Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৪ চৈত্র ১৪২৬, মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২০, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

আশুলিয়ায় খোলা আকাশের নিচে সিসা কারখানা:স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয়রা


১৩ মার্চ ২০২০ শুক্রবার, ০৬:০৩  পিএম

তুহিন আহামেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


আশুলিয়ায় খোলা আকাশের নিচে সিসা কারখানা:স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয়রা

আশুলিয়ার বিক্রমপুর (ভিকুমপুর) এলাকার সিসা গলানোর কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ আশপাশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এসব রাসায়নিকের কারণে ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষসহ পশুপাখি ও পরিবেশ রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

তবে কারখানার মালিক রিপন হোসেন জানান ক্ষতিকর সবদিক জেনেও তিনি খোলা আকাশের নিচে সিসা গলানোর কারখানা গড়ে তুলেছেন।অনুমোদনহীন এ কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কারখানার রাসায়নিকে দূষণ ছড়াচ্ছে ফসলের ক্ষেতেও।

শুধু তাই নয় সিসা কারখানার পাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া গাজীখালী নদীতে সিসা কারখানার আবর্জনা ফেলানোর কারণে নদী সহ আশপাশের ধানি জমি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। কমে গেছে ফলনও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভারের আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউপি’র বিক্রমপুর (ভিকুমপুর) এলাকায় গাজী খালের পাশেই গড়ে উঠেছে খোলা আকাশের নিচে সিসা গলানোর কারখানা। এ কারখানাটি গেল এক মাস ধরে গড়ে তুলেছেন বগুড়ার রিপন হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এ কারখানার কোন অনুমোদন না থাকলেও শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেডলাইসেন্স নিয়েছেন মালিক রিপন।

পরিত্যক্ত ব্যাটারি পুড়িয়ে বিশুদ্ধ সিসা বের করা হয় এ কারখানায়। উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যাটারির পাত গলিয়ে সিসা ও লোহা আলাদা করা হয়। পরে ওই সিসা আবারো ব্যাটারি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।

জানা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রায় পাত গলানোর সময় কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ উৎপন্ন হয়। ধোঁয়ার মাধ্যমে এসব পদার্থ চারদিকে প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যা থেকে পরিবেশ, প্রতিবেশ, ফসল এবং মানবদেহের ক্ষতিসাধন করে থাকে। ফলে শ্বাষকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন মানুষজন।

স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরাতন ব্যাটারি সংগ্রহ করে তা আগুনে গলিয়ে বিশুদ্ধ সিসা বের করা হয়। সিসা গলানোর গন্ধ ও ধোঁয়ায় আশপাশের লোকজন থাকতে পারছেন না। অনেকের শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। এছাড়া কারখানার পাশের ধানি জমিতে লাগানো ধান মৌসুম ছাড়া পাতা মরে যাচ্ছে। এছাড়া কারখানা ঘেষেই রয়েছে একটি লাউ ক্ষেত। ওই কারখানার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ নদের শাখা গাজী খাল। কারখানার বর্জ্য ওই খালে ফেলে দূষণ করছে।

কারখানার পাশেই বসবাসকারী অধিকাংশ লোকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী। ফলে তারা ভয়ে কিছুই বলতে পারছেন না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই রলাকার অনেকেই জানিয়েছেন, প্রতিদিন রাতে সিসা গলানোর কাজ শুরু হয় চলে ভোর পর্যন্ত। এ সময় গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। সিসা গলানো কারখানার কারণে শ্বাসকষ্ট সহ নানা সমস্যায় রয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: সফিকুল ইসলাম সফিক বলেন, সিসা উচ্চ তাপমাত্রায় গলানোর সময় সহযোগী হিসেবে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ উৎপন্ন হয়। এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে অ্যাজমা, চোখের রোগ, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

সূত্র জানায়, এ কারখানা থেকে ধোঁয়া ও ভারী ধাতু ছাইয়ের সাথে বাতাসে মিশে আশপাশের কৃষি জমিতে পড়ছে। আর এসব জমিতে জন্মানো ঘাস খেয়ে গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে ওই কারখানায় গিয়ে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে পুরানো ড্রাইসেল ব্যাটারি ও সিসাযুক্ত দ্রব্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো কারখানায় এনে পুড়িয়ে প্রথমে সিসা বের করা হয়। পরে চুলায় দিয়ে ঢালাই করা হয় এবং নতুন ব্যাটারিতে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। পরে সাভার ও ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয়।

কারখানার মালিক রিপন হোসেন মোঠোফোনে জানান, সিসা গলানোর ফলে পরিবেশ, মাটি ও মানুষের ক্ষতি হয় জেনেও তিনি খোলা আকাশের নিচে সিসা কারখানা গড়ে তোলেছেন। পরিবেশের কোন ছাড়পত্র নাই অকপটে স্বীকার করলেও শিমুলিয়া ইউনিয়ন থেকে তিনি মঞ্জু মেঘলা ব্যাটারি নাম দিয়ে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। সেখানে তিন মাসের জন্য তাকে এ কারখানা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান।

খোলা আকাশের নিচে সিসা গলানোর ক্ষতিকর দিক নিয়ে ঢাকা কলেজ এর রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মো: আসলাম হোসেন বলেন, খোলা জায়গায় ব্যাটারী গলানো হলে ব্যাটারীর রাসায়নিক আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুতে গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃস্বরণ করে এবং বায়ু দূষণ হয়। সেই সাথে বায়ু মন্ডল উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এছাড়া গলিত ব্যাটারী থেকে যে ধাতু আসে যেমন-লেড, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি বায়ু, মাটি ও পানির সাথে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগবালাই সৃষ্টি করে। যেমন স্মৃতি হ্রাস, ক্যান্সার ইত্যাদি। এর ফলে বিশেষ করে শিশুরা বেশী ঝুকিতে থাকে। ব্যাটারী ব্যবহৃত বিভিন্ন এসিড যেমন সালফিউরিক এসিড সরাসরি পানি ও মাটিতে যায় এবং এতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী মারা যায়, উদ্ভিদ ও গাছপালা মারা যায়। ফলে ওই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়।

পরিবেশ দূষণকারী অবৈধ সিসা ঢালাই কারখানা দ্রুত বন্ধ করা না গেলে এ এলাকা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, আশঙ্কা স্থানীয়দের। তবে সংশ্লীষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসি।

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।