ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তা ইরানকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। এ পরিস্থিতিতে জর্ডানসহ অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা কুপারের একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছবি, ভিডিও ও প্রতিক্রিয়া দেখে ইরান প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারছে তাদের হামলা কতটা সফল হয়েছে। এতে মার্কিন সেনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গত মঙ্গলবার লেখা ওই চিঠিতে কুপার বলেন, ওপেন সোর্স তথ্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ এমন সব তথ্য পাচ্ছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের জন্য মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য হিসেবে কাজ করছে। তিনি সেনাসদস্যদের অপারেশনাল নিরাপত্তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানালেও কী ধরনের নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেননি।
একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। জর্ডান সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একই ধরনের নীতিমালা কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, অ্যাডমিরাল কুপারের বার্তার উদ্দেশ্য ছিল সেনাসদস্যদের অপারেশনাল নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া। তিনি বিভিন্ন সময় এ ধরনের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
চিঠিতে কুপার চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওর উল্লেখ করেন। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় মার্কিন সেনারা বাংকারে আশ্রয় নিচ্ছেন। ভিডিওটি এক সেনাসদস্যের মেটা স্মার্ট গ্লাস দিয়ে ধারণ করা হয়েছিল এবং পরে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়।
কুপারের মতে, এ ধরনের ভিডিও না থাকলে ইরানের পক্ষে হামলার প্রকৃত ফলাফল মূল্যায়ন করা অনেক কঠিন হতো। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত রাখে।
তিনি আরও লেখেন, ইরান জানে তারা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে কি না, রানওয়েতে পড়েছে নাকি জনবহুল স্থাপনায় আঘাত হেনেছে তা তারা নিশ্চিতভাবে জানে না। কিন্তু সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হলে সেটি কার্যত ইরানের জন্য বিনা খরচে যুদ্ধের মূল্যায়ন করে দেওয়ার শামিল। এমন তথ্য ইরানকে দ্রুত আরও কার্যকর দ্বিতীয় দফার হামলার পরিকল্পনা করতেও সহায়তা করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে, চলমান সংঘাতে মার্কিন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনও কমেছে। বর্তমানে প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।
ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ-সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তারা বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি, রাডার টাওয়ার, ব্যারাক ও বিমান হ্যাঙ্গারের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। পাশাপাশি যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন। সিএনএনের এক তদন্তে ওই হামলায় ১২০ শিক্ষার্থী ও ২৬ শিক্ষকসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
মোবাইল ফোন ব্যবহারে সম্ভাব্য নতুন বিধিনিষেধের খবরে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের পরিবারের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে মোতায়েন সেনাদের ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারের নীতিমালা বাহিনী ও মিশনভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোথাও নির্দিষ্ট স্থানে ফোন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক, আবার সংবেদনশীল অভিযানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও থাকতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, ফিটনেস অ্যাপসহ বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে পারে, যা প্রতিপক্ষের গোয়েন্দা তৎপরতায় কাজে লাগতে পারে। গত মে মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, স্মার্টফোন থেকে সংগৃহীত বাণিজ্যিক অবস্থান তথ্য ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের নজরদারি ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ঘটেছে।




