Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ১৮ ১৪৩৩, মঙ্গলবার ০৩ নভেম্বর ২০২৬

হরমুজ ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা, ইরানকে কঠোর বার্তা আরব দেশগুলোর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৫৯, ৩ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

হরমুজ ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা, ইরানকে কঠোর বার্তা আরব দেশগুলোর

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন বিমানবাহী রণতরীর ফ্লাইট ডেক থেকে একটি মার্কিন নৌবাহিনীর এমএইচ-৬০আর সি হক (MH-60R Sea Hawk) হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করছে; এই রণতরীটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবরোধ কার্যকর করার কাজে সহায়তা করছে। ছবি সংগৃহীত

ইরান যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে এককভাবে কিংবা সম্মিলিতভাবে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। তেহরানকে এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে কয়েকটি আরব দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কায় যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার হচ্ছে, তখনই সামনে এল এই কঠোর অবস্থান। সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশ দুটি বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা মহড়া চালাচ্ছে। আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত বড় একটি জ্বালানি সম্মেলনেও এর প্রভাব পড়েছে। সরকারি পরামর্শে সম্মেলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন অতিথি নির্ধারিত সময়ের আগেই অবস্থান সংক্ষিপ্ত করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সৌদি আরবেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার মুখে দেশটির রাজধানী রিয়াদের স্কুলগুলো চলতি সপ্তাহেও অনলাইনে ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। ইউএইর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, তাঁর দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা দেখতে চায়। তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ পরিণতির জন্যও তারা প্রস্তুত রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। রোববার গভীর রাতে সৌদি আরবের একটি বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় একটি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে দুটি অজ্ঞাত বস্তু নিক্ষেপ করা হয়। সোমবার ভোরে ওমান উপকূলের কাছেও আরেকটি জাহাজ অজ্ঞাত বস্তু দিয়ে হামলার শিকার হয়।

এর মধ্যেই সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পূর্ব অংশে একটি মাইনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তেলবাহী একটি জাহাজে আগুন ধরে যায়। এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

হরমুজ প্রণালিতে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

দোহা থেকে তেহরান, চলছে সমঝোতার চেষ্টা
রোববার দোহা ছেড়েছেন ইরানের আলোচকেরা। তবে তাঁদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তৈরি করা একটি খসড়া প্রস্তাব তখনো বিভিন্ন পক্ষের মতামতের জন্য ঘুরছিল। এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সোমবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির একটি সূত্র জানায়, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হলেও কূটনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে কোনো বড় সাফল্য আসেনি। তেহরান এখনো তাদের দেওয়া সাতটি শর্তে অনড় রয়েছে।

এদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতার কাছাকাছি আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে কাতার। গত এক সপ্তাহের মধ্যে দেশটির তৃতীয় একটি প্রতিনিধিদল সোমবার তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ইরানের এক অবহিত সূত্রের বরাতে এ খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদ।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আবার শুরুর পথ তৈরি করতে তিন দিনের একটি সমঝোতা কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করেছেন। এতে আস্থা তৈরির লক্ষ্যে কয়েকটি ধারাবাহিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না। অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁর কোনো তাড়া নেই।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘একভাবে হোক বা অন্যভাবে, আমরা কিছু একটা করব। তবে কোনো তাড়া নেই।’

ট্রাম্প প্রশাসনেও মতপার্থক্য
ইরানকে নিয়ে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও মতের পার্থক্য দেখা দিয়েছে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে। তাঁদের অবস্থান হলো, নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা কিংবা এখনই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে না গিয়ে চাপ বজায় রাখা।

অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ট্রাম্পকে সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

সোমবার এ বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ভ্যান্সও। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর পথে ওয়াশিংটন কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাঁর কথায়, ‘প্রেসিডেন্ট এবং আমি দুজনই আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অবশ্যই কিছু অগ্রগতি করেছি। এখন দেখা যাক, আরও কিছুটা এগোনো যায় কি না।’

নির্বাচনের পর বড় হামলার পরিকল্পনা ট্রাম্পের?
কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা কাটেনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানোর দিকেই ঝুঁকছেন ট্রাম্প। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করবেন কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে পত্রিকাটি জানিয়েছে, গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ট্রাম্প। ওই আলাপে তিনি জানান, সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সফল হওয়ার সুযোগ দিতে চান।

ফলে একদিকে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক চাপ, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি-দুইয়ের মাঝখানে এখন চলছে সমঝোতার চেষ্টা। তবে আলোচনার অগ্রগতি কত দূর যাবে, আর শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

Walton
Walton