Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

আষাঢ় ২২ ১৪৩৩, মঙ্গলবার ০৭ জুলাই ২০২৬

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

বহুমাত্রিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:১২, ৭ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১৬:২০, ৭ জুলাই ২০২৬

প্রিন্ট:

প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গোসাই জোয়াইর আজিম মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনাকাটার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, একই বিল নম্বর একাধিকবার ব্যবহার এবং বিভিন্ন খাতে জাল কাগজপত্র দাখিল করে প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন, শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায় এবং বিদ্যালয়ের করণিক জহিরুল ইসলাম প্রায় ১১ লাখ টাকার বেশি আত্মসাত করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে গঠিত অডিট ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদকের হাতে আসা ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বিভিন্ন বিল-ভাউচার, ভাউচার নম্বর এবং আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের নামে একাধিক ভুয়া বিল তৈরি করে সরকারি ও বিদ্যালয় তহবিলের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে পরীক্ষার কাগজ ও প্রশ্নপত্র কেনার কথা উল্লেখ করে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির নামে চারটি ভুয়া বিল তৈরি করে বিদ্যালয় তহবিল থেকে মোট ৮৬ হাজার ৭০০ টাকা উত্তোলন করা হয়।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন বলেন, “একই নম্বরের একাধিক বিল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি বিল বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আলাদা বিল নম্বর থাকে। কেউ যদি একই নম্বর ব্যবহার করে একাধিক বিল জমা দিয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো ভুয়া বিল। এর দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির।”

একইভাবে উপজেলা শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের নামে তিনটি বিল দেখিয়ে ৬১ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম পরে প্রকৃত বিলের কপি পাঠালেও প্রতিবেদকের হাতে থাকা বিলের সঙ্গে তার কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি কেনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো যন্ত্রপাতি না কিনেই ঢাকার টিকাটুলির ঠিকানা ব্যবহার করে ‘মেসার্স শাহরিয়ারস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া প্যাড ও দরপত্র তৈরি করে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা ব্যক্তি আনোয়ার বলেন, “এ নামে আমার কোনো দোকান নেই। আমি কখনো কোনো টেন্ডারে অংশ নিইনি। কোনো বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে বিল করার প্রশ্নই আসে না।”

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের পুকুর লিজের ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এছাড়া ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের ২ লাখ ১ হাজার ৮৭০ টাকার উপবৃত্তির পুরো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে।

এছাড়াও প্রিন্টারের কালি, কম্পিউটার মেরামত, টেলিটক, এনটিআরসিএ, বিজয় দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীসহ বিভিন্ন খাতে নামমাত্র ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে দাখিলকারীর নাম, ঠিকানা ও স্বাক্ষরবিহীন ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে মোট ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৪০১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়ও ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৪ টাকা আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট তৈরি না করেই বিল দেখিয়ে টাকা উত্তোলন, বিদ্যালয়ের অর্থে ব্যক্তিগত দাওয়াত, ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনায় মাইকিং ও গণমাধ্যমে প্রচারের খরচ, শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে অংশগ্রহণ, এমনকি বিল জমা দেওয়ার আগেই অনুমোদন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের করণিক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ ও প্রশংসাপত্র তৈরি করে প্রতি সনদ ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে বিক্রির মাধ্যমে লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি এস এম নূরুল আলম রেজভী বলেন, “অভিযোগের পর অভিভাবক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে গঠিত অডিট ও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাদের অনিয়ম প্রমাণ হয়েছে। তারা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বললেও এখনো পরিশোধ করেননি। এসব ভুয়া বিল-ভাউচারের কোনোটি আমার কমিটির অনুমোদন নিয়ে করা হয়নি। আমি দায়িত্বে থাকাকালে শিক্ষকদের ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা বকেয়া বেতন নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করেছি। এখন শুনছি শিক্ষকদের ১১ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, অথচ প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সব অভিযোগ সত্য নয়। তবে কিছু ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি অডিট পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়কের কাছে জানিয়েছি। আশা করছি, সেটি সমাধান হবে।”

টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন মিয়া বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি আগে জানা ছিল না। যদি এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায় বা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সহকারী শিক্ষক সুবীর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে পূর্বের একটি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলাও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

Walton
Walton