Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

মাঘ ২৯ ১৪৩২, বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের

বহুমাত্রিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৩৮, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রিন্ট:

নির্বাচনের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের

ছবি: সংগৃহীত

অপেক্ষার পালা শেষ। রাত পেরিয়ে সূর্যের আলো ফুটতেই শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট গ্রহণ। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দেশে উৎসব-উদ্দীপনায় এক নির্বাচনী উৎসবে ভাসছে মানুষ। ভোটে অংশ নিতে শহর ছেড়ে ঘরে ফিরেছেন নগরবাসী। নির্বাচনের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনে যে কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুরোপুরি সতর্ক অবস্থানে মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে চলমান রয়েছে যৌথ বাহিনীর টহল, বিশেষ মহড়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ও তল্লাশি কার্যক্রম। ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, বডিওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহলের মাধ্যমে উৎসব মুখর ভোটগ্রহণে সচেষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ভোটকেন্দ্রের ভেতরের নিরাপত্তা ছাড়াও বাইরে স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠে রয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত বোম্ব ডিজপোজাল ইউনিট, সোয়াট, কে-নাইন ও ক্রাইম সিন ভ্যান।

সূত্র জানায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্য, ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৭৩০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্ট গার্ড সদস্য, ৭ হাজার ৭০০ জন র‌্যাব সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবার ভোটের মাঠে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে ড্রোন। বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য শনাক্তে ভোটের মাঠে বড় পরিসরে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হয়েছে। বিজিবি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমান্ত এলাকায় ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া র‌্যাব ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এবং ডিএমপি ও সিএমপি’র ডগ স্কোয়াড নিয়োজিত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী, নেতা-সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও সহিংসতা বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এবার যদি কোথাও কেন্দ্র দখল হয় কেউ ছাড় পাবে না। তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোট ৭ দিন মাঠে থাকবে। ভোটের আগে ৪ দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর ২ দিন। এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তায় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চসংখ্যক বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যৌথ বাহিনীর টহল কার্যক্রম জোরদার রয়েছে। এছাড়া ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে সে জন্য ভোটারদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করছে। বুধবার দুপুরে মোহাম্মদপুরের শিশুমেলা এলাকায় শেরেবাংলা নগরের ২৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাম্প কমান্ডার মেজর ফুয়াদের নেতৃত্বে এই চেকপোস্ট বসানো হয়। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সড়কে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রতিটি ভোটার এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই এলাকায় যত ভোটার আছেন তারা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন তাদের নিরাপত্তার জন্যই আমরা নিয়োজিত রয়েছি।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচনের নিরাপত্তায় তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে স্ট্যাটিক ফোর্স রয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে মোবাইল টিম টহল দেবে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স। তিনি বলেন, সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সব কেন্দ্রে বাড়তি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। আইজিপি আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের পক্ষ থেকে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা পুলিশ সুপাররা ড্রোন ক্যামেরার সহায়তা নেবেন।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহিদুর রহমান বলেছেন, এবার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ঝুঁকি নেই। তবে নির্বাচনে যারা বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করবে, যারা আইন অমান্য করবে, ভোট চুরি, ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করবে তারা এবার ঝুঁকিতে পড়বেন। আমরা এবার শক্ত অবস্থানে আছি। আমরা প্রতিটি বাহিনী সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আশা করছি দেশবাসীকে আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারবো।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক বলেছেন, নির্বাচন উপলক্ষে গত ১৮ই জানুয়ারি থেকে আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৮ দিনব্যাপী বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সদস্যের ১০০টি প্লাটুন উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী দুর্গম এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাসমূহে মোতায়েন থাকবে। এ সব প্লাটুন স্থলভাগ ও জলভাগে বিভক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ নদীবেষ্টিত ভোলা জেলার দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহের ৬৯টি ইউনিয়নের ৩৩২টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছে। ভোলা জেলার চরাঞ্চল ও নদী বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থিত ভোটকেন্দ্র সমূহে কোস্ট গার্ড সদস্যরা বিশেষ গোয়েন্দা ও ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ টহল পরিচালনা করছে। কোস্ট গার্ড নির্বাচনকালীন যেকোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।

বিজিবি’র ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এসএম আবুল এহসান বলেন, ঢাকা সেক্টরের অধীনস্থ ঢাকা ব্যাটালিয়ন (৫ ও ২৬ বিজিবি), নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি) এবং গাজীপুর ব্যাটালিয়ন (৬৩-বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৯টি জেলা ও ৪টি সিটি কর্পোরেশনের মোট ৫১টি আসনে ৪২টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে সর্বমোট ১৩৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নির্বাচনে বিজিবি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বডিওর্ন ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, মেটাল ডিটেক্টর, এপিসি, আধুনিক সিগন্যাল ও যোগাযোগ সরঞ্জামাদি ব্যবহার করবে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যাটালিয়ন এবং সেক্টর সদর দপ্তরে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। ভোটের দিনে বিজিবি মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে টহল পরিচালনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন, যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যাতে কোনো মহল নাশকতা বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে। দেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিজিবি সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অর্পিত দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে।

নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, ব্যালট বক্স ছিনতাই, জাল ভোট কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে।

ডিএমপি উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ঢাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ছাড়াও পুলিশের বিশেষায়িত বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াত, কে-৯ ইউনিট ও ক্রাইম সিন ভ্যান মোতায়েন থাকবে। ঢাকায় ডিএমপি’র ২৬ হাজার ৫১৫ জন সদস্য নির্বাচনের বিভিন্ন দায়িত্বে মোতায়েন করা হয়েছে।

Walton
Walton