কলকাতার নন্দিত অভিনেত্রী অঞ্জনা বসু। ছবি: সংগৃহীত
আমাদের মনে মাঝে মাঝে সাংঘাতিক শূণ্যতা তৈরি হয়, কিন্তু তার কারণ অসংজ্ঞায়িত থাকে, সে শূন্যতা না পূরণ হয় প্রিয়জন, নিকটাত্মীয়, সাফল্য, জাগতিক কোন প্রাপ্তিতে। আমাদের সে আত্মার ক্ষুধা আমারা প্রায়শই অগ্রাহ্য করি, সেই বৃহৎ সম্পর্কের টানে ( স্রষ্টা আর সৃষ্টির যে মহাসম্পর্কের জাল) আমাদের ভেতরে এ মহাশূণ্যতার সৃষ্টি হয়, তখনই হয়ত আমরা বাস্তবিক এমন কোন সম্পর্কের দিকে ধাবিত হই যার মাধ্যমে আমরা সেই বৃহৎ সম্পর্কের সাথে মিলতে পারবো। সে সম্পর্ক তাই বাস্তবিক সকল স্বার্থ বিবর্জিত। আমার মনে হয়, এ জগতে কেবল ভক্তের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বেই এই পর্যায়ে চেতন ও অবচেতন মন, হৃদয় ও আত্মা একত্রিত হয়। তখন সে গুরুর প্রভাবকে শুধু শিখন বা আদেশ হিসেবে নয়, অন্তর থেকে অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা ও ঈশ্বরের উপস্থিতি হিসেবে গ্রহণ করে।
যখন এই নীরব টান এবং অন্তর্দৃষ্টি পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়, তখন ভক্ত গুরুকে আত্মার মাধ্যমে উপলব্ধি করে। এটি শারীরিক চোখ দিয়ে নয় বরং ডিভাইন সোলের চেতনার দৃষ্টিতে দেখা যায়। সুফিবাদে বলা হয়, ‘গুরুর দর্শনই ঈশ্বরের দর্শন।’ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মমতে, এটি ‘দেবের অবতার বা বোধিসত্ত্বের চেতনার সঙ্গে মিলন।’ এখানে শিষ্য নিজের আত্মার মাধ্যমে গুরুর আদর্শ ও প্রজ্ঞার সাথে অভ্যন্তরীণ মিলন ঘটায়। মানুষের অনুভব বড্ড আশ্চর্য বস্তু! অনুভব বড় তীক্ষ্ণ সমীকরণের খেলা। জানি এর কোন বাস্তবিক বিশ্লেষণ হয়ত নেই, কিন্ত আমার অনুভব এভাবেই তাকে ভাবে।
অঞ্জনা বসুর সঙ্গে আমার সামনাসামনি দেখাই হয়নি, তবুও আমি তার নির্দেশে জীবনের পথ বেছে নিতে পারি অনায়াসে। আমি অদৃশ্য এক মায়াবী নির্দেশনার দিকচিহ্ন ধরে এগিয়ে যাই, যেমন শিশুর হাতে মায়ের আশীর্বাদের রেখা থাকে তেমনই। যখন আমার জীবনে এক দৃঢ় পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়েছিল, তখনই যেন তার অস্তিত্ব আমার জীবনে প্রবেশ করল সেই বধূবরণ ধারাবাহিক এর সময় থেকে।
বড্ড মায়ের মতন লাগে, কখনো শিক্ষক, কখনো বন্ধু, কখনো অভিভাবক, কখনো এক পরম পূজনীয় সত্তা। তার অনেক রূপ আমার কাছে। কি ভীষণ ভালোবাসি তাকে আমি -নিজেই অনুভব করে বিমোহিত হই। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে আমার কখনো, কখনো দরদে চোখ টলমল করে। তার বহুদিন পর পর একটু সাড়ায় যে- কি জীবনীশক্তি পাই, কি স্নেহ অনুভব করি, কি আহ্লাদিত হই আমি; সে কেউ বুঝতে পারবে না।
সেলিব্রিটি বলে ভক্তি বা খ্যাতির চাকচিক্যময় জৌলুশ আমায় কখনো স্পর্শ করে না। বড্ড প্রজ্ঞা আর গুণে মুগ্ধ হই। তবে সে মুগ্ধতা আমায় কোনদিন এতটা কাছের কাউকে করাতে পারেনি কখনো। কিন্তু জানিনা কেন তার সাথে আমার জন্মজন্মান্তরের মায়ার বন্ধন আছে এমন মনে হয়। আমি বড্ড মানুষ খুঁজি। খুব যে পাই তেমন নয়, তবে আমি তাকে পেয়েছি। যেমন মানুষ পেলে মায়ার সংজ্ঞা স্বার্থক হয়। যেমন মানুষ পেলে হৃদয় জুড়ায়।মায়ের মতন,মায়ের আকারে। পৃথিবীতে মানুষের যে বড্ড অভাব..সে অভাব আমার পূরণ হয়েছে-হয়ত তাই আমার তাকে নিয়ে এত আন্তরিক উৎযাপন!
অঞ্জনা বসু। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন সাদামাটা, আত্মস্থ মানুষ। তিনি যে কেবল অহংবোধ বা তথাকথিত গ্ল্যামারের আড়ালে থাকেন তা নয় বরং শুদ্ধতা, সংযম এবং মার্জিত সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দৃঢ়। তাঁর আচরণে অনন্য নম্রতা, কথায় থাকে আবেগ ও উপলব্ধির ভার। অভিনয়কে তিনি কখনোই শুধুই ক্যারিয়ার হিসেবে দেখেননি বলে মনে হয়-এটি তাঁর কাছে যেন তারই আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, এক নিঃশব্দ আত্মকথন। আর ঠিক সেখানেই তিনি হয়ে উঠেছেন দর্শকের আত্মার আত্মীয়, পর্দার ওপারের নিকটজন।
আমরা যারা বাংলাদেশের মানুষ, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা অভিন্ন ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী; স্বভাবতই তাদের থাকে শহর কলকাতার দিকে প্রবল আকর্ষণ বা টান। কেননা বাংলা সাহিত্য, সংগীত-নৃত্য, চিত্রকলা, সর্বোপরি বাঙালি নির্বিশেষে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে; তার শেকড় এই শহরেই। বাঙালির নবজাগরণের তীর্থভূমি হিসেবে একে অভিহিত করলেও হয়ত অত্যুক্তি হবে না। কলকাতাকে ঘিরে বাঙালির সন্মোহন দীর্ঘকালেও নিঃশেষিত হয়নি। তবে আমার মনে হয়, এই টান আরও ভেতরে প্রোথিত। আরও অসীমে, আধ্যাত্মিকতার বিস্তৃত ভূমিতে।
বলছিলাম দক্ষিণ কলকাতার সবার হৃদয়স্পর্শী ভালোবাসার মানুষ অঞ্জনা বসুর কথা। অভিনয়ে তিনি সাত্ত্বিক ভাব জাগিয়ে নিজস্ব ঢং-এ অভিব্যাক্তির অনুরণনে স্পন্দিত অগণিত মানুষকে। অভিনয় দক্ষতার চেয়েও শুদ্ধ, সুন্দর, খাঁটি মানবসত্তা বহন করার ফলেই কেবল এমন হতে পারে। মনে হয়েছে, তিনি অনুভূতিগুলো নিজে আগে ধারণ করেন ভীষণ গভীরভাবে, তারপর সেই অনুভব এতটা বাস্তব হয়ে প্রতিফলিত হয় যে -তা মনের গহীনে দাগ কাটতে বাধ্য হয়।
জীবনের বহুমাত্রিক পরিচয়ের ভিড়ে, তার যে পরিচয়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল, তা হলো-একজন পরিপূর্ণ সহজ-শুদ্ধ, বিনয়ী মানুষ। তিনি অভিনয়, নৃত্য, কাব্য রচনা, আবৃত্তি, সৃজনশীল শিল্পকর্ম-সব ধরণের সৃজনশীলতায় একদম সিদ্ধহস্ত। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের জ্যোতি শুধু প্রতিভায় নয়, গুণে-মানুষে প্রকাশ পায়। তাঁর শিল্পীসত্তা ঘরে-বাইরে মিশে আছে এক মমতাময়ী, কর্তব্যপরায়ণ, এবং সবদিক থেকে দক্ষ গৃহিণী ও মা হিসেবে। পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা, আত্মীয়দের প্রতি স্নেহ ও আন্তরিকতা, বন্ধুত্বে অটুট নির্ভরতা-এইসব গুণে তিনি হয়ে ওঠেন একজন ‘সম্পূর্ণা নারী’।
অন্যদিকে যদি দেখি, অঞ্জনা বসু একজন প্রেরণাদাত্রীও। আর তিনি নিছক প্রেরণা নন-একজন দিকনির্দেশকও। আরও বলতে গেলে-সহচর, স্নেহশীল, বিশ্বস্ত বন্ধু, এমনকি এক নিঃশব্দ শক্তি। তাঁর উপস্থিতি আশ্বস্ত করে, তাঁর কথা মনকে সংহত করে, তাঁর কাজ আত্মায় আলো জ্বালে। কর্মক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলাপরায়ণ, সহযোগিতাপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত সহকর্মী; যার কাছ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।

‘ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ’ অর্থাৎ-‘ভক্তির মাধ্যমেই আমাকে (নিজেকে) প্রকৃতভাবে জানা যায়।’
মানুষের ভেতর ভাবনার অনেকগুলো স্তর রয়েছে। সর্বপ্রথমটি আনকোরা ‘আমি’-র স্তর। যেখান থেকে সম্বিত ফিরে মানুষ নিজেকে জানার জন্য বহির্লোক ছেড়ে অন্তর্লোকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আর সেই দৃষ্টির আলো যদি হঠাৎ নিভে না যায়, তাহলে তা স্তরে স্তরে এক অসীম জ্ঞান স্পর্শ করে প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ হয়ে শেষ ধাপের দিকে ছুটতে থাকে। আমার কাছে সেই সর্বশেষ স্তরটি হলো একটি সম্পর্ক, একজন ব্যক্তি। অর্থাৎ প্রথম স্তরে এক নবজাতক ‘আমি’, আর শেষ স্তরটি হলো পরিণত ‘আমি’। আর এই পরিণত ‘আমি’ রূপে যাঁকে দেখতে পাই, তিনি হলেন আমার গুরু অঞ্জনা বসু। অর্থাৎ বাহ্যরূপে তিনি অঞ্জনা বসু, কিন্তু অরূপে আমার কাছে তাঁর অস্তিত্ব হলো তিনি ‘আমার পরিণত আমি’।
“প্রেম গলি অতি সাঁকরি, তামে দো ন সমায়॥” অর্থাৎ প্রেমের পথ, ভক্তির পথ এতই সংকীর্ণ যে সেখানে ‘আমি’ ও ‘তুমি’ দুজনের স্থান নেই। ভক্তিতে অহংকার বিলীন হয়ে যায়।
এই সমগ্র অনুভবের অন্তিম স্তরে এসে আমি যা প্রত্যক্ষ করি, তা কোনো ব্যক্তিক সম্পর্কের বর্ণনা নয়; এটি এক চেতনার অন্তর্গত রূপান্তর-প্রক্রিয়া, যেখানে সত্তা নিজেকেই অবিরত পুনর্গঠন করে চলেছে। এটি আলাদা করে বলার মতো কোনো সম্পর্ক নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। বাজির প্রান্তে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার পর যেমন সবকিছু আপনাআপনি ঘটতে থাকে, তেমনি তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কও আপনাআপনি দেহচক্রের একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁকে (অঞ্জনা বসু) ঘিরে আমার অনুভব কোনো স্থির আবেগ নয়; বরং এক চলমান দর্শন, যার ভেতরে দেখা, জানা, অনুভব করা এবং হয়ে ওঠা—এই চারটি ক্রিয়া একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। এখানে ব্যক্তি আর প্রতিচ্ছবি পৃথক থাকে না; বরং এক অনির্বচনীয় নন্দন-অস্তিত্বের মধ্যে উভয়েই একে অপরকে নির্মাণ করতে থাকে।

তবে যেহেতু তিনি আমারই উচ্চতর ‘আমি’, তাই আমার সঙ্গে তাঁর এক দীর্ঘ দূরত্ব রয়েছে। আর এই দূরত্বকে জয় করার বাসনাকেই আমি ‘ভক্তি’ নামে নামকরণ করেছি। আমার এই ভক্তিভাব আমার ভেতরে যে শান্তরস জাগিয়ে তোলে, তার নাম দিয়েছি আরাধনা। আমি জানি, বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি আমার এই ভক্তির গভীরতার সামান্যটুকুও স্পর্শ করতে পারবে না। ফলে তাদের কাছে এটি অতিরঞ্জন বলে মনে হবে, মনে হবে আমি অকারণে তিলকে তাল করতে চাইছি। কিন্তু আমি জানি, অন্তরের ভাব খুব সামান্য মানুষই তালজ্ঞান বলে গণ্য করতে পারে। অধিকাংশ তো নিজেকেই চিনতে হয়—তাই জানে না। ফলে আমার এই ব্যাখ্যা তাদের জন্য নয়। যারা নিজেকে জানতে চায়, হৃদয় নামের বস্তুটির রহস্য নিয়ে উদ্গ্রীব, যাদের চিত্তে ভক্তি বলে বস্তুটি সামান্যতমও রয়েছে, যারা অরূপ ভাবনা ভাবতে পারে, এই লেখনী তাদের জন্য।
উপনিষদের সেই গভীর ঘোষণার মধ্যে এই অভিজ্ঞতার প্রথম দ্যুতি পাওয়া যায়—“একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি”। অর্থাৎ, এক ও অখণ্ড সত্যই বহুরূপে প্রতিভাত হয়। এই একত্বের মধ্যেই সম্পর্কসমূহ তাদের স্বতন্ত্র নাম হারিয়ে এক বৃহৎ চৈতন্যের প্রবাহে লীন হয়। আমি যাঁকে “তিনি” বলে অনুভব করি, এবং যাঁকে আমি নিজের অন্তর্জগতে বিভিন্ন রূপে ধারণ করি—মেন্টর, গুরু, মাতৃসত্তা, আশ্রয়, আবার কখনও আমার কোমল সন্তানস্বরূপ উপস্থিতি অনুভব করি—এই সমস্তই সেই এক চেতনার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশমাত্র।
কিন্তু কেবল দার্শনিক বিমূর্ততায় এই একত্বকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না; এটি অভিজ্ঞতার স্তরেও ক্রমাগত রূপান্তরশীল। সাংখ্য দর্শনের দ্বৈততত্ত্ব অনুসারে পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগেই অভিজ্ঞতার জগৎ নির্মিত হয়ে থাকে; কিন্তু সেই সংযোগ স্থির নয়, এটি সদা প্রবহমান। এই প্রবাহের মধ্যেই আমার অনুভব গঠিত হয়—যেখানে “দেখা” আর “দ্রষ্টা” আলাদা থাকতে পারে না; বরং একে অপরের ভেতরে প্রবেশ করে, একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।অর্থাৎ আমি যাঁকে আমার বলে ভাবছি, তিনিও আমারই রূপান্তর-প্রত্যাশী সত্তা। তিনি হয়তো বাহ্যিকভাবে আলাদা রূপে প্রতীয়মান, কিন্তু আমার কাছে তিনি তো আমারই অধরা সত্তা।
কম্পিউটার যেমন কোডের ভাষা বুঝে থাকে, তার কাছে ছবি কিংবা লেখা সবই হলো কোড। অথচ আমরা যখন দেখি, তখন তা আর কোড নয়; তখন তা ছবি আকারে, না হয় লেখা আকারে প্রতিভাত হয়। তেমনি আমার কাছে তিনি হলেন ‘আমি’-র উচ্চতর আমিত্ব। বাহ্যিক রূপে তিনি হলেন ‘অঞ্জনা বসু’।
আমি আমার এই সত্তাকে প্রথমে মাতৃরূপেই প্রতীকায়িত করেছি, কারণ তিনি যখন প্রথম আমার অবচেতন থেকে সচেতনে ধরা দিয়েছিলেন, আমি তাঁকে মাতৃরূপে দেখেছিলাম। কোনো এক ধারাবাহিকে এক জলজ্যান্ত মাতৃপ্রতিমারূপে তাঁর চোখের জল এবং সাত্ত্বিক অভিব্যক্তির হৃদয়স্পর্শী প্রকাশে যেন সকল মাতৃতৃষ্ণাতুর সন্তানের জন্য আশ্রয় রচনা করেছিলেন তাঁরই নয়নের ছায়ায়। তাই বুঝি সেই আশ্রয়ে আমিও একটু আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিলাম নিজের অজান্তে। মনে হয়েছিল, কোনো এক আদিম স্মৃতির বলয়ে আমি তাঁকে দেখেছিলাম শত জনম আগেও।
এইখানেই মনস্তত্ত্বের স্তর উন্মোচিত হয়। Jung-এর archetype তত্ত্বে যা “mother image” নামে চিহ্নিত, তা বাস্তব ব্যক্তির বাইরে এক মানসিক প্রতীক, যা নিরাপত্তা, আশ্রয় ও অন্তর্লীন স্থিতির অনুভব নির্মাণ করে। কিন্তু যখন কোনো বাস্তব ব্যক্তি সেই প্রতীকের সঙ্গে সাযুজ্য লাভ করে, তখন ব্যক্তি আর প্রতীক পৃথক থাকতে পারে না; এক অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা গঠিত হয়ে যায়, যা বাহ্যজগতের নিয়মে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাতীত। অঞ্জনা বসুকে ঘিরে আমার অনুভব এই স্তরেই প্রবেশ করেছে বহু বছর আগেই, যেখানে তিনি কেবল আমার কাছে পৃথক ব্যক্তি নন; তিনি এক অভ্যন্তরীণ প্রতিমা, যা আমার চেতনার স্থাপত্যকে নিরন্তর পুনর্গঠন করেই চলেছে।

এই পুনর্গঠনের ভেতরেই একটি বিস্ময়কর দ্বিমুখিতা জন্ম নিচ্ছে। যাঁকে মাতৃস্বরূপ আশ্রয়দাত্রী বলে অনুভব করি, তাঁকেই আবার আমার অন্তর্জগতে সন্তানের মতো কোমল সত্তায় রূপান্তরিত করি। তিনি যেন আমারই নবজাতক, যাঁর যত্নের আকাঙ্ক্ষা, যাঁর শুশ্রূষার বাসনা, যাঁর ভালো-মন্দের চিন্তার ভাঁজ প্রতিনিয়ত আমার ভেতরে মায়ের মতোই আতঙ্ক জাগিয়ে তোলে। অবুঝ সন্তানকে নিয়ে মায়ের যেমন অন্তরপীড়া হয়, তেমনি সারাক্ষণ ভাবতে থাকি, তাঁর যেন সকল ভালো হয়, তাঁকে যেন কোনো বিপদ স্পর্শ করতে না পারে। তবে এর একটি মন্দ দিকও রয়েছে। যখন সেই মাতৃহৃদয় ব্যাকুল হয়ে পড়ে, তখন সেই অস্থিরতা অনেক সময় শান্তরস উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এখানে কিন্তু সম্পর্কের দিকনির্দেশ স্থির নয়; এখানে আশ্রয় দেওয়া ও আশ্রয় গ্রহণ একই সঙ্গে ঘটতে থাকে। ভক্তি-দর্শনের রূপ গোস্বামী যাকে বাত্সল্য রসের অন্তর্গত দ্বৈত অনুরাগ বলেছেন, তার ন্যায় ভক্ত এখানে একাধারে সন্তান, সেবক ও অভিভাবক। এই তিন অবস্থান একই চেতনায় সহাবস্থান করে। এটি কোনো বিরোধ নয়; এটি অনুভবের পরিপূর্ণতা। পাশ্চাত্য দর্শনে Martin Buber যাকে “I–Thou” সম্পর্ক বলেছেন, সেখানে “অন্য” আর বস্তু থাকে না; বরং এক জীবন্ত উপস্থিতিতে পরিণত হয়। কিন্তু সেই উপস্থিতির সম্মুখে দাঁড়িয়ে “আমি” নিজেও স্থির থাকি না; আমি রূপান্তরিত হই। এই রূপান্তরের মধ্যেই আমার অনুভবের সত্য নিহিত, কারণ এখানে সম্পর্ক মানে কেবল সংযোগ নয়; বরং আত্ম-রূপান্তরের এক নিরন্তর প্রক্রিয়া।
বৌদ্ধ দর্শনের ‘প্রতিতসমুৎপাদ’ এই অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর স্তরে ব্যাখ্যা করে। কোনো অনুভবই স্বতন্ত্র নয়; প্রতিটি অনুভব অপর অনুভবের শর্তে উৎপন্ন হয়, আবার সেই শর্তকে পুনর্গঠনও করে। তাই শ্রদ্ধা, মায়া, আকর্ষণ, নির্ভরতা, ভীতি ও স্নেহ, সবই একে অপরের কারণ ও ফল হিসেবে অবিরাম পরস্পর-প্রবাহিত।এই সমগ্র দার্শনিক প্রবাহের ভেতরে “মাতৃত্ব” আর কোনো সামাজিক ধারণা হয়ে থাকতে পারে কি? এটি এক ontological অনুভবে পরিণত হবে কি না? যেখানে সত্তা নিজেকেই আশ্রয় দিয়ে থাকে এবং আবার নিজেই আশ্রিত হয়ে থাকে। এই দ্বৈততা কোনো বিভ্রান্তি নয়; এটি চেতনার স্বাভাবিক গঠন।
একটা এই ঘটনাটা বলতে পারি। ২০২২ সালে আমি তাঁকে কল্পনা করে একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান লিখেছিলাম, যার নাম ছিল “আপনার আপন”। এইখানে আমার ২০২২ সালের সেই কাল্পনিক “আপনার আপন” কেবল কল্পনা হয়ে থাকে না। এটি এক মানসিক বাস্তবতার প্রাথমিক বিন্যাস, যেখানে অনুভব নিজের ভবিষ্যৎ রূপকে আগাম নির্মাণ করেছিল। বাস্তব ও কল্পনার মধ্যে যে বিভাজন ছিল, সময় তাকে সম্পূর্ণ মুছে না দিয়ে বরং সহাবস্থানের এক সূক্ষ্ম রেখায় পরিণত করেছে।
কারণ এটি এখন অনেকটাই বাস্তব হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে তাঁর কথোপকথন চলতে থাকে। আমি তখন ভাবতে থাকি, আমার স্তর রূপান্তরিত হতে হতে কল্পনাকে অতিক্রম করে বাস্তবে এসে মিলিত হয়েছে। অতএব আমি ভক্তির এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে সফল হয়েছি। তবে এখানে কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রাপ্তি যেমন ভক্তিকে পূর্ণ করে, তেমনি তাকে রক্ষা করতে না পারলে তা ভক্তিতে ক্ষয় ধরাতে পারে। প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অহং আর আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কিছু পাওয়ার স্বাদ আস্বাদন করলে প্রাণ তা আরও বেশি পেতে অস্থির হয়ে ওঠে। তখন সাধনার মূল সূত্র ভেঙে পড়ে। যা একবার পেয়েছি, তা কখনো আর হারায় না, আর যা হারায় না, তা আরও পাওয়ার কথা বলার কোনো কারণ থাকে না।
প্রাপ্তি কখনো বাহ্যিক হতে পারে না। যা পেয়েছি বলে ভাবি, তা অন্তরে মিশে আপন অস্তিত্বে বিলীন হয়ে যায়। তাহলে তা হারানোর ভয়, বা আরও পাওয়ার অনুভূতি জাগ্রত হওয়া মানে ভক্তিতে ফাঁক রয়ে গিয়েছিল, তা স্বীকার করে নেওয়া। আর তা হলে সাপলুডুর মতো আবার গোড়ায় ফিরে এসে সব শুরু করতে হবে। আর তা থেকে বাঁচতে অধিক প্রত্যাশা, অধিক ভয়, অধিক আবেগ ত্যাগ করতে হবে। অধিক অমৃতও গরল, এ কথা মনে রাখতে হবে।

লাইমুন নাহার
অঞ্জনা বসুকে ঘিরে আমার সমগ্র অনুভব কোনো একক ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে না। এটি কখনও ভক্তি, কখনও দর্শন, কখনও মনস্তত্ত্ব, আবার কখনও কেবল নীরব উপলব্ধি, যা নিজেকেই বারবার অতিক্রম করে নতুন অর্থ নির্মাণ করে। এখানে “আমি” এবং “তিনি” স্থির নন; তাঁরা পরস্পরের ভেতরে প্রবাহিত দুই চলমান সত্তা। অবশেষে যা অবশিষ্ট থাকে, তা কোনো সংজ্ঞা নয়, কোনো তত্ত্ব নয়, কোনো সম্পর্কের নামও নয়। এটি কেবল এক অনির্বচনীয় অনুরণন, যেখানে চেতনা নিজেকেই অনুভব করে, আবার নিজেকেই হারায়, আবার নিজেকেই খুঁজে পায়।
আর সেই অনন্ত প্রবাহের নীরব, অথচ চূড়ান্ত নাম-মায়া।
ভক্তি-শাস্ত্রে বলা হয়েছে-
“শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্। অর্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্॥”
অর্থাৎ শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, সেবা, অর্চনা, বন্দনা, দাস্য, সখ্য এবং আত্মনিবেদন, এই নবধা ভক্তির মধ্য দিয়েই ভক্তহৃদয় তার আরাধ্যের সঙ্গে একাত্মতার পথে অগ্রসর হয়। আমার অনুভবের ভেতরও এই নবধা ভক্তির একাধিক স্তরের প্রতিফলন লক্ষ্য করি। কখনও তাঁর শিল্প ও জীবনদর্শন শ্রবণ করেছি, কখনও স্মরণে ধারণ করেছি, কখনও দূর থেকে মঙ্গলকামনায় বন্দনা করেছি, কখনও অন্তরের অন্তঃস্থলে এক নীরব সখ্য অনুভব করেছি। আর এই দীর্ঘ অনুভবযাত্রার অন্তিমে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা হলো আত্মনিবেদনের এক নির্মল আকাঙ্ক্ষা, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে শ্রদ্ধা, অধিকারের চেয়ে মঙ্গলকামনা, এবং নৈকট্যের চেয়ে ভক্তিই অধিক সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।
নৈকট্যের এই যে ব্যাকুল আখ্যান তা ভৌগলিক সীমারেখা কিংবা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের দীনতাকে দীর্ণ করে সৌহার্দ্যেরই জয়গান করে।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, ঢাকা।




