Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ১৭ ১৪৩৩, সোমবার ০২ নভেম্বর ২০২৬

পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি জোরালো হচ্ছে ইরানের সরকারি মহলে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৪৯, ২ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি জোরালো হচ্ছে ইরানের সরকারি মহলে

ছবি সংগৃহীত

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি ইরানের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। এবার সেই দাবি দেশটির সরকারি বিভিন্ন মঞ্চ, সংসদ সদস্যদের বক্তব্য এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। ইরানের পারমাণবিক নীতিমালা পরিবর্তন করে পারমাণবিক বোমা তৈরির অনুমোদন দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন ক্ষমতাসীন শিবিরের একাংশ। তবে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তার দাবি, এ বিষয়ে এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি গত ৩১ অক্টোবর বলেন, পারমাণবিক নীতিমালা পরিবর্তনের বিষয়ে সরকার কিংবা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল এখনো নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে যুদ্ধ আবার শুরু হলে বর্তমান নীতি বহাল রাখা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

রেজায়ির ভাষ্য, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পর দেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনে ইরান পূর্ণ সহযোগিতা করলেও দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষ প্রশ্ন তুলছে, তেহরান কেন আগের নীতিতে অটল থাকবে। এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কারণে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে ইরানের সরে যাওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে।

খামেনির ফতোয়া পরিবর্তনের দাবি
ইরানের কট্টরপন্থীরা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেওয়া পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন নিষিদ্ধের ধর্মীয় নির্দেশ বা ফতোয়া বাতিলের আহ্বান জানাচ্ছেন।

কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য আহমদ নাদেরি অক্টোবরে ‘খানেহে ইকতেসাদ’ পত্রিকাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই। তাই পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে আলী খামেনির ফতোয়া পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। মোজতবা খামেনির আচরণ দেখে তাঁর ধারণা, নতুন নেতার ফতোয়া ভিন্ন হতে পারে।

এদিকে, শনিবার ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে মোজতবা খামেনি যেকোনো হুমকির তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা না রাখার কথাও বলেছেন তিনি। তবে ওই বৈঠকের প্রকাশিত বিবরণে পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো নির্দেশনার উল্লেখ নেই।

পারমাণবিক বোমার পক্ষে সরব সংসদ সদস্যরা
দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি জোর পাচ্ছে। তেহরানের অন্তর্বর্তীকালীন জুমার নামাজের খতিব মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলি আকবারি শুক্রবার বলেন, পারমাণবিক নীতিমালা পর্যালোচনার দাবি কোনো আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি জাতীয় সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ।

রাজাভি খোরাসান প্রদেশে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আহমদ আলামোলহোদা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, শত্রুকে ভয় দেখানোর জন্য যা প্রয়োজন, এমনকি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানাও ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক হতে পারে।

রোববার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নাঘদালি বলেন, সরকারপন্থী বিক্ষোভকারীদের স্লোগানেও পরিবর্তন এসেছে। আগে তাঁরা বলতেন, ‘পারমাণবিক শক্তি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার’। এখন সেই স্লোগান বদলে হয়েছে, ‘পারমাণবিক ওয়ারহেড আমাদের অবিচ্ছেদ্য অধিকার’।

সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য আহমদ বাখশায়েশও বলেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে প্রথমে বোমা তৈরি করে পরে এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। তাঁর মতে, বোমা তৈরি না করে চুক্তি থেকে সরে গেলে আইএইএর তদারকির আওতায় থাকার যে সুবিধা রয়েছে, তা হারাবে তেহরান।

জনসমর্থনের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষের রাজনীতিকেরা বিষয়টিকে জনদাবি হিসেবে তুলে ধরছেন। হাজ আলি আকবারির দাবি, বিভিন্ন জনমত জরিপে ৭০ শতাংশের বেশি ইরানি নাগরিক পারমাণবিক নীতিমালা পুনর্বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে কোন জরিপের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে, কিংবা জরিপগুলোর পদ্ধতি কী ছিল, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে, কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান গত ২৯ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, কোম শহরে সরকারপন্থী এক সমাবেশে তিনি সর্বোচ্চ নেতার কাছে পারমাণবিক বোমা তৈরির অনুমোদন চেয়েছেন। তাঁর দাবি, উপস্থিত জনতা এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে এই দাবির বিরোধিতা করছেন সংস্কারপন্থী রাজনীতিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, প্রকৃত জনমত যাচাই না করে পুরো দেশের মানুষের সমর্থন রয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গণভোট আয়োজনের দাবিও উঠেছে।

রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা
পারমাণবিক নীতিমালা পরিবর্তনের আলোচনা নিয়ে ইরানের ভেতরেই ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নুর নিউজ শনিবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে সতর্ক করে বলেছে, এমন স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তকে শুধু পক্ষে-বিপক্ষের রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। জনতার আবেগ কিংবা রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সব বিকল্প পর্যালোচনা করতে হবে।

নিবন্ধে বলা হয়, জনগণের মতামত অবশ্যই শুনতে হবে। তবে জনসমাগমের স্লোগানকে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

মধ্যপন্থী সংবাদমাধ্যম আসর-ই ইরানও পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি সামনে আনার বিরোধিতা করেছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংস্কারপন্থী ফ্রন্টের মুখপাত্র জাভাদ ইমামও সতর্ক করে বলেছেন, পারমাণবিক নীতিমালা পরিবর্তন কিংবা বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত কোনো সাধারণ রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ জড়িত। তাঁর প্রশ্ন, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কারও পক্ষে পুরো জাতির হয়ে এমন সিদ্ধান্তের দাবি তোলা কতটা যুক্তিসংগত?

সব মিলিয়ে, ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও দেশটির নীতিনির্ধারকেরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দেননি।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

Walton
Walton