ছবি সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। চিঠিটি দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের কাছে পৌঁছানোর পর প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে কি আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? যদিও তেহরানের কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনার দায়িত্ব ও কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ভ্যান্সের চিঠি রেজাইয়ের কাছে পৌঁছানোর পর ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, আলোচনায় গালিবাফের জায়গা নিয়েছেন রেজাই।
গত সপ্তাহে একটি ব্যতিক্রমী বৈঠকে গালিবাফের অনুপস্থিতি এই জল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান। তাঁরা তিনজনই মক্কা চুক্তির সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন। বৈঠকে ইরানের পক্ষে অংশ নেন রেজাই ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
গালিবাফের অনুসারীদের বক্তব্য, তথাকথিত ‘তেহরান সম্মেলন’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ছিল না। বরং মক্কা চুক্তিতে ইরানের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টিই সেখানে আলোচনার মূল বিষয় ছিল।
এর আগেও মে মাসে গালিবাফকে আলোচক দল থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন উঠেছিল। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই দাবি নাকচ করা হয়।
গালিবাফই প্রধান আলোচক, দাবি সরকারের
ইরানের কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় গালিবাফের নেতৃত্বেই কাজ চলছে।
গত ৩১ অক্টোবর, শনিবার আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরান এখনো গালিবাফকেই প্রধান আলোচক হিসেবে বিবেচনা করছে। রেজাইও এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সমর্থন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যোগাযোগ শুরুর উদ্যোগ সম্পর্কে আরাগচি বলেন, ‘সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার দরজা আরও বিস্তৃতভাবে খুলতে মার্কিন পক্ষের চেষ্টা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এই চিঠি পাঠানোর উদ্দেশ্য যদি ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিভেদ তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে আগের ভুলগুলোর সঙ্গে সেটিও আরেকটি ভুল হিসেবে যুক্ত হবে।’
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও একই অবস্থান জানান। তাঁর ভাষ্য, গালিবাফই দেশটির প্রধান আলোচক। আর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে।
পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য ও রক্ষণশীল কট্টরপন্থীদের ঘনিষ্ঠ মানুচেহর মোত্তাকিও গালিবাফকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার খবর নাকচ করেছেন।
সোমবার সংস্কারপন্থী সংবাদমাধ্যম ইনসাফ নিউজকে তিনি বলেন, ‘রেজাইয়ের নিয়োগের পরও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গালিবাফের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা প্রমাণ করে, এই প্রক্রিয়ায় তিনি এখনো কার্যকরভাবে যুক্ত রয়েছেন।’
রেজাইয়ের ক্ষমতা বাড়ায় উচ্ছ্বসিত কট্টরপন্থীরা
সরকারি বক্তব্যে গালিবাফের অবস্থান অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হলেও ভ্যান্সের চিঠিকে কেন্দ্র করে ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদমাধ্যম ও পায়দারি ফ্রন্টের সমর্থকদের একাংশ রেজাইয়ের বাড়তি প্রভাবকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা গালিবাফের প্রভাব কমার সম্ভাবনা নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করছে।
পায়দারি পার্টির ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম রাজা নিউজ ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, যুদ্ধকালীন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র আলোচক দল থেকে সরে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয়ের দিকে যাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে সাম্প্রতিক দুটি বৈঠকের মধ্যেও পার্থক্য তুলে ধরেছে।
রাজা নিউজের দাবি, গালিবাফের সঙ্গে বৈঠকে খামেনি পার্লামেন্ট ও সরকারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যা সমাধান এবং কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে রেজাইয়ের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার বিষয় ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে দরকষাকষিতে ইরানের নতুন সাতটি শর্ত বাস্তবায়ন।
কট্টর রক্ষণশীলদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি সংবাদমাধ্যম নোবোনিয়াদ ৩০ অক্টোবর জানিয়েছে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার প্রচার ও গণমাধ্যমবিষয়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিতে গালিবাফের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও উপদেষ্টারা ছিলেন। একজন ‘জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার’ নির্দেশে কমিটিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমটির দাবি।
এরপর রাজা নিউজ ‘রেজাইয়ের প্রতি সমর্থনে গালিবাফের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ কেন?’ শিরোনামে আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। এতে অভিযোগ করা হয়, গালিবাফের অনুসারীরা রেজাইয়ের প্রতি সমর্থনকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, গালিবাফের প্রভাব কমে যাওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সন্তুষ্ট হয়ে রেজাইকে সামনে আনছেন।
গালিবাফের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ
রাজা নিউজ শুধু নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেই থেমে থাকেনি, পার্লামেন্টের স্পিকারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগও তুলেছে।
সংবাদমাধ্যমটির দাবি, সর্বোচ্চ নেতার অনুমতি ছাড়াই গালিবাফ যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিলেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত মেনে নিয়েছে বলে তিনি মিথ্যা দাবি করেছিলেন। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করে ইসলামাবাদে পারমাণবিক আলোচনা শুরু করেছিলেন বলেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া লেবাননকে উদ্ধারের বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সুইজারল্যান্ড সফর এবং ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
রাজা নিউজের ভাষ্য, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গালিবাফ ও তাঁর রাজনৈতিক সহযোগীরা চাইলে রেজাইয়ের মতোই বিপ্লবী শক্তিগুলোর সমর্থন পেতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা সর্বোচ্চ নেতার নীতির চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এর ফলেই তাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম কঠোর তিরস্কারের মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
এ ক্ষেত্রে গত ১৮ জুন মোজতবা খামেনির দেওয়া একটি বার্তার কথা উল্লেখ করেছে রাজা নিউজ। ওই বার্তায় খামেনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে তাঁর নিজের অবস্থান ভিন্ন ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট যখন নিজের এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অন্য সদস্যদের পক্ষ থেকে আশ্বাস দিয়ে চুক্তির দায়ভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি সেটিতে অনুমতি দেন।
আরাগচি সম্প্রতি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও একটি সুযোগ দেওয়ার যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিরও সমালোচনা করেছে রাজা নিউজ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই মন্তব্যকে সংবাদমাধ্যমটি ‘নির্বাচনে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা ট্রাম্পের জন্য বিশেষ উপহার’ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এই বক্তব্য পেন্টাগন ও তেল আবিবের সামরিক অভিযান পরিচালনাকারীদের কাছে ইরানের সামরিক দুর্বলতার সরাসরি সংকেত পাঠিয়েছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে সাইয়েদ আব্বাস আরাগচির আচরণ দুঃখজনকভাবে এমন একজনের মতো, যিনি শত্রুপক্ষ বিপর্যয়ের মুখে পড়লে এবং বিপদের কাছাকাছি পৌঁছালে তার স্বার্থ রক্ষায় সামনে চলে আসেন।’
ক্ষমতার দ্বন্দ্বের দাবি মানছেন না মধ্যপন্থীরা
গালিবাফ কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ইরানের মধ্যপন্থী রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম খবর অনলাইন রাজা নিউজের অবস্থানকে ‘উপরিভাগের সমর্থন’ বলে বর্ণনা করেছে।
তাদের যুক্তি, রেজাইয়ের অবস্থানের প্রতি সমর্থন দেখানোর আড়ালে মূলত গালিবাফকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে রাজা নিউজ।
সোমবার ‘যে দ্বৈরথ কখনো তৈরি হয়নি: একই পক্ষে গালিবাফ ও রেজাই’ শিরোনামে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে মধ্যপন্থী সংবাদমাধ্যম আসরে ইরান বলেছে, মার্কিন চিঠির উদ্দেশ্য যদি ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই চেষ্টা কার্যত সফল হয়নি।
সংবাদমাধ্যমটির মতে, ওয়াশিংটনের এমন কোনো উদ্দেশ্য না থাকলেও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কেউ কেউ ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়ে দুই কর্মকর্তার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরির চেষ্টা করেছে। অথচ প্রকাশ্যে দুজনই এমন বিভাজনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আসরে ইরান বলেছে, শনিবার টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাইয়ের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের দায়িত্ব ও কার্যক্রম বাড়ানো কিংবা কাউন্সিলের সচিবকে সরাসরি চিঠি পাঠানোর অর্থ এই নয় যে, তিনি আলোচক দলের প্রধানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
সংবাদমাধ্যমটির বক্তব্য, বিদেশি সরকারগুলো কাকে চিঠি পাঠাবে, তা নিজেরাই ঠিক করতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার তাদের নেই।
আসরে ইরানের মন্তব্য, ‘ভ্যান্সের চিঠিটি বিভেদ তৈরির একটি ইস্যু হয়ে উঠতে পারত। দেশের ভেতরের কিছু পক্ষও এই দ্বৈত অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রেজাই, আরাগচি ও বাঘাইয়ের সমন্বিত বক্তব্য দেখিয়েছে, অন্তত এই ঘটনায় কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা বড় বাধার মুখে পড়েছে। দায়িত্ব ভাগাভাগি হতে পারে, বক্তব্যের ভাষায় পার্থক্য থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু ইরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একটিই।’
তেহরানের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে স্পষ্ট, গালিবাফ ও রেজাইয়ের দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও দেশটির কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন। তবে ভ্যান্সের চিঠিকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা ইরানের যুদ্ধকালীন কূটনীতি ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল




