Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৪ ভাদ্র ১৪২৬, সোমবার ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১০:৫৬ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

থেলাসেমিয়া আক্রান্ত ছেলেদের চিকিৎসায় ঘরের খুঁটি ও ঘটিবাটি বিক্রি


১৩ মে ২০১৯ সোমবার, ১১:২১  এএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


থেলাসেমিয়া আক্রান্ত ছেলেদের চিকিৎসায় ঘরের খুঁটি ও ঘটিবাটি বিক্রি

ঢাকা : কুড়িগ্রামে ঘটা করে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা হলেও এর চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত জেলার সাধারণ মানুষ। থ্যালাসেমিয়া রোগ সংক্রান্ত কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে।

অথচ নাগেশ্বরীর মাদারগঞ্জ কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিত্যক্ত জমিতে আশ্রয় নেয়া ভূমিহীন কার্তিক চন্দ্র দাসের পরিবারের দুই ছেলেই থেলাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। দুই ছেলের চিকিৎসায় এই দরিদ্র পিতা ঘরের খুঁটি-ঘটিবাটি বিক্রি করে এখন ক্লিনিকের পরিত্যক্ত জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

নাগেশ্বরীতে হরিজন সম্প্রদায়ের কার্তিক চন্দ্র দাসের দুই ছেলে সাগর ও শাওন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত। চার বছর ধরে চিকিৎসার পেছনে শখের তবলা-হারমোনিয়াম, স্ত্রীর গলার চেন, দুল এমনকি হাড়ি-পাতিল ও ঘরের খুঁটি এমন হাড়িপাতিল বিক্রি করে এখন তিনি প্রায় নিঃস্ব। তার এই নিঃস্ব অবস্থা কাটাতে ও ছেলেদের চিকিৎসায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং বিত্তবানদের দ্বারে-দ্বারে ঘুরেও মেলেনি সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা। এমনকি থেলাসেমিয়া আক্রান্ত এই দুই ভাইয়ের তথ্যও নেই জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. এস এম আমিনুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্য বিভাগে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্তদের তালিকা করা হয়নি। তবে সারথী নামে একটি সংগঠন তালিকার কাজ করছে। তবে পরিবারটিকে তালিকাভুক্ত করা না হলে সেটি আমরা দেখবো। আমরা বিষয়টি তালিকাভুক্ত করে নিবো।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, মরণব্যাধি থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত একটি রোগ। এর স্থায়ী চিকিৎসা হচ্ছে ‘বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন’ ও ‘জিন থেরাপি।’ তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

দুই ছেলের এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো নদী ভাঙনের শিকার কার্তিক চন্দ্র দাসের কাছে আকাশ ছোয়ার ছেয়েও বেশি দুর্লভ।

কার্তিক চন্দ্র দাস জানান, একই উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ এলাকায় তাদের মূলবাড়ি ২০১১ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বিলিন হয়ে যায়। এরপর তারা মাদারগঞ্জ কমিউনিটি ক্লিনিকের এক কোনে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পরিবারপরিজন নিয়ে ঝুপড়ি ঘরে ঠাসাঠাসি করে ঠাঁই নেন। মাদারগঞ্জ বাজারে রাস্তার পাশে একটি ঘর তুলে সেখানে মোবাইল সার্ভিসিং এর ব্যবসা শুরু করেন কার্তিক।

পাশাপাশি সঙ্গীত পাগল এই মানুষটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে গানের টিউশনি করাতেন। এভাবে টানাটানির সংসারে আলো করে আসে দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

২০১৬ সালে অসুস্থ বড় ছেলে সাগর চন্দ্র দাসকে (১৫) কুড়িগ্রামে ডাক্তার দেখালে তারা রংপুরে ডা. কামরুজ্জামানের কাছে রেফার্ড করেন। সেখানে বড় ছেলে সাগর ও ছোট ছেলে শাওনের থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত হয়। পরে মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো ডিপিএস’র ২২ হাজার টাকা ভেঙে চিকিৎসা শুরু করানো হয়। এর মধ্যে ঘাড়ের উপর বোঝা হয়ে আছে আরডিআরএস ও স্থানীয়ভাবে লাভের উপর ঋণের ৪০ হাজার টাকা।

হতাশ কার্তিক চন্দ্র দাস ছলছল চোখে বলেন, ১৫ দিন পর পর দুই ছেলেকে দুই ব্যাগ করে রক্ত দিতে হয়। মাদারগঞ্জ থেকে নাগেশ্বরী নিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সহযোগিতায় রক্তদান করে আসছেন তিনি। এছাড়াও প্রতি মাসে রংপুর যাতায়াত ও খরচের জন্য দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন। স্ত্রীর গলার চেন, কানের দুল, মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো ডিপিএস ভাঙিয়েছেন।

ভূমিহীন এই নিঃস্ব পরিবারটি সন্তানদের চিকিৎসা ও দু’বেলা খাবার জোটাতে ঘরের খুঁটি ও হাড়ি-পাতিল সবই বিক্রি করে দিয়েছেন। মোবাইল সার্ভিসিং করে দিনে ২-৩শ’ টাকা আয় হয় তাই দিয়ে চলে টানাটানির সংসার।

কার্তিকের স্ত্রী ঝুনি রানী জানান, মেঝো মেয়ে ঝিলিক রানীও (৭) এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, অসুস্থ অবস্থায় ছেলেদের পেট ফোলা থাকতো। পা ও মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা হতো। জ্বর থাকতো সবসময়। চোখ ও প্রসাব হলুদ হতো। এছাড়াও দু থেকে তিনদিন পরপর পায়খানা হতো। বড় ছেলে সাগর মাদারগঞ্জ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র। সে লেখাপড়ার পাশাপাশি মাদারগঞ্জ বাজারে ঝাড়ুদারের কাজ করে।

এই নিঃস্ব পরিবার কেন সহযোগিতা পান না এই বিষয়ে কথা বলতে কচাকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকমল হোসেনের মোবইলে বারবার ফোন করেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ইউ.এন.বি নিউজ 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।