ছবি: সংগৃহীত
মৈত্রী এক্সপ্রেস কেবল বাংলাদেশ ও ভারতের ট্রেন যোগাযোগে যুগান্তকারী অর্জনের প্রতীকই নয়, এটি দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের অপরিহার্যতার প্রকৃষ্ঠ উদাহরণও বটে। উভয় দেশের অভিন্ন ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বন্ধনের কথা বিবেচনা করে, বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথভাবে ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষের শুভলগ্নে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই আন্তঃসীমান্ত পরিষেবা চালুর মাধ্যমে উভয় দেশ ১৯৬৫ সালে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠার যৌথ লক্ষ্য অর্জন করে। প্রকৃত অর্থে, ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কের প্রতীক এবং এটি জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ জোরদার করার ক্ষেত্রে উভয় দেশের অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
জেনে নেব, মৈত্রী এক্সপ্রেস কি কি ক্ষেত্রে দেশের জনগণের জন্য যুগান্তকারী অর্জন বয়ে এনেছে। উভয় দেশের মধ্যে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ সীমান্ত-সংলগ্ন উভয় দেশের মানুষকে কাছাকাছি আনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতের প্রসার এবং বয়স্ক ও চিকিৎসার প্রয়োজনে ভ্রমণকারীদের জন্য ঝামেলামুক্ত যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উল্লেখ্য যে, যাত্রীদের ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ১৯ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত মোট ২,৮৮,৩৬০ জন যাত্রী এই ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই যাত্রীদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। ট্রেনটির আসন পূর্ণতার হার (অকুপেন্সি) সাধারণত ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে থাকত। তবে ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটির সময় আসন পূর্ণতার হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের যাত্রীদের কাছে এই ট্রেনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। অবশ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়। তখন থেকেই উভয় দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কবে আবার এই ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালু হবে।
আরও উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে, এই ট্রেন থেকে নির্ধারিত আয়ের ৭৫ শতাংশই পাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ভারতীয় অংশে—অর্থাৎ কলকাতা থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন পর্যন্ত—ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে এসি সিটের জন্য ৩০ মার্কিন ডলার এবং এসি চেয়ার কার সিটের জন্য যাত্রীপ্রতি ২০ মার্কিন ডলার। এর ওপর কোনো অতিরিক্ত মাশুল বা চার্জ ধার্য করা হয়নি। আন্তঃসীমান্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার সমঝোতা স্মারক (MoU) অনুযায়ী, ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রী বুকিং থেকে প্রাপ্ত মোট আয়ের ৭৫% অংশ বাংলাদেশ রেলওয়ে পায় এবং বাকি ২৫% ভারতীয় রেলওয়ের খাতে জমা হয়।
‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’-এর অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেনটি সপ্তাহে ৫ দিন চলাচল করত। এটি সকাল ৮:১৫ মিনিটে ঢাকা স্টেশন থেকে ছেড়ে বিকেল ৪:০০টায় কলকাতায় পৌঁছায়। ফিরতি পথে, এটি কলকাতার চিৎপুর টার্মিনাল স্টেশন থেকে সকাল ৭:১০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে এবং বিকেল ৩:৩৫ মিনিটে ঢাকা স্টেশনে পৌঁছায়। তাত্ত্বিকভাবে, ঢাকা স্টেশন থেকে কলকাতায় পৌঁছাতে ট্রেনটির সময় লাগত ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট এবং কলকাতা থেকে ঢাকা স্টেশনে ফিরতে সময় লাগত ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। তবে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে—বিশেষ করে ঢাকা স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী এবং সেখান থেকে দর্শনা পর্যন্ত—ট্রাফিক বা চলাচলের চাপের কারণে যমুনা সেতু হয়ে যাত্রা সম্পন্ন করতে অনেক সময় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত।
ট্রেনটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেক (ট্রেনের বগির সমষ্টি) নিয়ে চলাচল করত, যাতে ১০টি যাত্রীবাহী কোচ থাকত , যার মধ্যে ৪টি এসি ফার্স্ট ক্লাস কোচ, ৪টি এসি চেয়ার কার কোচ এবং ২টি পাওয়ার কার। সপ্তাহে ৫ দিন চলাচলের সূচি বজায় রাখার জন্য মোট তিনটি রেক বা ট্রেনের সেট ব্যবহার করা হতো। এর মধ্যে ২টি রেক ভারতীয় রেলওয়ে এবং একটি রেক বাংলাদেশ রেলওয়ে সরবরাহ করেছিল।
এই কোচগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন; যেমন—এতে রয়েছে অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক কাঠামো, হালকা ওজনের বডি, উচ্চ গতিতে চলার সক্ষমতা, উন্নত সাসপেনশন ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে যাত্রাপথে যাত্রীদের জন্য অধিকতর সুযোগ-সুবিধা ও উন্নত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেনের মোট আসন সংখ্যা ৪৫৬টি। যাত্রীরা বিনামূল্যে সর্বোচ্চ ৩৫ কেজি পর্যন্ত ব্যক্তিগত মালপত্র সাথে বহন করতে পারেন।
বিমান ভ্রমণের মতোই অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন ছাড়পত্রের সুবিধা রয়েছে ট্রেনটিতে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভ্রমণের সময় কমানোর লক্ষ্যে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’-এ ‘এন্ড-টু-এন্ড’ (যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) অভিবাসন ছাড়পত্রের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে গেদে ও দর্শনা স্টেশনে যাত্রাপথে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা বা বিরতির প্রয়োজন কমেছে এবং যাত্রীদের জন্য ভ্রমণ অনেক বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। ট্রেনটিতে ভ্রমণে সবচেয়ে বড় সুবিধার দিক হচ্ছে, এতে চেপে মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কলকাতা পৌছে যেতে পারবে যাত্রীরা। আর পদ্মা সেতু রুট ভ্রমণের সময় ৩ ঘণ্টা এবং ভাড়া প্রায় ১০০০ টাকা কমিয়ে আনাও সম্ভব।
পরিষেবা স্থগিত হওয়ার আগে, ট্রেনটি টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু-ঈশ্বরদী-দর্শনা রেলপথে চলাচল করত। এই পথে ঢাকা থেকে কলকাতার মোট দূরত্ব ৩৯২ কিলোমিটার। পথটি দীর্ঘ ও ঘুরপাক খাওয়া সত্ত্বেও—এবং বিকল্প কোনো ব্রড-গেজ রেলপথ না থাকায়—পদ্মা সেতু চালুর আগে কেবল ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ই নয়, বরং দর্শনা, বেনাপোল, যশোর ও খুলনাগামী অন্যান্য যাত্রীবাহী ট্রেনও যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করত। এই পথে কমলাপুর থেকে বেনাপোল যেতে ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত। তবে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর রেলপথ চালু হওয়ার পর কমলাপুর স্টেশন থেকে বেনাপোল যাওয়ার সময় কমে ৪ ঘণ্টায় নেমে আসে।
বর্তমানে এই পথে ‘রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস’ চলাচল করছে, যা কমলাপুর স্টেশন থেকে বেনাপোল পৌঁছাতে সময় নেয় প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪ মিনিট। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ঢাকা স্টেশনের বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ যদি যমুনা সেতু-দর্শনা রুটের পরিবর্তে পদ্মা সেতু-বেনাপোল রুট দিয়ে চালানো হয়, তবে এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সময় সাশ্রয় সম্ভব। এতে যাত্রার সময় অন্তত ৩ ঘণ্টা কমে আসবে; অর্থাৎ ঢাকা থেকে কলকাতা (এবং বিপরীত পথে) মাত্র ৬ ঘণ্টায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। আর এমনটি ঘটলে টিকিটের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে—অন্তত ১০০০ টাকা—কমে আসবে এবং ট্রেনটি ঢাকা-কলকাতা রুটে আকাশপথের ভ্রমণের একটি বিকল্প হয়ে উঠবে।




