Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

ভাদ্র ২৮ ১৪৩৩, রোববার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

বহুমাত্রিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২৬, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রিন্ট:

তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

ফাইল ছবি

শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে তাদের ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় উদ্যোক্তা শনাক্ত, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে।

ব্যবসার ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে যারা উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে অর্থায়ন করা হবে। কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়া যাবে।

এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। তবে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ হবে ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনা যাচাই করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অনেক তরুণের ব্যবসার আগ্রহ ও ধারণা থাকলেও ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় জামানত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি। আবার উপজেলা পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসা থাকলেও সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসে না।

নতুন কর্মসূচিতে এসব বাধা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।এই কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা তরুণেরা আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ অথবা বাস্তবসম্মত ব্যবসার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।উপজেলায় ব্যাংকগুলোর নতুন ভূমিকা

উদ্যোগ কর্মসূচিতে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব তফসিলি ব্যাংকের শাখাকে স্থানীয়ভাবে প্রচার চালিয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও ব্যাংকগুলো যুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় একটি তফসিলি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেবে। জেলা পর্যায়ের আবেদন ও কার্যক্রমও এই লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করার সুযোগ থাকবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকে হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ছবি, নির্ধারিত আবেদন ফরম এবং স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র দিতে হবে।

তরুণদের ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো জামানত। নতুন কর্মসূচিতে এই বাধা কমাতে সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ জামানত দেওয়ার মতো সক্ষমতা না থাকলেও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলে তরুণেরা অর্থায়নের সুযোগ পাবেন।

তবে জামানত না থাকলেও ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি শিথিল নয়। উদ্যোক্তা নির্বাচন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।

কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা জানাতে হবে। এর ফলে উদ্যোক্তা বাছাই ও ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

কর্মসূচিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ। শুধু টাকা দিলেই নতুন ব্যবসা টেকসই হবে না—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আর্থিক সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরের পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নতুন উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ তৈরি করার উদ্যোগ থাকবে। অর্থাৎ ব্যবসা শুরু করার জন্য অর্থের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বাজার পাওয়ার বিষয়টিকেও কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে।

উদ্যোগ কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট কোনো একটি খাতকে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এর আওতায় আসতে পারে।

ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো নতুন খাতেও তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সম্পদ ও চাহিদার ভিত্তিতে ব্যবসা তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগও থাকছে।

উদ্যোক্তা নির্বাচনে শুধু বয়স বা আবেদন করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না। ব্যবসার ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, পণ্য বা সেবার বাজার কতটা সম্ভাবনাময়, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বদলে ব্যবসার সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তার সক্ষমতার ভিত্তিতে বাছাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

উদ্যোক্তার হাতে অর্থ দেওয়ার পরও ব্যাংককে ব্যবসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান তৈরির অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত নজরদারির আওতায় থাকবে।

বিশেষ করে অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বা অনুদানের অর্থ অনুমোদিত কাজে ব্যবহার না করলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে পরিণত হবে। ফলে অনুদান পাওয়ার পর অর্থ অন্য কাজে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল পরিবর্তন হলো, উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসা নিবন্ধন ও বাজারসংযোগের ব্যবস্থা থাকায় কর্মসূচিটি শুধু ঋণ বিতরণের প্রকল্প না হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা তৈরির একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে প্রকৃত উদ্যোক্তা বাছাই, অর্থ ছাড়ে গতি এবং অর্থের ব্যবহার তদারকিই শেষ পর্যন্ত কর্মসূচিটির সফলতা নির্ধারণ করবে।

Walton
Walton