Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৮ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

‘প্রাণিবন্ধু’র চিরঘুম ও আমাদের অনন্ত রোদন


২৮ জুন ২০১৯ শুক্রবার, ০২:১১  এএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


‘প্রাণিবন্ধু’র চিরঘুম ও আমাদের অনন্ত রোদন

-‘প্রাণিবন্ধু’ কর্পোরাল মোঃ আবদুর রউফ (১৯৭৯-২০১৮)

৩ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার-নিজের ফেসবুক ওয়ালে একজন সৈনিক লিখছেন, ‘শুরু হলো কাউন্ট ডাউন/বছর নয়, এখন শুধু মাস’। সবার অজান্তে কিসের ‘কাউন্ট ডাউন’ শুরু করেছিলেন তিনি ? সেকি মা’কে প্রতিশ্রুত ‘ছুটি’ দেওয়ার কাউন্ট-ডাউন? মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়িয়ে ছিপ-বরশিতে মাছ ধরার স্বাধীনতা? নাকি প্রিয় প্রাণিদের পরম সান্নিধ্য লাভের অধীর অপেক্ষা?

সত্যিই সেই অপক্ষোর অবসান হতে নিষ্ঠুর নিয়তি বেশি সময় দেয়নি তাকে। ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসের মাত্র ৪৯ দিন পরেই উপস্থিত সেই মেহমান; যাঁর আগমনধ্বনি তিনি শুনতে পেয়েছিলেন বহু আগেই। ১২ ডিসেম্বর ২০১৬-এবিষয়ে তিনি ফেসবুকে লিখছেন, ‘মৃত্যু এমন এক মেহমান যে দরজায় এসে দাঁড়াইলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মত ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো প্রাণিরই নেই’-সেই মেহমানকে তিনিও ফেরাতে পারেননি-তাঁর উপলব্ধিই পরম সত্য হয়ে ধরা দিল।

বছর ৩৯ এর এই সেনা সদস্য মোঃ আবদুর রউফ কর্পোরাল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদির ও শরিফুন্নাহারের জ্যেষ্ঠপুত্র রউফ টগবগে তারুণ্যের ঊষালগ্নেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর হন। পুত্রের আবদার মেটাতে বাবা স্মরণাপন্ন হলেন পরিবারের সুহৃদ ও নিজের শিক্ষক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্যারিসন ইঞ্জিনিয়ার প্রকৌশলী আকিল আহমেদ খান এর কাছে। পুত্রস্নেহে আবদুর রউফকে কাছে টেনে নিলেন এই সেনা কর্তা। সেনাবাহিনীতে যোগদানে সদ্য কৈশোর পেরুনো এই তরুণের নাছোড়বান্দা অভিপ্রায়কে প্রশ্রয় দিয়ে তিনি নিয়ে গেলেন চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তাঁর পরিচিত উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকর্তার কাছে।   

‘রিক্রুটমেন্ট শেষ হয়ে গেছে’ ওই কর্মকর্তার এমন তথ্যে আপাত অপ্রস্তুত জনাব খান তা সত্ত্বেও কিছু একটা করার অনুরোধ জানান। ‘সাধারণ শ্রেণিতে নতুন সেনা সদস্য রিক্রুট ওই সময়ের মত শেষ’, এটা জেনেও অন্যকোনো একটি শ্রেণিতে ভ্রাতুষ্পুত্রসম রউফকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসাবে যোগদানে সমর্থ হন প্রকৌশলী আকিল আহমেদ খান। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করা জনাব খান স্মৃতির পাতা উল্টে হারিয়ে যান ১৯৯৬-এ।

সৈনিক হিসাবে যোগ দিলেও পর্যায়ক্রমে যাতে কর্মকর্তা হিসাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন, সেই উপদেশ ছিল আকিল আহমেদ এর। বলছিলেন-খেলোয়াড় শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে তা পরিবর্তনের সুযোগ সে পাবে। অচিরেই খেলোয়াড় শ্রেণি বদলিয়ে সাধারণ সৈনিকের জীবন বেছে নেন আবদুর রউফ। দুঃখ করেই আকিল আহমেদ খান বলছিলেন, কর্মকর্তা হওয়ার যে অনুরোধ তিনি জানিয়েছিলেন রউফকে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে।

দুই দশকেরও বেশি সময় সুমৃঙ্খল সেনাবাহিনীর একজন অতন্দ্রী প্রহরী হয়ে দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন কর্পোরাল মোঃ আবদুর রউফ। দেশের প্রায় সবক’টি সেনানিবাসে অতিবাহিত হয় তাঁর জীবনের উজ্জ্বলতম দিনগুলি।বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ যে গৌরব অর্জন করেছে, তা অতুলনীয়। তুলনাহীন সেই গৌরবের গর্বিত অংশীদার কর্পোরাল আবদুর রউফ। আফ্রিকার সংঘাতপ্রবণ আইভরিকোস্ট-এ সেনা সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালনে গভীর নিষ্ঠা ও কর্তব্য পরায়ণতার পরিচয় দেন তিনি। সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে তাঁর হাসোজ্জ্বল ছবি সেই জনগোষ্ঠির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত নিবিড় সম্পর্কের পরিচয় তুলে ধরে।

সৈনিকের শৃঙ্খলায় বাধা জীবনেও আবদুর রউফের নিজস্ব দার্শনিক ভাবনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তুলে ধরতেন। মানুষ ও প্রাণিকূলের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসা-সহকর্মী, এমনকী পরিবারের সদস্যদের কাছেও এক বিশেষ শ্রদ্ধার আসন তৈরি করে। স্বামী বিবেকানন্দের সেইসব অমূল্য বাণী নিজের মধ্যে ধারণ করে তিনি জোর গলায় বলতেন ‘জীব প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ইশ্বর’। স্বামীজীর এই অমোঘ বাণী আমৃত্যু অনুসরণ করেছেন আবদুর রউফ।

প্রশিক্ষণ কিংবা অর্পিত ‘বিশেষ দায়িত্ব’ পালনে সব সময় পদস্থ কর্মকর্তাদের উৎসাহ-সমর্থন ও আশীর্বাদ লাভ করেছেন তিনি। বাহিনীর সদস্য হিসাবে খেলাধুলায় অংশগ্রহণেও সুনাম কুড়িয়েছেন।

কোনো একবার কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসে বক্সিং খেলায় আন্ত ইউনিট প্রতিযোগীতায় প্রতিদ্বন্ধীতামূক খেলায় চ্যাম্পিয়ন হন তিনি।  এই আনন্দের খবরে তাঁর বাড়িতে রীতিমতো উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।সাধারণ সৈনিক থেকে সম্মানিক ল্যান্স নায়েক পদে পুরস্কারসূচক পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। সাধারণ সৈনিকরা তাকে ‘রউফ ওস্তাদ’ সম্বোধন করতে শুরু করেন-গর্বভরে সেই গল্প ছুটিতে এসে বাবা-মা ও ছোটভাইদের শোনান।

দীর্ঘ কর্মময় জীবনে সেনাবাহিনীর এই গর্বিত সদস্য অগণিত গুণগ্রাহীর সঙ্গে মধূরতম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দেখতে সুশ্রী ও আচরণে বিনয়ী এই তরুণকে সবাই কাছে টেনে নিতেন পরম মমতায়। উর্ধ্বতন থেকে ব্যারাকের পাশের বেডের সৈনিক-সবাই তাকে চিনতেন এবং মানতেন।   গগাজ  

ফিরে যাবো আরও পেছনে। সাল ১৯৯৩-৯৪। গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের শিমুলতলা গ্রামের বলদীঘাট বাজারকেন্দ্রিক গ্রামীণ জনপদে তখন ‘ভিসিআর’ বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। একমাত্র টেরিস্টোরিয়াল সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)তখন বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনেক অনুষ্ঠানই সম্প্রচার করছে। গ্রামীণ জনজীবনে এসবের বিরাট প্রভাব। প্রায় সমবয়সী দুই ভাই রউফ ও সোহেল তখন মাধ্যমিকের ছাত্র। মা’য়ের কড়া শাসনে বেড়ে উঠছে-কিন্তু নিষেধের বেড়াজাল ডিঙানো কিশোরদের যে সহজাত প্রবৃত্তি, তা তাদের মাঝেও দেখা দেয়। ফুলেল লতিকায় পেচানো ছোট্ট একটি মাটির ঘর, যার পাশে পেয়ারা বাগান-সেই ঘরে বাস ছিল দুই ভাইয়ের।

বাজারে রীতিমতো টিকিট কেটে দেখতে হত বিটিভি আর বিটিভিতে তখন চলছে বিখ্যাত সেই ধারাবাহিক আরব্য উপনাস অবলম্বনে ‘আলিফ লায়লা’ ও ‘রূপনগর’। স্কুলে-রাস্তাঘাটে সেইসব ধারাবাহিকের আলোচনা সরগরম। কিশোর রউফ-সোহেল কীভাবে দমিয়ে রাখে নিজেদের! কিন্তু পড়াশোনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাত-বিরাতে বাজারে গিয়ে ‘সিনেমা’ দেখা তা চলবে না-স্পষ্ট নির্দেশ মা’য়ের। রাতের খাবার খাইয়ে বাইরে থেকে বড়সড় তালা দিয়ে মা শরিফুন্নাহার নিশ্চিন্ত হতেন। তো একটা উপায় তো বের করতেই হবে-ছন দিয়ে ছাওয়া সেই ঘরে উপরে এককোণে ছোটখাটো একটি ফাঁকা রয়েছে। কৌশলে পালনোর জন্য নির্গমণ পথ হিসাবে এটি ব্যবহার করলে কেমন হয়? কিশোর মস্তিষ্কে ঠিক পথ বেরিয়ে গেল, পরীক্ষামূলক সমীক্ষাতেও দেখা গেল ঠিক ‘আসা-যাওয়া’ করা যাচ্ছে।

গোল বাধলো টিকেটের অর্থ আসবে কোত্থেকে? শেষমেষ স্থির হল ঘরে হাঁস-মুরগির অনেক ডিম আছে, কিছু না পাওয়া গেলে না হয় এই ডিম বেঁচেই যোগাড় হবে টিকেটের অর্থ। এভাবেই ‘গোপন’ পথে ঘর থেকে পালিয়ে রোজ রাতে চুরিকরা ডিম বেঁচে ‘আলিফ লায়লা’ আর ‘রূপনগর’ দেখে রাত ১১টার দিকে বাড়ি ফিরে নিঃশব্ধে ঘুমিয়ে পড়তো দুই ভাই। বেশ শান্তিতেই চলছিল তাদের বিনোদন। তবে অচিরেই তা মা’য়ের চোখে ধরা পড়ে যায়।রেগে অগ্নিশর্মা মা’য়ের শাসনেও ‘রূপনগর’ দেখার নেশা ছুটেনি। রাতে তালা খুলে বিছানায় এসে দেখতেন বাছাধন ছেলেরা তাঁর ঘর থেকে গোপন পথে পালিয়েছে। ব্যর্থ হয়ে কনিষ্টপুত্রকে নিয়ে মা ঘুমিয়ে পড়তেন। অপারগ হয়ে নালিশ যেতো বাবার কাছে। ঢাকা থেকে বাবা বাড়ি ফিরলে সেই বিচার উঠতো সবার আগে।শাসনে আদরে ছেলেদের ঠিকই শামলে নিতেন মা।

মাধ্যমিক পেরুনোর পর একবার কড়া শাসনের মুখে বাড়ি থেকে পালালো আবদুর রউফ। পাগলপ্রায় বাবা-মা হন্যে হয়ে খোঁজে ফিরলেন। দিন যায় সপ্তাহ যায়-নিরুদ্দেশ; হঠাৎ একদিন ডাকযোগে চিঠি এল। রাজধানী ঢাকার কমলাপুরে এক আবাসিক হোটেলে চাকরি নিয়ে আপাত আবাস গড়েছে সে। বাবা ঝড়ের বেগে ছুটলেন কমলাপুরে। পুত্রকে তুলে নিয়ে প্রথমে হোটেলে পেট পুরে খাওয়ালেন। তারপর অনেক বাজার করে ‘নিখোঁজ’ ছেলেকে নিয়ে ফিরলেন বাড়ি। সেই থেকে এতটাই সুবোধ হয়ে গেল রউফ, যে সংসারের প্রয়োজন নিয়ে ভাবতে শুরু করলো সে। বাবার বারণ সত্ত্বেও বাবাকে বাধ্য করে যোগ দিল সেনাবাহিনীতে।

নবীন সৈনিক রউফ বিভিন্ন সেনানিবাস থেকে নিয়মিত চিঠি পাঠাতেন, মাস শেষে বেতন পেয়েই পাঠাতেন মানি অর্ডার। স্কুল পড়ুয়া কনিষ্টভাই সজীব রোজ উঁকি মারতো পোস্ট অফিসে, উল্টেপাল্টে দেখতো এই বুঝি দাদাভাইয়ের চিঠি এল…।

হাতের লেখা নিমেষেই চিনে নিত সজীব। চিঠির প্রথম পাঠক সে-ই হতো। কবে ছুটিতে আসছে সবার আগে সে জেনে যেত। ভরা বর্ষায় বহুবার ‘দাদাভাই’ ছুটিতে এসেছেন বড় ব্যাগ নিয়ে। সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট, বড় বড় ফজলি আম আরও কত কী! চিতারআগার কিংবা শেখ ভিটা-ছোলমানের ভিটায় এসে জোর গলায় ডাক দিতেন, এই সজীব….। গলার আওয়াজ শোনে তিন লাফে ছোট্ট জলযান ‘কুন্দা’ কিংবা কলার ভেলা নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পৌছে যেত, জড়িয়ে ধরতো প্রিয় দাদাভাইকে। ফেরার পথে কুন্দার বৈঠাটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে ব্যাগটা দিতেন ছোটভাইকে। সেই দিনগুলি এখন তীব্র কষ্টের স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে বার বার। সেই পথঘাট, বৃক্ষরাজি, টেকটিলা ঠিক যে যার স্থানে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে আজও। সৃষ্টির চিরায়ত নিয়মে মানুষগুলোই ক্রমান্নয়ে বিস্তৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। কিছু কথা কিছু স্মৃতি থেকে যাচ্ছে স্বজনদের বেদানাশ্রু হয়ে।

সময়ের সঙ্গে আবদুল কাদির ও শরিফুন্নাহার দম্পতির ছোট্ট সংসারও বড় হতে শুরু করে। পুত্রবধূদের আগমনে আবেগবিহম্বল এই দম্পতি নূতন সুখের স্বাদ পান। কর্মের প্রয়োজনে কর্মস্থলে পাড়ি জমানোর মুহূর্তে সেই সুখ আবার অশ্রু হয়ে ফিরে আসতো বাবা-মার কাছে। একসময় আরও আনন্দের বার্তা আসে এই দম্পতির সংসারে। বাবা-মা থেকে তাঁরা দাদা-দাদীও হয়ে উঠেন। বাধবাঙা আনন্দের জোয়ারে ভেসে যান তাঁরা। সুখের এই তরী চলতে শুরু করে বিরামহীন। একের পর এক অতিথির আগমনে আত্মহারা হয়ে পড়েন তাঁরা। সাদী, সুখি, আবির, হুজাইফা-এযেন বেহেস্তের সব ফুল ফুটেছে এই বাড়িতে। গ্রীষ্ম আসে, বর্ষা আসে, শরৎ আসে, আসে হেমন্ত; চাদরমুড়ি দিয়ে পিঠাপুলি নিয়ে আসে শীত-পুষ্পপল্লবে ভরিয়ে বিচিত্র ফলের রসে আসে বসন্ত। আসে নবান্ন-পহেলা বৈশাখ, আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর-ঈদুল আযহা, সবভুলে কোলাকুলির ‘আসমানি তাগিদ’, সেমাই-সন্দেশ খাওয়ার ধুম, শিশুদের সালামির টাকা ভাগাভাগি। একদশক ধরে কাদির-শরিফা দম্পত্তির এই আনন্দকুটিরে মহাধুমধাম!

নূতন সব অর্জনে আনন্দের আতিষয্যে কাটে তাদের দিনরাত্রি। তারা এখন ব্যস্ত থাকেন ছেলেদের নয়, নাতি-নাতনীদের আবদার মেটাতে। পুকুরপাড়ের পেয়ারা গাছটায় পেয়ারা পেকেছে কী? কমলা গাছে কয়টা কমলা ধরেছে? জাম্বুরাগুলো হলদেভাব হয়েছে কী? রাজহাঁসে ডিম কয়টি পেরেছে?-ইত্যাদি প্রশ্নের জবাব তৈরি রাখতে হয় আবির বাহিনীর জন্য। তাদের অনুগত থাকাই যেন কর্তব্য এই দম্পতির। চাঁদমুখ নাতি-নাতনিরা এখন তাদের গল্প শোনায় বড় হয়ে কে কী ধরণের শাড়িটা কিনে দেবে দাদীকে, কার বাসায় বেশি বেড়াতে যেতে হবে-অবুঝ নিষ্পাপ মুখে এসব কথা সুখানুভূতিতে ভাসিয়ে নেয় তাদের, চোখ ভরে আসে আনন্দাশ্রু।

সাল ২০১৮, জুন মাস। ক’দিন বাদেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। রমজানুল মোবারকের সিয়াম সাধনায় মহান আল্লাহ’র অনুগ্রহ লাভ করে আরও একটি আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। নাতী-নাতনীদের কার কী আবদার তা মেটাতে ব্যাপক ব্যস্ততা! হঠাৎ একটি ফোন তাদের উচ্ছ্বাসকে থামিয়ে দিল।

‘মা, আমার অনেক জ্বর, শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে, ওষুধে কাজ হচ্ছে না। দশ দিনের ছুটি পাইছি কিন্তু ক্যামনে আসব বুঝতে পারছি না’-রাজশাহী সেনানিবাস থেকে ফোন করে জানালেন বড় ছেলে কর্পোরাল আবদুর রউফ। বাবা-মা’র মাথায় যেন বাজ পড়লো। নামাযে আল্লাহ-কে ডাকতে শুরু করলেন, আল্লাহ সন্তানকে সুস্থ করে দাও। ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে খোঁজ করছেন ছেলের কোনো উন্নতি হল কিনা-আশাব্যঞ্জক কোনো উত্তর পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে ছুটি নিয়ে বস্তাভর্তি আম বহন করে বাড়ি ফিরলো ছেলে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করবেন, বড় সখ করে গড়ে তোলা কৃষি খামারের প্রিয় প্রাণিদের সান্নিধ্য পাবেন-এর কাছে জ্বর বাধা হয় কিভাবে?

ছাগলের পাল নিয়ে রাখাল বালকের মত শাল-গজারি বনে যাবেন চড়াতে। ছাগলদের ‘তাইরেনাইরে’ লাফিয়ে চলা কিম্বা দুই ছাগলের নাড়াইয়ের দৃশ্য দেখে গায়ের জ্বর থাকতে পারে? ছাগলগুলোকে বেশ কিছু টিকা যে এখনও দেয়া হয়নি, খামারের কিছু কাজ যে অসম্পন্ন রয়ে গেছে-এগুলো কে করবে?   

না, সে সুযোগ আর পাচ্ছেন না ‘প্রাণিবন্ধু’। যে প্রাণিদের জন্য এহেন পরিশ্রম নেই তিনি করেননি, রাজশাহী থেকে লোকাল বাসে সবথেকে ‘কিউট’ ছাগলটিকে কোলে করে নিজ খামারে এনেছেন। তাদের খাবার-চিকিৎসার জন্য অনলাইনে সফল খামারিদের সঙ্গে রেখেছেন নিয়মিত যোগাযোগ। ছোট ভাইয়ের কাছে একটি বিদেশি ছিপ আবদার করেছিলেন মাছ ধরার জন্য। কোনো আশাই যে পূরণ হচ্ছে না তাঁর।

কাল জ্বর তাঁর পিছু ছাড়ছে না। জ্বর থামাতে বুঝে না বুঝে চিকিৎসা চলতে থাকলো। উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যাথানাশক প্রয়োগ করা হল। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ঈদের নামায পড়তে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পড়ে গেলেন। পাজাকোলা করে আনা হল বাড়িতে-অপরিণত মেডিকেল জ্ঞানে আরও কিছু ভুল চিকিৎসা চললো। পুশ করা হল উচ্চমাত্রার ইঞ্জেকশন, দিন পেরিয়ে আরও একটি রাত অতিবাহিত হল। প্রচন্ড কাঁপুনি দিয়ে আসা জ্বর থামছেই না। ১৭ জুন ২০১৮ প্রাইভেট কারে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আনা হল তাকে। মা’য়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠলো পরিবেশ। জীবিত ছেলেকে এটাই কী শেষ বিদায় দিচ্ছেন মা? অজানা আশঙ্খায় বুক দুরু দুরু করছে। আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনায় মশগুল হলেন, সন্তানের জন্য প্রাণভিক্ষা চাইলেন-নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানকে ফিরিয়ে দাও আল্লাহ।

সিএমএইচ-এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে মেডিকেল ওয়ার্ডে তাঁর চিকিৎসা শুরু হল। দুই ভাই ও স্ত্রীর সার্বক্ষণিক সাহচর্য-শশ্রুষা ও চিকিৎসকদের চেষ্টা সত্ত্বেও অবস্থার ক্রমশঃ অবনতি হতে থাকলো। দ্রুত তাকে স্থানান্তর করা হল হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট(এইচডিইউ)-এ। সেখানেও তীব্র যন্ত্রণায় প্রাণপ্রিয় দাদাভাইয়ে কাতর উচ্চারণ, ‘বাঁচবো নারে…গলার নীচে ছিদ্র করছে। বুকে প্রচন্ড ব্যাথা করছে-সব ছিড়ে যাচ্ছে। আর পারতাছিনা’

ভাইয়ের যন্ত্রণা প্রশমনে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছে ছুটছেন আরেক ভাই। কাতরস্বরে চিকিৎসককে মিনতি করছেন, ‘আমার ভাইয়ের খুব কষ্ট হচ্ছে, প্লিজ একটু দেখবেন’..

সংরক্ষিত ওই চিকিৎসা জোনে স্বজনদের বেশি সময় থাকতে দেওয়া হয় না। তাগাদা আসলো চলে যাওয়ার…ফিরে যাওয়ার আগে জন্মের মতো জীবিত ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকখন। গালে সঙ্গে গাল মিলিয়ে পরম আদর ও ভক্তিতে দাদাভাইকে তাঁর স্নেহের সজীব বলবার সুযোগ পেল, ‘দাদাভাই-অনেক ওষুধ খেতে হচ্ছে, কষ্ট করে একটু খাবার খাবেন’। জবাবে দুইটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন, ‘না খাইতারলে আর কিছু’। যন্ত্রণাময় যন্ত্র পরিবেষ্টিত প্রিয় দাদাভাইকে এইচডিইউ’র বেডে রেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের তাগিদে এক পা দু’পা করে বাইরে বেরিয়ে আসতে হল। এইচডিইউ’র বেডে ছটফট করা এক মাতৃগর্ভে একই রক্তে বড় হওয়া কলিজার টুকরা ভাইয়ের জন্য তাঁর কিছুই করার রইল না। কেবলি দূর থেকে নিষ্ফল তাকিয়ে থাকা...

উদ্বিগ্ন স্বজনদের জন্য কোনো সুখবর আসছে না ভেতর থেকে। অবস্থার আরও অবনতি। অগত্যা স্থানান্তর করা হল সিএমএইচ’র ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ইউনিট-এ। সেখান কৃত্রিমভাবে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টা চললো। রোজ কয়েক দফা রক্ত পরীক্ষার জন্য পাশেই আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি’তে ছুটে যাচ্ছেন ছোট ভাই। যেন যত দ্রুত রিপোর্ট এনে দিতে পারবেন-ভাই দ্রুত সেরে উঠবেন! রক্তে উদ্বেগজনকভাবে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় নতুন করে ব্লাড সেল পুশ করা হচ্ছে। কয়েক ব্যাগ এনে দেওয়া হল। সহকর্মীদের সঙ্গে সহোদর আবু হানিফ সোহেলও রক্ত দিলেন।

লাইফসাপোর্টে সপ্তাহ পার করলেন পরিবারের স্পন্দন-বটবৃক্ষ। কোনো সুখবর নেই। ভাল খবরের আশায় রোজ চিকিৎসকদের ব্রিফিংয়ে যান স্বজনরা। উৎকণ্ঠিত স্বজনরা বেরিয়ে আসেন অশ্রুসজল চোখে। হাসপাতালে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি-শুভানুধ্যায়ীদের। খাবারের টিফিন ক্যারিয়ার হাতে আত্মীয় স্বজন ছুটে আসছেন, পাশে থাকার সহানুভূতি জানাচ্ছেন। তসবিহ হাতে মা’য়ের প্রার্থনা বিরামহীন, ভাইদের চোখে অবিরাম অশ্রু ঝরছে। সুখি-আবির নির্বাক হয়ে কেবল টিভি স্ক্রিনে লাইফসাপোর্টে নিশ্চল-নিষ্পন্দ বাবাকে দেখে আল্লাহ’র কাছে কাতরভাবে ফরিয়াদ করছে।

২৭ জুন ২০১৮ বুধবার, দিনভর স্বজনদের ভেতরটা কেন যেন গভীর উদ্বেগ-অজানা আশঙ্খায় কেবলি হাহাকার করছে। বিকেল গড়িয়ে সেদিনের সন্ধ্যার আকাশ যেন একটু বেশিই রক্তিম।সবার চোখে অশ্রুধারা বয়েই চলছে। কী হতে চলছে এই রাতে! কেউই হাসপাতাল ছাড়তে চাইছে না। কিন্তু স্বজনদের জন্য অপেক্ষাগারটিও যে রাত ১০টার পর বন্ধ হয়ে যাবে। খোলা আকাশে হলেও হাসপাতালে প্রাঙ্গন ছাড়তে চান না মা। নাড়িছেড়া ধন যে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন...

সবাইকে আত্মীয়ের বাসায় ফেরত পাঠিয়ে একাই হাসপাতালের কোথাও থাকতে চাইলেন ছোট ভাই আশরাফুল ইসলাম সজীব। মেজোভাই আবু হানিফ সোহেল বললেন, ‘আমিও আজ থাকবো তোর সঙ্গে’।

সবাইকে পাঠিয়ে দুই ভাই উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে রইলেন সিএমএইচ প্রাঙ্গনে একটি আম গাছের তলায়। রাত তখন ১১টা, অদ্ভূত এক বাতাস বইতে শুরু করলো। ভেতরটা কেনই যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। হাছেন আলী নামের একজন নিরাপত্তাকর্মীর সহায়তায় একটি নামাজের জায়গায় দুই ভাই আল্লাহ’কে ডাকতে লাগলেন। নামায-দোয়া দরুদ পাঠ করে এক মোনাজাতে হাত উঠালেন দুই ভাই। নিরাপত্তাকর্মী হাছেন আলী মোনাজাত পরিচালনা করলেন। দীর্ঘ সেই মোনাজাত তখনও শেষ হয়নি। ছোটভাই আশরাফুল ইসলামের সেলফোন বেজে উঠলো ‘সিসিএম সিএমএইচ’ নামে সেভ করা নম্বরটি। কম্পিত হাতে ফোন ধরতে গিয়ে কেটে গেল। পরক্ষণেই আবার বেজে উঠলো ফোন। ওই প্রান্ত থেকে একজন চিকিৎসক জানতে চাইলেন, ‘আপনারা কোথায়?’ কাঁপা স্বরে জবাব, ‘আমরা পাশেই রয়েছি, কী হয়েছে বলুন-আমরা এক্ষুণি আসছি’

‘আপনার ভাইয়ের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। তাঁর হৃদযন্ত্র চলছে না, আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি-আপনারা অভ্যর্থনায় আসুন দ্রুত’-বললেন চিকিৎসক।

কালবিলম্ব না করে দুঃসময়ের বন্ধু হাছেন আলীকে সঙ্গে নিয়ে দুই ভাই রীতিমতো লাফিয়ে নামলেন নীচে। পাশেই আইসিইউ। জোর গলায় কালেমা পড়তে পড়তে দুই ভাই ছুটলেন সেখানে। কলিং চেপে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকলেন দুই ভাই। লাল অ্যাপ্রোণ পড়িহিত একজন এসে দরজা খোলে দিয়ে বসতে বললেন। অপেক্ষায় দুই ভাই। গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। বেদনাময় সেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো। নতশিরে একজন চিকিৎসক এসে তাদের সামনে দাঁড়ালেন।… ২৮ জুন ২০১৮ রাত ১.১০ মিনিট-‘উনি এক্সপায়ার করেছেন’-বলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন চিকিৎসক।

