ফাইল ছবি
পারমাণবিক যুদ্ধ, বিশাল কোনো গ্রহাণুর আঘাত, ভয়াবহ মহামারি কিংবা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ঘটলে বিশ্বের কোন দেশ তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে, সেই প্রশ্নে অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে রাখছে নতুন এক গবেষণা। দেশটির ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, খাদ্য ও জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে গবেষণার এই তথ্য তুলে ধরেছে এবিসি। গবেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের প্রভাব মোকাবিলায় অন্য অনেক দেশের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। তবে এমন কোনো দেশ নেই, যেটি এ ধরনের বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে পুরোপুরি নিরাপদ।
যে কোনো ঘটনা বিশ্বের অন্তত ১০ শতাংশ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, তাকে ‘গ্লোবাল ক্যাটাস্ট্রফিক রিস্ক’ বা বৈশ্বিক বিপর্যয়কর ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এসব ঝুঁকির মধ্যে সূর্যালোকের আকস্মিক হ্রাস, অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস বা অচল হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক জৈবিক হুমকি বা মহামারি রয়েছে।
গবেষক ম্যাট বয়েডের মতে, এমন বিপর্যয় শুধু কল্পকাহিনির বিষয় নয়। ইতিহাসে বড় মাত্রার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যিক পতনের ঘটনাও ঘটেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।কোভিড-১৯ মহামারি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সংজ্ঞায় পুরোপুরি না পড়লেও এটি বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল।
অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য সুবিধার অন্যতম কারণ দেশটির ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা। বিশ্বের প্রধান জনবসতিগুলো থেকে দূরে অবস্থান করায় কোনো কোনো মহামারি, যুদ্ধ বা অন্যান্য বিপর্যয়ের প্রভাব দেশটিতে তুলনামূলক দেরিতে পৌঁছাতে পারে।
খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও অস্ট্রেলিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির বিশাল কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সময় খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে পারে।
নিজস্ব জ্বালানি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মজুতও বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকটে অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। পাশাপাশি দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে বড় শহরগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো অনেক ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অল্প জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের পাশাপাশি এসব শহরের জীবনযাত্রা পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহনসহ একাধিক আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
কোনো বড় দুর্যোগে এসব ব্যবস্থার একটি অংশ অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বড় কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে ছাই ও কণা ছড়িয়ে সূর্যালোক কমে গেলে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একইভাবে বড় ধরনের সাইবার হামলায় শহরের বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। নতুন কোনো বৈশ্বিক মহামারি দেখা দিলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেশি।
এ কারণে শুধু অস্ট্রেলিয়াকে একটি দেশ হিসেবে বিবেচনা করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, স্থানীয় কমিউনিটির সক্ষমতাও বিপর্যয় মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনেক অস্ট্রেলীয় বড় শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ছোট ও আঞ্চলিক এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলের বেগা ভ্যালি এর একটি উদাহরণ। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই অঞ্চলে একাধিক ছোট শহর ও গ্রাম রয়েছে।
বেগা ভ্যালির বাসিন্দা কেট সলিসের মতে, ওই অঞ্চলের বড় শক্তি হলো সামাজিক সংযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা। সংকটের সময় মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভর করতে পারা এবং সামাজিক বন্ধন দুর্যোগের পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দুর্যোগের আগে একটি কমিউনিটির মধ্যে সামাজিক সংহতি যত বেশি থাকে, দুর্যোগের পর সেটি কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তত বেশি হতে পারে। ফলে বৈশ্বিক কোনো বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, স্থানীয় মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




