Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৮ আশ্বিন ১৪২৮, শুক্রবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

চিরসবুজ একজন সালমান শাহ্ ও আমাদের চিরক্ষত


০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ মঙ্গলবার, ০১:৫১  এএম

সাজিদ হাসান কামাল

বহুমাত্রিক.কম


চিরসবুজ একজন সালমান শাহ্ ও আমাদের চিরক্ষত

সালমান শাহ্ এমন একটি নাম যার সাথে দেশের অগণিত মানুষের সীমাহীন আবেগ জড়িত। এই নামটিকে ভালোবাসে না এমন মানুষ দেশে খুঁজে পাওয়া সত্যি কঠিন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের নিজ বাসায় রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রহস্যের জট এখনো খুলেনি৷ হত্যা না আত্মহত্যা! বহু কাঙ্খিত এ প্রশ্নের উত্তর আজও মিলেনি।

তবে প্রকাশ্যে আসা অসংখ্য তথ্য আমাদের কাছে যা কিছু স্পষ্ট করছে তা হচ্ছে, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছাড়া কিছুই নয়। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে যে মানুষ প্রেস ক্লাবে রাষ্ট্রের কাছে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিল সে আত্মহত্যা করবে এটা কখনো সম্ভব না।

সালমান বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থে আমাকে রক্ষা করুন।’ আফসোস আমরা তাকে রক্ষা করতে পারিনি। উল্টো তারই মৃত্যুর দায় ‘আত্মহত্যা’ অপবাদ দিয়ে তার উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হলো। জানি না নিজ খুনের দায় থেকে কবে মুক্ত হবেন এই মানুষটি। অধিক জনপ্রিয়তাই তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

আশাকরি, একদিন মূলরহস্য বের হয়ে আসবে। তাকে স্টাইলের জনক, ফ্যাশন আইকন, ঢালিউডের যুবরাজ, অমর নায়ক আরও অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও ছিলেন একেবারে নিরহংকারী একজন মানুষ। বিএফডিসির পাশে কারওয়ান বাজার বস্তির ২২টি পরিবারের ভরনপোষণ করতেন। উপার্জিত টাকার একটা ব্যাপক অংশ সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করতেন।

বিএফডিসির দারোয়ান জানিয়েছিলেন, ‘সালমান শাহ্ আমাকে ঈদের দিন ১০০০ টাকা সালামি দিতেন। যা আজকের দিনের নায়কেরাও দেন না। আমি তার সাথে দেখা করার জন্যে ঈদের দিনে সকাল সকাল বিএফডিসিতে চলে আসতাম। তিনি নামাজ পড়ে এসে আমাদের সবাইকে সালামি দিতেন।’

ভাবা যায় আরও ২৫ বছর আগে ১০০০ টাকা সালামি। কতটা মনুষ্যত্ববান ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ তিনি ছিলেন তা তার এই কর্মযজ্ঞেই বোঝা যায়। পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র মানুষ যার মৃত্যুর সংবাদে ৪১টি তরুণ-তরুণী জীবন বিসর্জ্জন দিয়ে তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। পৃথিবীতে আর কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি।

ব্রুস লি ও মাইকেল জ্যাকসনের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের মৃত্যু নিয়েও রয়েছে জনমনে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু, সারাবিশ্বে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা তাদের অগণিত ভক্তদের পক্ষেও এমনটা দেখা যায়নি। যদিও এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যু আমাদের কারোরই কাম্য নয়। কিন্তু কতটুকু ভালোবাসা থাকলে মানুষ মানুষের জন্য তার জীবনটা পর্যন্ত দিয়ে দেয়। তার গভীরতা উপলব্ধি করা খুব কঠিন।

আজ গর্বিতস্বরে বলা যায়, আমাদের একজন সালমান শাহ্ ছিল। আর আফসোস করে বলতে হয়- আমরা তাকে রক্ষা করতে পারলাম না। সালমান শাহ্ পৃথিবীতে একমাত্র নায়ক ছিলেন যে কখনো শ্যুটিংয়ে মেকআপ নেননি। সবসময় একটি ভেজা রুমাল সাথে রাখতেন। শট দেবার আগে সে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে নিতেন। নায়কের পাশাপাশি তিনি একজন গায়কও ছিলেন।

তার গাওয়া ‘ও তুমি আমার জীবনে এক স্বপ্ন যেনো’ এবং ‘রজনীগন্ধা তুমি যে আমার’ গানগুলো এখনো মানুষের মুখেমুখে সমান জনপ্রিয়। মাত্র ৩ বছর ৫ মাস ১২ দিনের ক্যারিয়ারে তিনি যা করে গিয়েছেন তা এখনো মানুষ ভুলতে পারেনি, কখনো মানুষ ভুলতে পারবেনা। পৃথিবীর রীতিনীতি অনুযায়ী মানুষ মারা যাওয়ার পরে আস্তে আস্তে সবাই তাকে ভুলে যায়। কিন্তু, সালমান শাহ্`র ব্যাপারে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। যতই দিন যাচ্ছে ততই তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মৃত্যুর দুই যুগ পরেও তিনি সারাদেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আছেন। শুধু দুই যুগ নয় এই দেশে তিনি সব যুগেই চিরসবুজ হয়ে জ্বলে থাকবেন। সকল যুগের সকল যুবকদের আইকন হয়েই তিনি সকলের মাঝে বিরাজ করবেন। হয়তো চক্রান্তকারীরা তাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু মানুষের অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

বুক ফুলিয়ে বলা যায় আমাদের একজন সালমান শাহ্ ছিল। যাকে বলিউডের কিংখান খ্যাত শাহরুখ খান ১৯৯৫ সালে বলেছিলেন, ‘আপনি বলিউডে চলে আসুন, আপনার মতো দক্ষ অভিনেতার জন্য এটাই উপযুক্ত জায়গা।’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দেশের চলচ্চিত্র একদিন বলিউডের সমকক্ষ হবে। আমি সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের একজন অভিনেতা হয়েই কাজ করতে চাই।’

কি নিখুঁত দেশপ্রেম! অথচ, এখনকার অভিনেতারা সামান্য সুযোগ পেলেই নিজ দেশের চলচ্চিত্রের কথা বিবেচনা না করে বিদেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে আরও বেশি যোগ্য প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে উঠে। কিন্তু, সালমান শাহ্ ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মাথায় কাপড় বাঁধা, হাটুতে রুমাল বাঁধা, ছেঁড়া জিন্সপ্যান্ট পড়া, কানে দুল পড়া, আরও অনেককিছু তিনি করে গিয়েছিলেন যা আজও মানুষ ধারণ করে চলে। তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।

একবার সিঙ্গাপুর থেকে একটা প্যান্ট নিয়ে এসে বাসায় বসে কাটছেন জননী নীলা চৌধুরী বলছেন,  ‘নতুন প্যান্টটি এভাবে কাটছিস কেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘একটা নতুন স্টাইল করছি, দেখো মা এই স্টাইল একসময় অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।’ বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না ঝরে, গানে প্যান্টের সেই স্টাইল পরবর্তীতে বলিউডের সালমান খান ‘ও ও জানে জা না’ গানে নকল করেছিলেন।

এমন একজন মানুষকে হারানোর অপূরণীয় ক্ষতি কোনদিন পূরণ হবার নয়। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কাজের মাধ্যমে আমাদের অন্তরে সবসময়। প্রার্থনা করি, অনন্তলোকে তিনি ভালো থাকুন। 

লেখক: সালমান শাহ্ অনুরাগী ও সমাজকর্মী। 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।