সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি
যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরান তার বর্তমান পরমাণুনীতি বহাল রাখবে, নাকি নতুন কোনো অবস্থান নেবে-এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি।
সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো চিঠি তিনি হাতে পেয়েছেন এবং সেটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন। তবে চিঠির জবাব এখনো দেননি।
রেজায়ি বলেন, ইরানের পরমাণুনীতি নিয়ে নতুন কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
তাঁর ভাষায়, ‘এখনো নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে আলোচনা হচ্ছে, আরেকটি যুদ্ধ শুরু হলে আমরা আগের মতো একই পরমাণুনীতি অনুসরণ করতে চাই কি না।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও বক্তব্যের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। রেজায়ির কথায়, ‘তাদের বক্তব্যের সুর পুরোপুরি বদলে গেছে। এটি খুবই ভালো লক্ষণ। আলহামদুলিল্লাহ, ইরানের জনগণ নিজেদের বিজয় ও শক্তিকে সুসংহত করেছে।’
ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে একাধিকবার বলেছেন, আপাতত দেশটির পরমাণুনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় নীতিটি পুনর্বিবেচনার সুযোগও উড়িয়ে দেননি তাঁরা।
গত সেপ্টেম্বরে আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও রেজায়ি পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ফতোয়ার প্রতি ইরানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং চাপের মুখে তেহরান পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন তিনি।
ইরান আবারও আলোচনায় ফেরার ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত পূরণের ওপর জোর দিচ্ছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে সব রণাঙ্গনে শত্রুতা বন্ধ, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের এক গ্রামও দেশের বাইরে পাঠানো হবে না বলে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে তেহরান।
পরমাণুনীতি পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে ইরানের জনগণ
রেজায়ি বলেন, ইরানের জনগণের কিছু ন্যায্য দাবি রয়েছে, যেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনে পূর্ণ সহযোগিতা এবং কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ চরিত্র নিশ্চিত করার পরও ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন এসব বাস্তবতা দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে-আমরা কেন আগের মতো একই শর্ত মেনে চলব? পরমাণুনীতি পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের মধ্যে দাবি তৈরি হয়েছে। নিজেদের দাবি জানানোর অধিকার ইরানের জনগণের রয়েছে। তবে সরকার এখনো এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।’
রেজায়ির মতে, শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনার পরও ইরানের স্থাপনায় বোমা হামলা এবং দেশটির ওপর সামরিক আক্রমণের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জোরালো করেছে।
তিনি বলেন, ইরান এখনো এনপিটির সদস্য। পরমাণু আলোচনা হলে চুক্তির আওতায় নিজেদের অধিকার আদায়ে দেশটি দৃঢ় অবস্থান নেবে।
রেজায়ির ভাষায়, ‘আমরা এনপিটির সদস্য এবং এই চুক্তির আওতায় আমাদের ২২টি অধিকার রয়েছে। পরমাণু আলোচনা নিয়ে কোনো প্রস্তাব বা প্রস্তাবনা এলে আমরা আমাদের অধিকার দাবি করব। ইরানের জনগণের স্বার্থ রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সঙ্গে সময়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছি। এখন আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
ভ্যান্সের চিঠি পেয়েছেন, তবে জবাব দেননি রেজায়ি
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চিঠি প্রসঙ্গে রেজায়ি বলেন, তিনি চিঠিটি পড়েছেন, তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর দেননি।
তাঁর দাবি, চিঠির ভাষা ও বক্তব্যের ধরন আগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের তুলনায় আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের এই পরিবর্তনকে ইরানের শক্তি ও বিজয়ের অন্যতম প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন তিনি।
তবে চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি রেজায়ি। তাঁর যুক্তি, মার্কিন পক্ষ এখনো চিঠিটি প্রকাশ্যে আনেনি।
সাত শর্ত পূরণ না হলে আলোচনায় বসবে না তেহরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়েও কথা বলেন ইরানের এই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তিনি জানান, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। ওয়াশিংটন আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনায় অংশ নেবে না।
রেজায়ি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছি, আমাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসব না। আমেরিকার আচরণ ও অবস্থানের পরিবর্তন দেখতে চাই আমরা। সাতটি শর্ত পূরণ করা সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রমাণ হতে পারে।’
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবগুলোকে অপর্যাপ্ত ও অস্পষ্ট বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রেজায়ির দাবি, প্রথম প্রস্তাবের পর দ্বিতীয় দফায় তুলনামূলক ভালো কিছু প্রস্তাব দিলেও সেগুলোর মধ্যে যথেষ্ট অস্পষ্টতা ছিল। তেহরানের আশঙ্কা ছিল, আলোচনার আড়ালে আবারও হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। তৃতীয় দফায় নতুন কিছু প্রস্তাব এলেও সেগুলোতেও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। এ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলছে।
ইসলামাবাদে আগে হওয়া সমঝোতা স্মারকের সঙ্গে বর্তমান সাত শর্তের পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনার মতো যেসব বিষয়ে আগে অস্পষ্টতা ছিল, নতুন শর্তগুলোতে সেগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে।
রেজায়ি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইরানের শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা চায় না ইরান
তেহরানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চার দেশের বৈঠক নিয়েও বক্তব্য দেন রেজায়ি। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় প্রমাণ করেছে, বাইরের কোনো শক্তি পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ধারণের দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের হাতে থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তেহরানের চার দেশের বৈঠককে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার সূচনা হিসেবেও উল্লেখ করেন ইরানের এই নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘তেহরানের চার পক্ষের বৈঠকে সবাই ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছে। এ ধরনের বৈঠক অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তও হয়েছে। ইনশা আল্লাহ, এই বৈঠক পশ্চিম এশিয়ায় নতুন ব্যবস্থার সূচনা করবে। এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এখানকার দেশগুলোই।’
রেজায়ির বক্তব্য, ইরানকে বাদ দিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় কোনো কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ন্যাটোর হাজার হাজার বিমান অভিযানসহ ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতাও ইরান দেখিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার ওপর জোর দেন রেজায়ি। তাঁর মতে, এমনভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ইরানে হামলা চালানোর সাহস না পায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমনভাবে যুদ্ধ শেষ করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ইরানে আক্রমণ করার সাহস না করে। ইরানের জনগণের অধিকার রক্ষায় আমরা দৃঢ় থাকব।’
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তাদের পরাজিত করার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। রেজায়ির ভাষায়, ‘আমেরিকা কোনো পদক্ষেপ নিলে আমরা তাকে পরাজিত করব। শত্রুপক্ষ কোনো ভুল করলে তাকে ভয়াবহ আক্রমণ ও গর্বিত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।’
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে, দাবি রেজায়ির
ইউরোপীয় নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে রেজায়ি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলার সময় জার্মানির চ্যান্সেলর সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। পশ্চিমাদের নোংরা কাজ ইসরায়েল করছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
রেজায়ির দাবি, এখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও স্বীকার করছেন, ইউরোপ ও বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো বিশ্বকেই তার মূল্য দিতে হবে-এ কথা এখন সবাই বুঝতে পারছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তাঁকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কারণ ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন রেজায়ি।
তাঁর দাবি, ইরানের জনগণের প্রতিরোধ ও সাহসিকতার কারণে বিশ্ববাসী দেশটির সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ধারণা পেয়েছে। এই যুদ্ধের চাপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবার অনুভব করছে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও।
গত ৪৭ বছরে ইরানে একটি সুসংহত জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করেন রেজায়ি। সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই বাস্তবতা সামনে এনেছে এবং দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্যের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে বলে তাঁর দাবি।
সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রেজায়ির মতে, ইরানের জনগণের দৃঢ় অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তেহরানের অবস্থানও এখন স্পষ্ট-নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় ইরান। ভবিষ্যতে যুদ্ধ, কূটনীতি কিংবা পরমাণুনীতি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের দাবি ও দেশের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেজায়ি।




