্যান্স’
তবে অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মোহসেন জাহেদি-মোভাহেদের ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন। তিনি মনে করেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টি ভ্যান্সের স্বীকার করাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, রিপাবলিকানদের প্রতি ভোটারদের ক্ষোভের প্রধান কারণ যে ইরান যুদ্ধ, ভ্যান্সের বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে। এখন ট্রাম্প কীভাবে এর জবাব দেন, সেটিই দেখার বিষয়।

জাহেদি-মোভাহেদের মতে, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্তি তৈরির যে চেষ্টা ওয়াশিংটন করেছিল, সেই কৌশল এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারপন্থী ভাষ্যকার আলি নাসরির মতে, ইসরায়েল প্রশ্নে ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্যান্সের মতপার্থক্য রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের পর তৈরি হয়নি; এর সূত্রপাত আরও আগে।

এক্সে দেওয়া পোস্টে নাসরি বলেন, ভ্যান্স বুঝতে পেরেছেন, তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পুরো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের টিকে থাকা নির্ভর করছে ইসরায়েল থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ও ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার ওপর।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে ইরানকে বড় মূল্য দিতে হয়েছে।

‘যুদ্ধের আগের প্রস্তুতি হতে পারে’
তবে ভ্যান্সের বক্তব্যকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখতে নারাজ কট্টরপন্থী সাংবাদিক পারিসা নাসর। তাঁর ভাষায়, এটি ভ্যান্সের ‘দ্বিমুখী রাজনৈতিক কৌশলের’ আরেকটি পর্ব।

পারিসার অভিযোগ, মার্কিন ভোটারদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী ইরানি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতেই ভ্যান্স এমন অবস্থান সামনে আনছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি নিছক নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবও।

কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গেও ভ্যান্সের বক্তব্যের যোগসূত্র দেখছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তেহরান এমন একটি চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াবে।

পারিসা নাসর লিখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে অসম শর্তের কোনো চুক্তি হলেও সেটি পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব হয়ে উঠতে পারে। আর ইরানের জন্য এমন পরিস্থিতি হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত
এদিকে ইরান যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকানরা নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, বুধবার সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি ‘অনেকাংশেই সত্য’। তবে ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখেন তিনি। তাঁর দাবি, তেহরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

ভ্যান্সের উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানে চলমান বিতর্কের পেছনে রয়েছে আরও একটি কূটনৈতিক যোগাযোগ। গত অক্টোবরের শেষ দিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তবে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চিঠির জবাব দেয়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দ্রুত শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভ্যান্স। একই সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

গত ৩১ অক্টোবর রেজাই জানান, কাতারের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিটি তিনি পড়েছেন, তবে এখনো জবাব দেননি। তাঁর ভাষায়, ওয়াশিংটনের আগের যোগাযোগগুলোর তুলনায় চিঠিটির ভাষা ছিল ভিন্ন। এটিকে তিনি ‘ভালো লক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর দাবি, ইরান এরই মধ্যে নিজের শক্ত অবস্থান সুসংহত করেছে।

তবে এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ২ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চিঠির ভাষা বা সুর দেখে তেহরান সিদ্ধান্ত নেবে না। ওয়াশিংটনের কথার চেয়ে তাদের কাজকেই বেশি গুরুত্ব দেবে ইরান।

তেহরানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, ভ্যান্সের বক্তব্য কি মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক কৌশলের অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কা-দুটিই বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে ইরানকে।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

Walton
Walton