ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রা’আম) পার্টির চেয়ারম্যান মানসুর আব্বাস
ইসরায়েলের গত মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফল দেশটির রাজনীতিকে নতুন অচলাবস্থার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে নতুন নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রচলিত হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। প্রয়োজন সাহসী উদ্যোগ এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠন।
গত সপ্তাহের নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভালো ফল ছিল হতাশাজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে অন্যতম আলোচিত ঘটনা। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন। মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাআম) পেয়েছে আটটি আসন। সব মিলিয়ে আরব ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ঝুলিতে গেছে ১৯টি আসন। বর্তমান নেসেটে তাদের আসনসংখ্যা ছিল ১০। নির্বাচনের ইতিহাসে এটি নতুন রেকর্ড।
নির্বাচনে আরব অধ্যুষিত এলাকায় ভোট প্রভাবিত করতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে তদন্ত চলছে। ভোটারদের প্রভাবিত করতে ঘুষ দেওয়ার মতো ঘটনা তদন্তে উঠে এলেও তার প্রভাব সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে নির্বাচনের সামগ্রিক ফল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম।
আরব দলগুলোর এই সাফল্য সরকার গঠনের হিসাব আরও জটিল করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা ৪৮। ফলে কোনো পক্ষেরই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সমর্থন নেই।
এই অচলাবস্থা কাটানোর পথও খুব বেশি খোলা নেই। একটি হলো বিরোধীদের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। অন্যটি মধ্যপন্থী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা।
আরব দলগুলোকে একই রাজনৈতিক অবস্থানে দেখা যাবে না
বিরোধী দলগুলোর ৪৮টি আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর ১৯টি আসনের সমর্থন যুক্ত করে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের যে দাবি উঠেছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, সব ইহুদি রাজনৈতিক দল যেমন একই আদর্শ বা অবস্থান ধারণ করে না, তেমনি আরব দলগুলোকেও এক রাজনৈতিক পরিচয়ে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মানসুর আব্বাসের রাআম এর আগে ২০২১ সালে ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন জোটের অংশ ছিল। দলটির দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ইহুদি রাজনীতিক ইয়োয়াভ সেগালোভিৎজ। রাআমের রাজনৈতিক অবস্থান হলো, সরকারে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির মাধ্যমে আরব নাগরিকদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে আরব অধ্যুষিত এলাকায় অপরাধপ্রবণতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে দলটি।
অন্যদিকে বালাদ, তাআল ও হাদাশের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্টের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন। দলগুলোর মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ এবং ইসরায়েলের পরিবর্তে একটি গণতান্ত্রিক দ্বিজাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি প্রাধান্য পায়।
জেরুজালেম পোস্টের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এসব দলকে ইসরায়েলের সরকারে সরাসরি কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে রাআমের সমর্থন গ্রহণে রাজি করানো গেলেও সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন পাওয়া যাবে না। এমনকি গোলান যদি আইজেনকট, বেয়াহাদের নাফতালি বেনেট এবং ইয়িসরায়েল বেইতেনুর আভিগদর লিবারম্যানকে রাজি করাতে পারেন, তাহলেও রাআমকে সঙ্গে নিয়ে আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৫৬। সরকার গঠনের জন্য তা যথেষ্ট নয়।
সম্পাদকীয়টির মূল্যায়ন, ভবিষ্যতে রাআমের জন্য সরকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে দলটির সরকারে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
জাতীয় ঐক্যের সরকারই হতে পারে অচলাবস্থা নিরসনের পথ
আরব দলগুলোকে ঘিরে বিরোধীদের সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা দুর্বল হওয়ায় সামনে আসছে জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রস্তাব। নেতানিয়াহু, আইজেনকট, বেয়াহাদের নাফতালি বেনেট এবং ১২ আসন পাওয়া ইয়ায়ির লাপিদের ওপর ঐক্যের সরকার গঠনের চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে এই সমঝোতা সংশ্লিষ্ট সব নেতার জন্যই কঠিন হবে। তারপরও নতুন নির্বাচন এড়াতে এবং দেশকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরাতে এমন উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছে জেরুজালেম পোস্ট।
এই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে আভিগদর লিবারম্যানের ইয়িসরায়েল বেইতেনু। দলটির আসনসংখ্যা সাত। সব মিলিয়ে ঐক্যের সরকারের পক্ষে ৬৭টি আসনের সমর্থন পাওয়া সম্ভব। নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের তুলনায় এটি বেশি।
তবে এই সমীকরণ বাস্তবায়নে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। নেতানিয়াহু মনে করতে পারেন, আরেক দফা নির্বাচন হলে তাঁর জোটের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে ভোটার উপস্থিতি কমে গেলে এবং বিদেশে বসবাসরত ইসরায়েলিদের ভোট কম পড়লে নির্বাচনী ফল তাঁর পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ঐক্যের সরকার গড়তে নেতানিয়াহুকে ছাড়তে হবে কট্টরপন্থী মিত্রদের
জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে হলে নেতানিয়াহুকে নিজের বর্তমান রাজনৈতিক মিত্রদের একটি বড় অংশ থেকে সরে আসতে হবে। বিশেষ করে অতি-গোঁড়া ইহুদি বা হারেদি দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দলগুলোকেও ভবিষ্যৎ সরকারে রাখার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হবে।
নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু এসব দলের সঙ্গে জোট অব্যাহত রাখার কথা বলেছিলেন। ফলে নতুন সমঝোতায় যাওয়া তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে সহজ হবে না।
আরেকটি শর্তও রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনা তদন্তে একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনে সম্মতি দিতে হবে তাঁকে।
অন্যদিকে আইজেনকট ও বেনেটকেও নির্বাচনী প্রচারের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হবে। তাঁরা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠন করবেন না বলে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁদের স্বাভাবিক অবিশ্বাসের পেছনে রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে একটি সমঝোতা সম্ভব বলে মনে করছে সম্পাদকীয়টি।
গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেতে পারেন আইজেনকট ও বেনেট
ঐক্যের সরকার গঠিত হলে মন্ত্রণালয় বণ্টনের মাধ্যমে দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা যেতে পারে বলে প্রস্তাব দিয়েছে জেরুজালেম পোস্ট।
এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে পারেন। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর হাতে থাকতে পারে।
নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই বলেও সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিচার, শিক্ষা, স্বরাষ্ট্র এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেতে পারেন আইজেনকট ও বেনেট। এর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত বিরোধ সরিয়ে সামনে এগোনোর সময়
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চিন্তা ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছে জেরুজালেম পোস্টের সম্পাদকীয় বিভাগ।
নির্বাচনে ভোটাররা নেতানিয়াহু, আইজেনকট ও বেনেটকে সম্মিলিতভাবে ৬০টি আসনের সমর্থন দিয়েছেন। এই তিন নেতার উচিত ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক অহং এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসকে পাশে রেখে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো।
সম্পাদকীয়টির মতে, জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন সহজ সিদ্ধান্ত হবে না। সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রত্যেককেই রাজনৈতিক অবস্থানে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। কিন্তু আরেকটি নির্বাচন আয়োজনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে স্থিতিশীল সরকার গঠনের উদ্যোগই এখন বেশি জরুরি।
ইসরায়েলের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে নেতারা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন কি না। ভোটাররা তাঁদের রায় দিয়েছেন। এবার সেই রায়ের ভিত্তিতে স্থিতিশীল সরকার গড়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
সূত্র: দ্য জেরুসালেম পোস্ট