বাষ্পরুদ্ধ দুই ভাই পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ অশ্রুধারা কেন যেন থেমে গেল, দু’জনই হা করে গেলেন। পৃথিবী তখন তাদের কাছে বড়ই অচেনা। চিকিৎসক তাদের নিয়ে চললেন সেই চিরবেদনাবিধুর মুহুর্তের প্রান্তে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অত্যাধুনিক সব যন্ত্র-সেন্সর পরিবেষ্টিত নিষ্প্রাণ একটি দেহ পড়ে আছে ১২ নম্বর বেডে। বিদ্যুতবেগে নিষ্প্রাণ ভাইয়ের পবিত্র পা’য়ে অনেকগুলো চুম্বন একে দিলেন তাঁর পরম স্নেহের ছোটভাই, শৈশবে যাঁর কোলে চড়ে মাঠে-ঘাটে, বাজারে যেত-যাঁর শক্ত পায়ের ওপর দুই দশক দাঁড়িয়ে ছিল গোটা পরিবার। এবার সেই হাতটি শক্ত করে চেপে ধরলেন দুই ভাই। সেই লোমশ বুকে হাতটি বুলিয়ে কিছুক্ষণ নিষ্পন্দ দু’জন। মায়ামাখা সেই মুখের দিকে তাকালেন দুই ভাই।পরম ভালবাসার চুম্বনে সিক্ত হলেন তাদের দাদাভাই।

বটবৃক্ষের পতনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুই ভাই মা-বাবা’কে খবর জানাবার সাহস পেলেন না। অন্য স্বজনদের মাধ্যমে দুঃসংবাদ পৌছাল সবার কাছে। দাদা হাজী আক্কাস আলী মুন্সীর পরিবারে যে নক্ষত্রের উদয় হয়েছিল তার অকালেই পতন হল। আইসিইউ থেকে প্রিয় দাদাভাইয়ের নিথর থেকে বের করে আনলেন দুই ভাই। নিয়ে যাওয়া হল মরচুয়ারিতে।গোসল করিয়ে সাদাশুভ্র কাফনে আবৃত হলেন সেনাবাহিনীর বীর সদস্য কর্পোরাল আবদুর রউফ। খবর পেয়ে পিতৃহারা দুই নাতীকে নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে এলেন মা। এলেন প্রিয়তমা স্ত্রী। গভীর রাতেই শিশুপুত্রকে নিয়ে ছুটে এলেন প্রয়াতের প্রিয় লিপি ভাবী। ছুটে এলেন ঢাকায় বাস করা সব স্বজনরাই।

আনুষ্ঠানিকতা সারতে বেশ বেলা হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পেরিয়ে শেষ হল সিএমএইচ’র আনুষ্ঠানিকতা-মরদেহ হস্তান্তর। এলো ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স, স্বজনদের জন্য আরেকটি মাইক্রোবাস। সবাইকে মাইক্রোবাসে বসিয়ে প্রিয় দাদাভাইয়ের নিথর দেহকে বহন করা অ্যাম্বুলেন্সে চালকের পাশের আসনে উঠে বসলেন ছোটভাই আশরাফুল ইসলাম। সঙ্গে প্রয়াতের এক সহকর্মী। সিএমএইচ থেকে শববাহী গাড়ীবহর এগিয়ে চললো শিমুলতলা গ্রামের পথে। উত্তরা, আবদুল্লাপুর পেরিয়ে গাজীপুরে নিজ জেলায় প্রবেশ করলো গাড়ি, শেষ যাত্রা। আর কোনো দিন বাসে চেপে এই পথে ফিরবেন না তিনি। সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত চললো গাড়ি বহর।

বেরাইদেরচালা গ্রাম। এই গ্রামে চাকরি জীবনের কষ্টার্জিত অর্থে ছোট্ট ছিমছাপ গুছালো আবাস গড়েছিলেন পৌরসভার মাঝে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় যাতে বিঘ্ন না হয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে স্বল্প সময়ের জন্য গাড়ি ঘুরিয়ে নেওয়া হল বেড়াইদের চালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে, অদূরে তাঁর বাসা। নিজ হাতে গড়ে তোলা বাড়ি ফল-ফুল গাছে সুশোভিত। তারা নিরবেই বিদায় জানাল প্রিয় কর্তাকে। নীচে নামিয়ে আনা দেহখানি ফের তোলা হল অ্যাম্বুলেন্সে। মাওনা পেরিয়ে এবার গাড়ি প্রবেশ করলো গ্রামের পথে জৈনা বাজার-কাওরাইদ সড়কে। গাড়ির সামনে বসা সহোদর হু হু করে কেঁদে উঠলেন, নির্বাক দাদাভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। যে গ্রাম আবদুর রউফকে তৈরি করেছে, সেই গ্রামই তাকে বরণে প্রস্তুত। বৃক্ষরাজি, লতাপাতা সেই পবিত্র জন্মভূমির মাটি…। ততোক্ষণে বাড়িতে পৌছে গেছেন রউফ। মা-ছেলে মেয়ে তখনও পেছনের গাড়িতে। শোকার্ত স্বজন-এলাকাবাসী ভেঙে পড়লেন তাদের প্রিয় সন্তানকে শেষবারের মত দেখতে।

রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে লেফটেনেন্ট আবু হানিফ মোঃ সাকনাইন এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি চৌকষ দল এসে পৌছাল। প্রয়াত চাচা নেওয়াজ আলীর বাড়ির পাশে সুবিশাল মাঠে নামাযে জানাজার জন্য স্বজনদের কাঁধে চেপে খাটিয়ায় শুয়ে এগিয়ে চললেন বংশের গৌরব আবদুর রউফ। স্বজনদের পর তাঁর পেশাদারিত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দিলেন লেফটেনেন্ট আবু হানিফ মোঃ সাকনাইন। সেনাবাহিনীর পদাতিক ডিভিশনের প্রধান ‘পাপা টাইগার’ নামে যিনি অভিষিক্ত, তাঁর সমবেদনা পৌছে দিলেন নবীন এই কর্মকর্তা। জানাজা শেষে ফের নিজ বাড়ির প্রাঙ্গনে নেওয়া হল আবদুর রউফের নিথর দেহ।

এবার পার্থিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন লাভ করতে চলছেন তিনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে তাকে। চৌকষ সহকর্মীরা তাকে অন্তিম শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন, বিউগলে বেজে উঠলো সকরুণ সুর। গুলি ছোড়ে শেষ বিদায় জানানো হল। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আরও একবার বিবর্ণ সেই চাঁদমুখ দর্শনে শোকবিহম্বল স্বজনরা। আদরের কন্যা সুখি বাবাকে ছাড়তে চায় না কিছুতেই। মা’য়ের বুক ফাটা আর্তনাদ বাড়ির বোবা প্রাণিগুলোকেও শোকস্তব্ধ করে দেয়।

এবার তাকে চিরঘুমে নিয়ে যেতেই হবে.. চৌকষ সেনা সদস্যরা তাদের সহকর্মীকে পরম শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় বহন করে নিয়ে চললেন রাস্তার পাশে সেই সবুজ ঘাসে ঘেরা স্থানে, যেখানে শেষনিদ্রার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। লাল মাটি খুড়ে তৈরি করা কবরের পাশে নামানো হল দেহখানি। সবার আগে ভাইয়ের শেষ ঠিকানায় নেমে পড়লেন আরেক ভাই সজীব। সবার পরম আদরে ধীর পদক্ষেপে মাটির শয্যায় নামানো হল তাকে। সাদা কাফনের বাধনগুলো খুলে দেওয়া হল। এক এক করে সবাই উপরে উঠে এলেন। ভাইকে চির একা ফেলে রেখে বিধির চিরায়ত বিধান মেনে আরেক ভাইকেও উঠে আসতে হল। কাঁচা বাঁশের পাটাতন বিছিয়ে একে এক ঢেকে দেওয়া হল। মাটিতে ঢেকে গেল বাঁশগুলো। ছোট্ট মাটির ঘরটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত রইলেন একজন।

পেছনে পড়ে রইল ৩৯ বছরের পার্থিব জীবন, দুই প্রিয় সন্তান, বাবা-মা, প্রিয়তমা স্ত্রী, দুই সহোদর-অগণিত স্বজন। কত স্মৃতি-তাঁর অগণিত পদচিহ্ন বহন করে আছে এই জনপদ। তাঁর হাতের স্পর্শে প্রাণ পাওয়া বৃক্ষরাজি, আম গাছের সারি, নেপিয়ার ঘাসের ক্ষেত, পরম আদরে গড়া কৃষি খামারে বড় হয়ে উঠা ছাগলগুলো, রাজহাঁস-তারাও কী নীরবে কেঁদেছিল সেদিন? প্রতিদিন খাবারের জন্য অস্থির হয়ে উঠা প্রাণিগুলোও সেদিন চুপচাপ। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক তবে প্রাণিদেরও আচ্ছন্ন করে! ‘প্রাণিবন্ধু’ কর্পোরাল আবদুর রউফ’র প্রয়াণ সেই দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

লেখক : প্রয়াত ‘প্রাণিবন্ধু’ কর্পোরাল আবদুর রউফ এর অনুজ ও প্রধান সম্পাদক, বহুমাত্রিক ডটকম এবং বিশেষ প্রতিনিধি, আলিপুর বার্তা

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।