ছবি: সংগৃহীত
শিল্পী–শিল্প–শিল্পরসিক, এই ত্রয়ীই একটি শিল্পের পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত। একজন শিল্পী যখন তাঁর শিল্পসত্তার প্রকাশ ঘটান, সেটিকে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেন, আর সেই উপস্থিতিতে শিল্পরসিক বা দর্শক এসে অংশ নেন, তখন শিল্পের একটি পরিপূর্ণ চক্র সম্পন্ন হয়। কখনো দর্শক তাঁর ভেতরে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন খুঁজে পান, কখনো সুপ্ত জ্ঞান, বোধ কিংবা অনুভবের জাগরণ ঘটে। এভাবেই শিল্পের যাত্রা অবিরাম চলতে থাকে।
শিল্পী সামছুল আলম আজাদ-এর তৃতীয় একক প্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’। এটি উচ্চারণ করলে প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগে, ‘দৃশ্যমান’ আসলে কী? আমরা আসলে কী দেখি? আর সেই কাঠামোই বা কীভাবে বিন্যস্ত হয়?

দৃশ্যমান মানে তো রূপ। কিন্তু রূপ কি নিজেই শেষ কথা? নাকি রূপ এমন কিছুর প্রকাশ, যা নিজে দৃশ্যমান নয়? অর্থাৎ অরূপ? কথাটি হয়তো একটু জটিল শোনাচ্ছে। সহজ করে বলি।
রূপ তো কোনো কিছুর প্রকাশ। কিন্তু কিসের প্রকাশ? আমার মনে হয়, রূপের ভেতরে যে অরূপ নিহিত থাকে, তারই প্রকাশ রূপ। আমাদের অভিজ্ঞতা, অনুভব, জ্ঞান, স্মৃতি, আবেগ কিংবা চেতনারও এক ধরনের রূপ আছে, যদিও তার বাহ্যিক কোনো অবয়ব নেই। এগুলো যখন কোনো শিল্পমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখনই তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এই প্রসঙ্গে মার্টিন হাইডেগারের Being এবং Appearance-এর ধারণাটি মনে পড়ে। আমরা যখন একটি গাছ দেখি, তখন চোখে ধরা পড়ে তার দৃশ্যমান রূপ, অর্থাৎ তার Appearance। কিন্তু সেই গাছের যে দীর্ঘ সময়ের বৃদ্ধি, তার অস্তিত্বের ইতিহাস, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক, তার অন্তর্নিহিত সত্তা, তা আমাদের চোখে সরাসরি ধরা পড়ে না। সেটিই তার Being। অর্থাৎ যা অদৃশ্য, কিন্তু অনুপস্থিত নয়; বরং সেই অদৃশ্য সত্তাই দৃশ্যমান রূপের ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করে।
আমার কাছে মনে হয়, শিল্পী তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও অনুভবের প্রকাশ ঘটান শিল্পের মাধ্যমে। আর দর্শক তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও অনুভব দিয়ে সেই শিল্পকে পাঠ করেন। ফলে শিল্পীর দেখা এবং দর্শকের দেখা কখনো এক হয় না। কিন্তু এই ভিন্নতা কোনো বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং শিল্পেরই স্বাভাবিক পরিণতি। কারণ উভয়ের লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত শিল্পের ভেতরের অর্থের দিকে অগ্রসর হওয়া।
এই প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোতে দর্শক সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন। কীভাবে?
যিনি নদী দেখেছেন, তিনি হয়তো ছবির ভেতরে নদী খুঁজে পাবেন। যিনি যুদ্ধ দেখেছেন, তিনি দেখবেন ধ্বংসের স্মৃতি। যে মানুষ স্মৃতি নিয়ে বাঁচেন, তিনি হয়তো দেখতে পাবেন স্মৃতির মানচিত্র। আবার যার কাছে বিমূর্ত ও মূর্তের বিভেদ ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি হয়তো শুধু রঙের স্তর, টেক্সচার কিংবা পৃষ্ঠতলের বিন্যাসই দেখবেন। কেউ অনুভব করবেন রঙের শীতলতা, কেউ হয়তো সেটুকুও অনুভব করবেন না।
এভাবেই দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভবের সংযোজন ঘটিয়ে শিল্পের একটি অংশ হয়ে ওঠেন। শিল্প দেখারও একটি চোখ তৈরি হয়। তাই সবাই একই শিল্পকর্মে একই জিনিস দেখেন না। কেউ অনেক কিছু দেখতে পান, কেউ কম; কেউ ভিন্নভাবে দেখেন। আর এই বহুমাত্রিকতাই শিল্পের সার্বজনীনতার অন্যতম ভিত্তি।
ছোট্ট অভিজ্ঞতার কথা বলি, প্রথম দিন যখন গ্যালারিতে এসেছিলাম, তখন প্রদর্শনী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। বাইরে প্রচণ্ড গরম। ছবিগুলো দেখছিলাম। একটি ছবির সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ এক ধরনের স্নিগ্ধ শীতলতা অনুভব করলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো বাইরে থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে প্রবেশ করার কারণেই এমন মনে হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর উপলব্ধি করলাম, শীতলতাটি দেহে নয়, ছিল অন্তরে। যেন ছবির রঙই আমার ভেতরে একটি নীরব আবহ নির্মাণ করছিল। শিল্পের এই স্পর্শ দৃশ্যের নয়, অনুভবের।
শিল্পী একবার বলেছিলেন, ‘আমি রং আঁকি।’
কথাটি প্রথমে সহজ মনে হলেও, এর ভেতরে একটি গভীর নন্দনতাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। আমরা সাধারণত রঙকে কোনো অবয়ব, বস্তু কিংবা ফর্মকে দৃশ্যমান করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু যখন রঙ নিজেই বিষয় (subject) হয়ে ওঠে, তখন রঙ আর কেবল মাধ্যম থাকে না, সে নিজেই হয়ে ওঠে শিল্পের ভাষা। তখন যেন রঙকেই আঁকতে হয়।
ভাষায় যেমন কোনো কোনো বিশেষণ (Adjective) প্রসঙ্গভেদে বিশেষ্য (Noun)-এর ভূমিকা গ্রহণ করে, তেমনি এখানে রঙও মাধ্যমের সীমা অতিক্রম করে শিল্পের মূল বিষয় হয়ে ওঠে। রঙের এই প্রসঙ্গে আরেকটি নন্দনতাত্ত্বিক ধারণা মনে পড়ে, Palimpsest।
প্রাচীনকালে পার্চমেন্টে লেখা হতো। পার্চমেন্ট ছিল পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি এক ধরনের লেখার উপকরণ। এটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই পুরোনো লেখা মুছে তার ওপর নতুন লেখা লেখা হতো। কিন্তু পুরোনো লেখার সব চিহ্ন কখনোই পুরোপুরি মুছে যেত না। নিচে থেকে যেত তার ক্ষীণ উপস্থিতি। এই স্তরায়িত লেখার নামই Palimpsest।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে Palimpsest কেবল একটি লেখন-পদ্ধতি নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ নন্দনতাত্ত্বিক ধারণায় পরিণত হয়েছে। অনেকটা দেরিদার Trace ধারণার মতো, যেখানে কোনো উপস্থিতি কখনো সম্পূর্ণ বর্তমান নয়, আবার কোনো অনুপস্থিতিও সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। প্রতিটি নতুন স্তরের নিচে পূর্ববর্তী স্তরের স্মৃতি থেকে যায়।
এই ধারণাটি মনে পড়ার কারণ, এই প্রদর্শনীর চিত্রগুলোতেও রঙের বহুস্তরীয় আস্তরণ লক্ষ করা যায়। একটি স্তর আরেকটি স্তরকে ঢেকে দিয়েছে, আবার সেই আচ্ছাদনের ভেতর দিয়েই পূর্ববর্তী স্তরের চিহ্ন কোথাও কোথাও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিটি স্তর যেন আরেকটি স্তরের সঙ্গে নীরব সংলাপে যুক্ত। এখানে রঙ শুধু পৃষ্ঠকে আচ্ছাদিত করেনি, বরং সময়, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার স্তরগুলোকেও ধারণ করেছে।
এই ধরনের স্তরবিন্যাসের আবহ Anselm Kiefer, Antoni Tàpies, Cy Twombly কিংবা Gerhard Richter-এর কিছু কাজেও লক্ষ করা যায়। তবে সামছুল আলম আজাদের কাজে এই ভাষা অনুকরণ নয়। কারণ তাঁর রঙ, টেক্সচার এবং কাঠামোর ভেতরে আমাদের এই ভূখণ্ডের আলো, বাতাস, নদী, মাটি এবং ঋতুচক্রের অভিজ্ঞতা অনিবার্যভাবে মিশে আছে। তাই আন্তর্জাতিক শিল্পভাষার সঙ্গে কোথাও কোথাও সাদৃশ্য থাকলেও, তাঁর চিত্রভাষার আত্মা একান্তই এই বাংলার।
তবে এই শিল্পকর্মগুলোর ভেতরে সেই স্তরগুলোর ছাপ লক্ষ্য করা গেলেও, আমাদের শিল্পী যেহেতু এই দেশের আলো, বাতাস, নদী আর মাটির ভেতর দিয়ে বড় হয়ে উঠেছেন, তাই তাঁর কাজেও সেই অভিজ্ঞতার বিন্যাস স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। রঙে, টেক্সচারে কিংবা কাঠামোতে, কোথাও না কোথাও এই বাংলার ভূপ্রকৃতি নীরবে উপস্থিত। প্রথম দর্শনে হয়তো তা স্পষ্ট ধরা পড়ে না, কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখলে মনে হয় যেন এই সবুজ শ্যামল দেশের উত্তল-অবতল ভূমি, নদীর প্রবাহ, মাঠ, চর, পাহাড় কিংবা মাটির স্তরগুলোই অন্য এক ভাষায় পুনর্গঠিত হয়েছে।
আমরা যা দেখি, তা কেবল চোখের দেখাই নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, সংস্কার এবং বোধ। অনেক সময় আমরা যা দেখতে চাই, তার বাইরের জগৎ আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। তাই তো মার্লো-পঁতি বলেছিলেন, "আমরা শুধু চোখ দিয়ে দেখি না; আমরা দেখি আমাদের সমগ্র শরীর, অভিজ্ঞতা এবং চেতনা দিয়ে।" শিল্প দেখাও আসলে তেমনই এক অভিজ্ঞতা।
এই কারণেই একই শিল্পকর্ম একজনের কাছে নদী, আরেকজনের কাছে ক্ষত, কারও কাছে স্মৃতি, আবার কারও কাছে নিছক রঙের বিন্যাস হয়ে উঠতে পারে। শিল্পের এই বহুবাচনিকতাই তাকে জীবন্ত রাখে। একটি শিল্পকর্ম কখনো একটিমাত্র অর্থে আবদ্ধ থাকে না; প্রতিটি দর্শক তার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
আমার কাছে মনে হয়েছে, 'দৃশ্যমান কাঠামো' আসলে দৃশ্যমানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য কাঠামোকে রঙ, স্তর, টেক্সচার এবং সময়ের ভাষায় অনুবাদ করার একটি সফল শিল্পপ্রয়াস। এখানে রূপ কেবল দৃশ্যমান অবয়ব নয়; বরং অরূপের বহিঃপ্রকাশ। আর সেই রূপ ও অরূপ, উপস্থিতি ও অন্তর্নিহিত সত্তা, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের মধ্যকার সূক্ষ্ম টানাপোড়েনই এই প্রদর্শনীর প্রধান নান্দনিক শক্তি।
শিল্পী আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্য দেখাতে চান না; বরং এমন এক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করান, যেখানে প্রতিটি দর্শক নিজের ভেতরের দৃশ্যও দেখতে শুরু করেন। সম্ভবত সেখানেই এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও গবেষক।




