ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তদন্তে হাসপাতালের অবহেলা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে এই কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘গেল ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয়টি নবজাতক শিশু মারা গেছে। এ ঘটনাটিকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছি। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি, তাদের তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। আজ বিকেল ৩টায় সেই প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি।’
প্রতিবেদনের মূল অংশ উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি হাসপাতালটি পরিদর্শনপূর্বক ঐক্যমত পোষণ করেন যে ভবনটি হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। সংশ্লিষ্ট পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ নম্বর দুই পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রতিয়মান হয়, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি ছিল। পক্ষান্তরে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল। দায়িত্বরত সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল।’
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নবজাতকদের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালের সক্রিয় ইমারজেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না। অভিভাবকদের আহ্বানের সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোন চিকিৎসককে বিষয়টি না জানিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যু রোধে প্রয়োজনীয় উপযুক্ত যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি। কক্ষটি প্রায় ৯০০ বর্গফুট, যেখানে ১১ নবজাতক এবং রোগীর লোকসহ প্রায় ৫০ জনের উপস্থিতি ছিল, যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।’
হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ হাসপাতাল পরিচালনার প্রাথমিক শর্তগুলো পালনে সক্ষম ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভর্তি রোগীদের দেখাশোনার জন্য কোনো চিকিৎসক ছিল না, দায়িত্বরত সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি, আলো বাতাস চলাচলের ভেন্টিলেশন জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, নবজাতক ও রোগীর এটেন্ডেন্টসহ অতিরিক্ত সংখ্যক জনগণের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের কারণে হাসপাতালটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ মর্মে প্রতিয়মান হয়েছে। তদন্ত কমিটি মনে করে ভবিষ্যতে বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহৃত ভবন পরিদর্শন পূর্বক পরিবেশ অধিদফতরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হিসেবে শর্তারূপ করা প্রয়োজন।’
মৃত্যুর কারণ হিসেবে যেসব বিবেচনা হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ছোট বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া, কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’
এর আগে গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ (পোস্ট ডেলিভারি) ওয়ার্ডে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শ্বাসরোধে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই রমনা থানা পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
ঘটনার দিনই সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা) প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালককে (হাসপাতাল-১)। এ ছাড়া অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (আইন শাখা) এই কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে শিশুদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকারের বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও পরবর্তীতে সময় বাড়িয়ে ৪ জুন করা হয়।




