Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

শ্রাবণ ৩০ ১৪৩৩, রোববার ১৬ আগস্ট ২০২৬

তেলাপিয়ার প্রাণঘাতী রোগ শনাক্তে দ্রুত ডায়াগনস্টিক কিট উদ্ভাবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বহুমাত্রিক.কম

প্রকাশিত: ০০:৪১, ১৬ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০০:৪২, ১৬ আগস্ট ২০২৬

প্রিন্ট:

তেলাপিয়ার প্রাণঘাতী রোগ শনাক্তে দ্রুত ডায়াগনস্টিক কিট উদ্ভাবন

গবেষণাগারে অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানসহ সহ-গবেষকরা। ছবি: সংগৃহীত

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (IBGE)-এর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে একদল গবেষক তেলাপিয়াসহ অন্যান্য চাষকৃত মাছে স্ট্রেপ্টোককোসিস রোগের জীবাণু দ্রুত শনাক্ত করার জন্য একটি ডায়াগনস্টিক কিট উদ্ভাবন করেছেন।

স্ট্রেপ্টোককোসিস বিশ্বব্যাপী চাষকৃত তেলাপিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এ রোগের কারণে ব্যাপক হারে মাছের মৃত্যু ঘটে এবং মাছ চাষিরা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও শরৎকালে, বিশেষ করে পানির তাপমাত্রা প্রায় ৩০° সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

আক্রান্ত মাছের প্রধান লক্ষণগুলো হচ্ছে: উভয় চোখ অস্বাভাবিকভাবে বাইরে বেরিয়ে আসা (Bilateral exophthalmia), কর্নিয়ায় সাদা অথবা ঘোলাটে ভাব, ত্বক ও পাখনার গোড়ায় রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত শ্লেষ্মা নিঃসরণ, খাদ্যে অনীহা, পেট ফুলে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক বা ঘূর্ণায়মান সাঁতার কাটা।

ব্যাকটেরিয়া মাছের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে সারা শরীরে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে এবং লিভার ও প্লীহার মতো অভ্যন্তরীণ অঙ্গ আক্রান্ত করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে সংক্রমণ মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পরে, যার ফলে অস্বাভাবিক বা ঘূর্ণায়মান ভাবে সাঁতার কাটতে থাকে। নিবিড় ও আধা-নিবিড় মাছ চাষ ব্যবস্থায় এ রোগের কারণে ব্যাপক হারে মাছের মৃত্যু ঘটে থাকে।

স্ট্রেপ্টোককোসিস রোগে আক্রান্ত মাছ

মাছের স্ট্রেপ্টোককোসিস রোগের অন্যতম জীবাণু হচ্ছে Streptococcus গণের কয়েকটি প্রজাতি। এছাড়া Enterococcus এবং Lactococcus গণের বিভিন্ন প্রজাতিকেও  স্ট্রেপ্টোককোসিস সংক্রমণের কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে আক্রান্ত মাছ থেকে Streptococcus agalactiae এবং Enterococcus faecalis শনাক্ত করা হয়েছে। 

অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান এবং তাঁর গবেষকদল দীর্ঘদিন ধরে চাষকৃত মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। এই গবেষণার ধারাবাহিকতায় তাঁরা সম্প্রতি একটি মাল্টিপ্লেক্স রিকম্বিনেজ পলিমারেজ অ্যামপ্লিফিকেশন–ল্যাটারাল ফ্লো অ্যাসে (multiplex-RPA-LFA) প্রযুক্তিনির্ভর কিট উদ্ভাবন করেছেন।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে একটি মাত্র ল্যাটারাল-ফ্লো স্ট্রিপে একই সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। পরীক্ষাগারে প্রায় ৪০- ৫০ মিনিটের মধ্যে এই পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যায় এবং এর জন্য জটিল বা ব্যয়বহুল কোনো ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। অতিরিক্ত নমুনা প্রস্তুতির ধাপ যুক্ত করলে আক্রান্ত মাছের টিস্যু থেকে সরাসরি প্রায় ১–১.৫ ঘণ্টার মধ্যে জীবাণু শনাক্ত করা সম্ভব।
 

মাল্টিপ্লেক্স RPA-LFA কিটের মাধ্যমে স্ট্রেপ্টোকক্কোসিসের রোগজীবাণু শনাক্তকরণ

১. স্ট্রিপের ১ ও ২ নম্বর অবস্থানে দুটি ব্যান্ডের উপস্থিতি Enterococcus faecalis-এর উপস্থিতি নির্দেশ করে।

২. ১ নম্বর অবস্থানে একটি মাত্র ব্যান্ডের উপস্থিতি নেগেটিভ ফলাফল নির্দেশ করে।

৩. স্ট্রিপের ১, ২ ও ৩ নম্বর অবস্থানে তিনটি ব্যান্ডের উপস্থিতি Enterococcus faecalis এবং Streptococcus agalactiae উভয় জীবাণুর উপস্থিতি নির্দেশ করে।

৪. স্ট্রিপের ১ ও ৩ নম্বর অবস্থানে দুটি ব্যান্ডের উপস্থিতি Streptococcus agalactiae - এর উপস্থিতি নির্দেশ করে।

মাছের রোগজীবাণু দ্রুত শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশে উদ্ভাবিত এটিই প্রথম মাল্টিপ্লেক্স RPA-LFA-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি। প্রচলিত ল্যাবরেটরি অবকাঠামো বা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায় দ্রুত ও মাঠপর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, রোগজীবাণুর পরিমাণ শনাক্তযোগ্য পর্যায়ে থাকলে দৃশ্যমান রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই সংক্রমিত বা বাহক (carrier) মাছ শনাক্ত করার সম্ভব। এর ফলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই যথাযথ বায়োসিকিউরিটি, খামার ব্যবস্থাপনা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হতে পারে। সহজে ও দ্রুত রোগজীবাণু শনাক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এই প্রযুক্তি রোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে, জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এবং বাংলাদেশে আরও টেকসই ও উৎপাদনশীল মৎস্যচাষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। 

Walton
Walton