Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

বৈশাখ ৬ ১৪৩১, শনিবার ২০ এপ্রিল ২০২৪

প্রয়াণ দিবেস অতল শ্রদ্ধা: বীরমুক্তিযোদ্ধা মীর রমজান আলী

সাজিদ হাসান

প্রকাশিত: ১৪:৪৭, ৪ মার্চ ২০২৪

প্রিন্ট:

প্রয়াণ দিবেস অতল শ্রদ্ধা: বীরমুক্তিযোদ্ধা মীর রমজান আলী

ছবি: সংগৃহীত

বৃহত্তর ঢাকার অন্তর্গত অধুনা মুন্সিগঞ্জ জেলার  ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর অঞ্চলের শ্রীনগর থানার  বিশ্ব বিখ্যাত কীর্তিমান বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এবং কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের জন্মস্থান খ্যাত রাঢ়িখাল ইউনিয়নভুক্ত পাশের দামলা গ্রামে ১৯৪৮ সালের ৫ আগষ্ট পবিত্র রমজান মাসে বাবা মীর আহসান আলী  ও মা আয়জুন্নেসা খাতুনের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন মীর রমজান আলী।

মুন্সিগঞ্জের দামলা গ্রামের অভিজাত, ঐতিহ্যবাহী  ‘মীর বাড়ি’র ধারা অনুযায়ী নামের প্রথমাংশে 'মীর'  আর সিয়াম সাধনার মাসের রীতি মেনে 'রমজান' এবং  পিতৃনামের শেষাংশ অনুসরণে ‘আলী’ যুক্ত করে মা-বাবা আদর করে তৃতীয় পুত্রের নাম রেখেছিলেন  ‘মীর রমাজান আলী’। পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা মৃত্যুর পরও নিজ অবদান ও কৃতকর্মের মধ্যদিয়ে অমর হয়ে থাকেন। তেমনি একজন ক্ষণজন্মা সমাজ হিতৈষী মীর রমজান আলী। তিনি ছিলেন একাত্তরে রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। 

তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী , সংস্কৃতি,সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গণে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। দেশ ও জাতির মহত্তর কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেছেন সবসময়। সদালাপী ও মৃদুভাষী মীর রমজান আলীর মেধা, দুরদৃষ্টি-গভীর প্রজ্ঞা, সাহস-দেশপ্রেম, ত্যাগ-সার্বজনীনতা ও যোগ্যতা করেছে বরণীয়-স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। রমজান আলী ঢাকার অধুনালুপ্ত, স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘পোগোজ স্কুল’ থেকে মেট্রিকুলেশন, চট্টগ্রামের রাজনীতির বাতিঘর ‘চট্টগ্রাম সিটি কলেজ’ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং নারায়নগঞ্জের ‘তোলারাম কলেজ’ থেকে বি.এ পাস করেন। 

১৯৭৪ সালের ২৮ এপ্রিল ২৬ বছর বয়সে তিনি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার যশোলদিয়া জমিদার বাড়ির ডা. গাজী আবুল কাশেম-এর কন্যা ডা. রওশন আরা আক্তার-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কন্যা ফেরদৌস জাহান (রিমা) ও  পুত্র মীর নাজমুল আহসান রবিনকে রেখে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় ১৯৯৫ সালে পরাপারে চলে যান মানবতার সেবক ডা. রওশন আরা আক্তার। তখন থেকেই মীর রমজান আলী ছেলে-মেয়েদের আদর যত্নে লেখাপড়া করিয়ে, সুশিক্ষিত করার ব্রত নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চাচীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে একাকীত্ব জীবন যাপন করেছেন। 

চাচার একমাত্র পুত্র মীর নাজমুল আহসান রবিনের সাথে আমার সাক্ষাৎ ১৯৯৭ সালে স্ব-নামধন্য চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে পড়ার সময় থেকে। কলেজ জীবনে রবিনদের সদরঘাটের হলুদ রঙের সেই স্মৃতিময় বাসায় যাওয়া-আসার সময় পিতৃতুল্য চাচার (মীর রমজান আলী) সান্নিধ্যে পাওয়া অনেক কিছুই আমার জন্য শিক্ষণীয় ছিল। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠা দুই ছেলে মেয়েও দক্ষ সংগঠক হয়ে সামাজিক ভাবে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে নিজেদের জড়িত রেখে চাচার শূণ্যস্থান পূরণ করতে সচেষ্ট। 

একজন সাধারণ মানুষ হয়েও নিজের চরিত্র, জীবনদর্শন ও কর্মগুণে এক অনন্য ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন মীর রমজান আলী চাচা। চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন একজন দক্ষ সংগঠক, সমাজ সেবক, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট হিসেবে। তিনি ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্সির ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন অতিবাহিত করলেও অসংখ্য সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বহুল নন্দিত জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখক ছিলেন। 

বাবার প্রতি মমত্ববোধ আর ভালোবাসার স্মৃতিস্বরূপ মীর নাজমুল আহসান রবিনের প্রকাশিত বই ‘মীর রমজান আলীর রচনা সমগ্র’ থেকে চাচার অনেক তথ্য আমি জানতে পেরেছি।  মীর রমজান আলী চাচা ’৭১ এর আগে ও পরে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ হলেও পীর মর্শিদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে মাজারের প্রতি আকর্ষণ ছিল আমৃত্যু। 

মীর রমজান আলীর চাচার জীবন দশায় দুটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি  ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডকে ঘিরে স্মৃতিচারণ বই ‘স্মৃতির দুয়ারে তুমি’ (প্রকাশ কাল ১৯৯১) এবং দ্বিতীয় বই তার প্রয়াত স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘কেমন আছো জানতে ইচ্ছে করে’ (প্রকাশকাল ১৯৯৭) প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও ‘মাইজভান্ডার শরীফ : ঐশ প্রেক্ষিত’ নামে একটি বইয়ের প্রকাশক ছিলেন । 

তিনি ইউনেস্কো ক্লাবস ও লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি হিসেবে জার্মানি, থাইল্যান্ড, ভারত প্রভৃতি দেশ সফর করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার নির্ভীক সৈনিক  হিসেবে ছিলেন মীর রমজান আলী।  ২০১২ সালে ৪ মার্চ পিতৃতুল্য এই মহৎপ্রাণ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন ও আদর্শ আমাদের সমাজসেবায় প্রাণিত করে। প্রয়াণ দিবসে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অতল শ্রদ্ধা। 

সাজিদ হাসান: সমাজকর্মী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer