Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪৩১, মঙ্গলবার ২৮ মে ২০২৪

বাংলা সন ও নববর্ষ উদ্‌যাপন যেভাবে শুরু হয়

প্রকাশিত: ১১:৩৮, ১৪ এপ্রিল ২০২৪

প্রিন্ট:

বাংলা সন ও নববর্ষ উদ্‌যাপন যেভাবে শুরু হয়

ফাইল ছবি

বিশ্বের দেশে দেশে প্রাচীনকাল থেকে নতুন বর্ষ উদ্‌যাপনের রীতি আছে। পুরোনোকে বিদায় দিয়ে নতুনকে স্বাগত জানানোর এ দিনটি সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়। কালক্রমে বর্ষবরণে আসে পরিবর্তন। বাংলা নববর্ষও এর ব্যতিক্রম নয়।

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ কবে থেকে উদ্‌যাপিত হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আরেকটি প্রশ্নের ওপর। প্রশ্নটি হলো বাংলা নববর্ষের সূচনা কবে?

বাংলা নববর্ষের সূচনা কবে, এ প্রশ্ন নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। এর মধ্যে দুটি বেশ আলোচিত। এক. গৌড়ের প্রাচীন রাজা শশাঙ্ক বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। শশাঙ্ক গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে একজন সামন্ত রাজা ছিলেন। পরে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম গৌড়ভূমির শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আধুনিক বহরমপুর শহরের কাছে কর্ণসুবর্ণতে ছিল এর রাজধানী। রাজা শশাঙ্ক মারা যান ৬৩৭ বা ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রায় ৪৫ বছর আগে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। সেই সময়; অর্থাৎ, ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বঙ্গাব্দ চালু করা হয়।

এটা ধরে নিলে ইতিহাসের একটা জট খুলে যায়। কারণ, বঙ্গাব্দর সঙ্গে খ্রিষ্টাব্দের ব্যবধানও ঠিক ৫৯৩ বা ৫৯৪ বছর। উদহরণস্বরূপ, আজ শুরু হলো ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। আর গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি বা খ্রিস্টাব্দ ২০২৪। ২০২৪ থেকে ১৪৩১ বিয়োগ করলে দাঁড়ায় ৫৯৩, যে ব্যবধান একদিন আগেও ছিল ৫৯৪। কিন্তু প্রথম বাঙালি সম্রাট ও প্রথম স্বাধীন বাঙালি এ নৃপতির আমলে বঙ্গাব্দে হিসেব রাখার কোনো প্রমাণ নেই। তাঁর আমলে হিসেব রাখা হতো শকাব্দে।দ্বিতীয় মতটি হলো তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। এই নতুন বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে তারিখ-ই-এলাহী নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ এটি বঙ্গাব্দ নামে প্রচলিত হয়। নতুন এই সালটি আকবরের রাজত্বের ঊনত্রিশতম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। কারণ, এদিন আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

আকবরের বঙ্গাব্দ চালুর কারণ সম্পর্কে প্রচলিত মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ভাষ্যটি হলো—ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। তাই চাষাদের অসময়ে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। ফলে নানা সমস্যা দেখা দিত।

সম্রাট আকবর এ সমস্যার সমাধান করতে চাইলেন। তাঁর আদেশে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজী গ্রেগরীয় সৌর সন ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন তৈরি করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

তবে সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলার ১২টি মাস বহু শতাব্দী আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। সৌর পঞ্জিকা শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো।

সময়ের বিবর্তন ও প্রয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনায় উদ্‌যাপিত সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ, আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের আগ পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

আবুল ফজলের আকবরনামার বর্ণনা অনুযায়ী, আকবরের সময় থেকে প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা পরিশোধ করত। এর পরদিন; অর্থাৎ, পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটিই বর্তমানে এত বড় সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি (১৫৭০-১৬১৩) তাঁর বাসভবনের সামনে প্রজাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ ও বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। এই উপলক্ষে খাজনা আদায় ও হিসাব–নিকাশের পাশাপাশি মেলায় গান-বাজনা, গরু-মহিষের লড়াই, কাবাডি খেলা হতো।

বিশেষজ্ঞদের মত,ভারতে প্রচলিত অন্য সনের মতো বিভিন্ন সময়ে বাংলা সনও সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫২ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বাধীন কমিটির সংশোধন প্রস্তাব অন্যতম। ভারত সরকার ১৯৫৭ সালে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬৩ সালে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে প্রধান করে বাংলা সন সংস্কার কমিটি করা হয়। ১৯৬৬ সালে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

লক্ষ্যণীয় বিষয়, উল্লেখিত দুই কমিটির প্রধানদের কেউ পঞ্জিকা বিশেষজ্ঞ বা জ্যোতির্বিদ নন। তাই তাঁদের সন সংস্কার নিয়ে একাডেমিক মত দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত এ দুই ব্যক্তিকে তাঁদের পাণ্ডিত্যের কারণে সন সংস্কার কমিটির প্রধান করা হয়েছিল। তাঁরা উভয়েই আকবরের নির্দেশে তৈরি, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ‘রেগুলারাইজড’ করা অব্দকেই বঙ্গাব্দ বলে মেনে নিয়েছেন।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত ‘বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস চর্চা এবং বৈজ্ঞানিক সংস্কার’ বইয়ে মেঘনাদ সাহা ও শহিদুল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। জয়নাল আবেদিন খানের ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গাব্দ : বাংলা সন ইতিহাস, উৎপত্তি ও বিকাশ’ বইয়ে এ বিষয়ে আলোচনা আছে।

বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে মন্তব্য করে স্মরণীয় হয়ে আছেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি নানা বক্তৃতায়, প্রবন্ধে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ভারতের রাজনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধের বই ‘দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’-এ  বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে সুন্দর আলোচনা আছে। আধুনিক বঙ্গাব্দ আকবরের আমলেই উদ্ভব হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক কিংশুক চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ‘শশাঙ্কর আমলে তো বাংলা ভাষাটাই চালু হয়নি। কাজেই তিনি বাংলার জন্য আলাদা অব্দ বা সাল চালু করেছিলেন—এটা ভাবাটা বেশ বাড়াবাড়ি। বরং ইতিহাসে আমাদের বলে, মুঘল বাদশাহ আকবর বাংলা জয় করার পর এখানে একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা যখন দেখলেন বাংলা থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটা ক্যালেন্ডার দরকার, আর সেটাকে হিন্দু শকাব্দর সঙ্গে সংযুক্ত না করে বরং মুসলিম হিজরির সঙ্গে কানেক্ট করেই ক্যালিব্রেট করা যাক। খুব সম্ভবত সেভাবেই আকবরের দূতরা বঙ্গাব্দ চালু করে গিয়েছিলেন।’

তবে বাংলায় মুঘল যুগের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ ইতিহাসবিদ অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় এ ক্ষেত্রে একটু ভিন্নমত পোষণ করেন। বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, ‘আসলে ফসল তোলার ভিত্তিতে সাল গোনার যে রেওয়াজ, যাকে “ফসলি” বলা হয়, সেটা কিন্তু ভারতের প্রায় সর্বত্রই চালু ছিল, বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ফসলিকেই আকবর বাংলায় একটু অদল-বদল করে হয়তো “রেগুলারাইজ” করেছিলেন—সেই কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে তার। কিন্তু বঙ্গাব্দর প্রবর্তক আকবর, এটা বলা কতটা সমীচীন হবে আমি ঠিক নিশ্চিত নই।’

নববর্ষ উদ্‌যাপনে পরিবর্তন
এরপর বিভিন্ন শতাব্দীতে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে এসেছে নানা পরিবর্তন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ বা মিত্রশক্তির জয় কামনা করে জাঁকজমকভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের কথা শোনা যায়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও একইভাবে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন শুরু হয়।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, ইংরেজ শাসনামলে বা ঔপনিবেশিক ভারতের মধ্যে বাংলা নববর্ষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নববর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য শান্তিনিকেতনে এলাহী আয়োজন করতে থাকেন। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ থেকে শুরু করে তাঁর অনেক গান পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।

ব্রিটিশ আমলের পর পাকিস্তান আমলে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন মূলত পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কারণ, সে সময় আইয়ুব খানের সরকার বাঙালিদের নববর্ষ উদ্‌যাপনে বাধা দেয়। বাঙালি মনীষীদের জন্মদিন বা রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন নিষিদ্ধ করা, কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন লেখাকে কাট-ছাঁট করা বা তাঁর লেখার সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়।

দেশ স্বাধীনের পর আড়ম্বরপূর্ণ হতে থাকে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন। আশির দশকের শেষ দিকে স্বৈরশাসনের সময় পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান আবার প্রতিবাদের ভাষায় রূপ নেয়। এই সময়ে এসেই ১৯৮৯ সালে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যোগ হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এখন পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রায় সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণে একটি প্রধান অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে।

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer