Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

শ্রাবণ ১ ১৪৩৩, শনিবার ১৮ জুলাই ২০২৬

শামছুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ ও নান্দনিক বৈচিত্র্য

লাইমুন নাহার সীমা

প্রকাশিত: ০২:০১, ১৮ জুলাই ২০২৬

প্রিন্ট:

শামছুল আলম আজাদের ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ ও নান্দনিক বৈচিত্র্য

ছবি: সংগৃহীত

একজন শিল্পী যখন তাঁর শিল্পসত্তার প্রকাশ ঘটান, সেটি উপস্থাপন করেন এবং সেই উপস্থিতিতে শিল্পরসিক বা দর্শক এসে শামিল হন-কখনও তাদের ভেতরে জমাকৃত অভিজ্ঞতার প্রতিফলনে, সুপ্ত জ্ঞান, বোধ ও অভিজ্ঞতার জাগরণ ঘটিয়ে। তখন একটি চক্র পূর্ণ হয় এবং এভাবেই চলতে থাকে শিল্পের যাত্রা।  

আলোচনা করব শিল্পী সামছুল আলম আজাদের তৃতীয় একক প্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ বিষয়ে। প্রথমেই মনে আসে ‘দৃশ্যমান’ শব্দটা আসলে কি? আমরা আসলে কি দেখি? দৃশ্যমান মানে তো রূপ। আর তাই-ই দৃশ্যায়িত হয়, যা আমরা দেখতে পাইনা অর্থাৎ অরূপ। শিল্প দেখার চোখ তৈরি করার একটা ব্যাপার আছে। সবাই সব কিছু দেখতে পান না আবার কেউ হয়ত ভিন্ন ভাবে দেখতে পান।

ধরা যাক, আমরা একটা গাছ দেখছি। আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো তার Appearance। কিন্তু গাছটির ইতিহাস, সময়, বৃদ্ধি, জীবন, প্রকৃত সত্তা, এগুলো হলো তার Being। যে গুলো আমরা হয়ত দেখতে পাইনা, কিন্তু আছে, সত্য। আমার কাছে মনে হয়, শিল্পী তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এর প্রকাশ ঘটায় আর দর্শক তার নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান অনুভব দিয়ে সেই অভিজ্ঞতাকে দেখে এবং মূল্যায়ন করে। সেজন্য শিল্পীর এবং দর্শকের দেখার ফলাফল ভিন্ন হয় কিন্তু এই ভিন্নতার লক্ষ্য অভিন্ন।

এই শিল্পকর্ম গুলোতে দর্শক, শিল্পপ্রেমীরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন। কিভাবে? এখানে যে ব্যক্তি নদী দেখেছে, তিনি এর ভেতর নদী দেখবেন। যিনি যুদ্ধ দেখেছেন, তিনি এর ভেতর ধ্বংস দেখবেন। স্মৃতি নিয়ে যে বাঁচেন, তিনি স্মৃতির মানচিত্র দেখবেন। যার ভেতর বিমূর্ত বা মূর্তের প্রভেদ নেই তিনি হয়ত কিছুই দেখবে না; কেবল রঙের প্রলেপ, টেক্সচার দেখবেন। হয়ত কেউ  অনুভব করবেন কিছু কালারের শীতলতা, কেউ হয়ত সেটুকও দেখবেন না। এভাবে তাদের ভেতরে অভিজ্ঞতা অনুভবের সংযোজন ঘটিয়ে দর্শকও হয়ে উঠবেন শিল্পের একটি অংশ। শিল্প দেখার চোখ তৈরি করার একটা ব্যাপার আছে এটা সত্য। সবাই তাই সব কিছু দেখতে পান না বা ভিন্ন ভাবে দেখতে পান-এটাই তো শিল্পের সর্বজনীনতা। 

শিল্পী একবার বলছিলেন, ‌তিনি রঙ আঁকেন। আমরা সাধারণত কোন এলিমেন্টকে কোন ফর্মকে ফুটিয়ে তুলতে রঙকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু রঙ নিজে যখন সাবজেক্ট তখন? তখনতো রঙকে আঁকতে হয়। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন দেখি Adjective যখন নিজে Noun হয়ে যায় তেমনি।

রঙের কথা বলতে হলে আমরা অবতারণা করতে পারি, ধারণাগত তত্ত্ব বা মেটাফোর (রূপক তত্ত্ব) ‌Palimpsest এর। ‌‌প্রাচীনকালে পশুর চামড়া (বিশেষত ভেড়া, ছাগল বা বাছুরের চামড়া) প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি লেখার উপকরণকে বলা হয় পার্চমেন্ট।কাগজ আবিষ্কারের আগে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে পার্চমেন্টে লেখা হতো। পশুর চামড়া সংগ্রহ করে তারপর চুনের পানিতে ভিজিয়ে লোম তুলে ফেলার পর কাঠের ফ্রেমে টানটান করে শুকানোর পর তা ঘষে মসৃণ করা হতো। এরপর কালি দিয়ে লেখা হতো। ভালো মানের পার্চমেন্ট শত শত বছর টিকে থাকতে পারে।

মধ্যযুগে পার্চমেন্ট খুবই দামি ছিল। সেজন্য মানুষ পুরনো লেখা মুছে আবার নতুন লেখা লিখতো। কিন্তু সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হতো না। নিচের লেখার হালকা চিহ্ন থেকে যেত। মূলত: এটাই Palimpsest। পরবর্তীতে এটা একটা নন্দনতাত্ত্বিক ধারণা হয়ে যায়। অনেকটা দেরিদার Trace থিওরি মতো।

এটা বলার কারণ হল, এই চিত্রকলাতে রঙের অনেকগুলো আস্তরণ আমরা দেখতে পাই। একটি ওপর আরেকটির আস্তরণে হয়তো আগের আস্তরণ ঝাপসা হয়েছে কিন্তু তার সত্তায় দাগ রেখে গেছে। ফলে রঙের ভেতরেও এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক আস্তরণের প্রলেপ ফুটে উঠেছে, আগে আস্তরণের সঙ্গে পরবর্তী আস্তরণের এই স্মৃতিময় আলাপচারিতাও কিন্তু যথেষ্ট দৃশ্যমান এখানে।

শিল্পী যেহেতু এই দেশের আলো, বাতাস, নদী দেখে বড় হয়েছেন; তারই বিন্যাস আমরা টের পাই-সেটা রঙে, টেক্চারে বা কাঠামোতে। হঠাৎ করে হয়ত এটি অতটা দৃশ্যমান নয় কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সব যেন এই সবুজ শ্যামল দেশেরই উত্তল, অবতল, সমভূমি,পাহাড় পর্বত, নদী-মাঠের আখ্যান। মানুষের দেখা শুধু দেখা নয়, তার অভিজ্ঞতার মিশ্রণ থাকে তাতে। আমরা যা দেখতে চাই তার বাইরে আমরা খুব কম দেখতে পারি। মার্লো-পঁতি বলেছিলেন ‘আমরা শুধু চোখ দিয়ে দেখি না, পুরো শরীর ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখি’। 

শিল্পী সামছুল আলম আজাদের এই চিত্রকর্মগুলো আসলে দৃশ্যমানতার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য কাঠামোকে রঙের স্তরে অনুবাদ করার সফল প্রয়াস। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই যে রূপ ও অরূপ এর ভেতর মানে-দৃশ্যমান কাঠামোর ভেতর অদৃশ্যমান কাঠামোর দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন এটাই এই ছবিগুলোর প্রধান নান্দনিক স্বার্থকতা।

৪ জুলাই শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হচ্ছে আজ শনিবার। এদিন বিকালে ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রক-এ সমাপনী আনুষ্ঠানে শেষ হবে এ প্রদর্শনী।  

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও গবেষক। 

Walton
Walton