Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

কার্তিক ১৬ ১৪৩৩, রোববার ০১ নভেম্বর ২০২৬

ফ্রান্সে আবারও লাখো মানুষের বিক্ষোভ, জার্মানিতে রাস্তায় জেন-জি

প্রকাশিত: ১২:১৫, ১ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১২:২০, ১ নভেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

ফ্রান্সে আবারও লাখো মানুষের বিক্ষোভ, জার্মানিতে রাস্তায় জেন-জি

ছবি সংগৃহীত

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এবার ছড়িয়ে পড়েছে জার্মানিতে। হ্যালোইনকে কেন্দ্র করে শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। একই দিনে ফ্রান্সেও নতুন করে রাজপথে নেমেছেন লাখো বিক্ষোভকারী। দুই দেশেই আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

জার্মানিতে ‘জেন জি হ্যাজ গট দিস’ (Gen Z Has Got This!) নামে তরুণদের নেতৃত্বে নতুন একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ পুনরায় চালুর সম্ভাব্য উদ্যোগের বিরুদ্ধে শনিবার রাজপথে নামেন আন্দোলনকারীরা। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, কোলন ও মিউনিখসহ বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ হয়।

জার্মানির রাজধানী বার্লিনে কর্মসূচি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোলন ও হামবুর্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।

কোলন পুলিশ জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভ মিছিল চলার সময় কয়েকজন আতশবাজি ফোটালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘আমাদের পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নয়; বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং জরুরি সেবাকর্মীদের ওপর হামলার পর দাঙ্গা পুলিশ মাঠে নামে। পুলিশের ভাষ্য, জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি ও নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ছোড়ার ঘটনা বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে দাঙ্গা পুলিশ।

ফ্রাঙ্কফুর্টেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়েছে এবং কয়েকটি দোকানের কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে। এ কারণে শহরের ব্যস্ত কেনাকাটার এলাকা সাইল স্ট্রিটের একাংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একটি অস্ত্রের দোকানের জানালার কাচ ভাঙার ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে দুটি অস্ত্রও জব্দ করা হয়েছে।

হ্যালোইনের দিনকে সামনে রেখে বড় পরিসরে কর্মসূচি আয়োজন করে ‘জেন জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের সংগঠনটি। বেশি মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনের দৃশ্যমানতা বাড়াতেই এ দিনটি বেছে নেওয়া হয় বলে আয়োজকদের বক্তব্য। সংগঠনটির দাবি, শনিবার জার্মানিজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ।

আন্দোলনটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘আমরা এমন একদল তরুণ, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যরা সিদ্ধান্ত নেবে আর আমরা নীরবে তা দেখে যাব-এমনটা আর মেনে নিতে চাই না।’

আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে আয়োজকেরা। এমনকি হ্যালোইনের পোশাক পরলেও মুখ খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিক্ষোভ ঘিরে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে জার্মান পুলিশ। দেশজুড়ে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বার্লিনের অভিজাত কেনাকাটার এলাকা কুরফুরস্টেনডামেও সতর্কতা দেখা গেছে। সম্ভাব্য ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকাতে সেখানকার বিলাসপণ্যের দোকানগুলোর কাচের জানালা ও সামনের অংশে কাঠের সুরক্ষাবেষ্টনী লাগানো হয়েছে।

ফ্রান্সে আবারও রাজপথে লাখো মানুষ
জার্মানির আন্দোলন ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভেরই নতুন সংযোজন। এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফ্রান্সে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। গত কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভে সেখানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। শনিবারও দেশজুড়ে নতুন কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা।

ফ্রান্সের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের পক্ষ থেকে শনিবারের কর্মসূচিকে তৃতীয় দফার বিক্ষোভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে ১৭ ও ২৪ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়। এবারের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী ও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদেরও যোগ দেওয়ার কথা ছিল।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে শুধু রাজধানী প্যারিসেই ছিলেন ৭০ হাজার। তবে আগের দুই সপ্তাহের তুলনায় এবার উপস্থিতি কম ছিল। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। গত সপ্তাহে সেই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশজুড়ে ২৯৬ জনকে আটক করা হয়েছে।

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আগে থেকেই সতর্ক অবস্থান নেয় ফরাসি প্রশাসন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ‘জনশৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি’ রয়েছে বলে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর নির্দেশনায় শহরের কেন্দ্রস্থলের বাইরে বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে অতিরিক্ত ৭০ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

শনিবারের কর্মসূচি বেশির ভাগ জায়গায় শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ছড়ায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বোর্দো, তুলুজ, রেন, লিল, নঁত, মার্সেই ও লিয়ঁসহ বিভিন্ন শহরে মিছিলের শেষভাগে থাকা উগ্রপন্থীরা শহরের কেন্দ্রস্থলে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাটের চেষ্টা করে। পুলিশ হস্তক্ষেপ করে তাদের সেই চেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।

ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র‍্যালি পার্টির নেতা জর্দান বারদেলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ‘তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি অগ্নিসংযোগকারী যন্ত্র’ নিক্ষেপকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, অপরাধীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে পাঠাতে হবে।

দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রিটানি এলাকার রেন শহরের পুলিশ জানিয়েছে, শনিবারের মূল মিছিল নির্ধারিত পথ ধরে শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়। কিন্তু কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর কয়েক শ সহিংস ব্যক্তি পুলিশের ওপর হামলা চালায়। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছোড়ে এবং কয়েকটি স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গত কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ১৯৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

হ্যালোইন ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ
হ্যালোইন উৎসবকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ সতর্ক করে বলেছেন, শনিবার রাত ৮টা থেকে দেশটির বিভিন্ন স্থানে আলাদা জমায়েতের ডাক দিয়েছে উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের একটি অংশ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি বার্তায় হ্যালোইনের প্রসঙ্গ টেনে ‘বিপ্লব’ ও ‘অভ্যুত্থানের’ আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। নুনেজ এসব বার্তাকে গুরুতর জনবিশৃঙ্খলা উসকে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। এ ধরনের জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘পার্জ’ (Purge) শব্দটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। হলিউডের একই নামের ডিস্টোপিয়ান চলচ্চিত্র সিরিজ থেকে শব্দটি নেওয়া হয়েছে। ওই কাহিনিতে বছরে একবার টানা ১২ ঘণ্টার জন্য সব ধরনের অপরাধকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে প্যারিস পুলিশ এক্সে দেওয়া বার্তায় সতর্ক করে বলেছে, ‘হ্যালোইন হলেও নিয়মের কোনো পরিবর্তন হবে না।’ জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখলে ১৫০ ইউরো জরিমানা হতে পারে বলে নাগরিকদের মনে করিয়ে দিয়েছে পুলিশ। একই সঙ্গে আসল কিংবা নকল-যেকোনো ধরনের অস্ত্র বহনের দায়ে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৪৫ হাজার ইউরো জরিমানার বিধানের কথাও জানানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে জাতীয় বিক্ষোভ
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। প্রথমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা স্কুলের জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, শিক্ষকসংকট নিরসন এবং শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া পরিবর্তনের দাবিও ছিল তাদের।

পরে সেই আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আগে গড়ে ওঠা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সদস্যরাও এতে যুক্ত হন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের দাবিকে ছাপিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণবিক্ষোভে রূপ নেয় কর্মসূচি।

গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের সহিংস দৃশ্য এখনো ফরাসি প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে রাজপথে নেমেছিলেন ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। তিন হাজারের বেশি দোকানে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এর মধ্যে কয়েকটি দোকান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে।

বিক্ষোভে আহত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতাকে ‘সম্মিলিত ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেন।

ইউটিউবার হুগো ত্রাভের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী নিজের দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেমে এমন ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়বেন-এমনটা নিশ্চয়ই আশা করেননি। একইভাবে কোনো পুলিশ সদস্যও এমন ভয়াবহ ও সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে পড়ার জন্য চাকরিতে যোগ দেননি।

এদিকে, আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে ধর্মঘট ও গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত আন্তসংগঠন জোট। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ওই কর্মসূচি ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শনিবারের বিক্ষোভের পর এখন ফ্রান্সের নজর আগামী ৫ নভেম্বরের কর্মসূচির দিকে।
সূত্র: সিএনএন

Walton
Walton