Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৮ শ্রাবণ ১৪২৭, বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০, ৪:০৭ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

‘আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে’


৩০ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১২:৪৭  এএম

মাকামে মাহমুদ চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


‘আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে’

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,
আউশের খেত জলে ভরভর,
কালী-মাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্‌ চাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।। (আষাঢ়-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

মানব সৃষ্ট নয় এমন সব দুর্ঘটনা যা মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী সংঘটিত হয় ভয়াবহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে ,সাধারণত উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভৌগোলিক অবস্থান, ভূপ্রাকৃতিক কাঠামো এবং প্রযুক্তি স্বল্পতার কারনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যাপক পরিমানে সংঘটিত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় প্রতি বছর এখানে ভয়ঙ্কর সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হওয়ার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছু করার থাকে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ জনজীবনকে তছনছ করে দিচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে ব্যাপক ভয়াবহতা নিয়ে হাজির হয়েছে বজ্রপাত বা বাজ যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করলে ভুল হবে না। প্রতিবছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে কাল বৈশাখী ঝড়ের সাথে ব্যাপক আকারে বর্জ্রপাত বা বাজ জনজীবনকে করে তুলে বিপন্ন। আগের ধারণা অনুযায়ী ইংরেজি মাস অনুসারে এপ্রিল, মে এবং জুন মাস পর্যন্ত বজ্রপাতের স্থায়িত্ব বা পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা থাকলেও ২০২০ সালে জুলাই মাস অবধি এসেও বজ্রপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ার কোন উপসর্গ খুঁজে পাওয়া যায় না।

বজ্রপাত বা বাজ দ্বারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় যা থেকে রেহাই পেতে সতর্কতা অবলম্বন করার কোনো বিকল্প নেই। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই প্রতিদিন চোখে পড়ে বজ্রপাতের দ্বারা হতাহতের খবর। পরিসংখ্যানে গত বছর বজ্রপাতে দেশে ২৪৬ জনের প্রাণহানী ঘটে এবং এ বছরের ৪ জুন, একই দিনে বজ্রপাতে ২৫ জন মানুষ মারা যায়। বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে, প্রতি সপ্তাহে-সপ্তাহে বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, বজ্রপাতে ৩০৮৬ জনেরও বেশি লোক প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে ১২২৫ জন প্রাণ হারিয়েছে খোলা মাঠ বা জমিতে কাজ করার সময়।

চলতি বছরের শেষ ছয় মাসে বজ্রপাতে আড়াই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। বজ্রপাতের ফলে প্রতি বছর গড়ে ১১৪ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘন ঘন বজ্রপাত হওয়ার মূল কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বজ্রপাতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বজ্রপাত দশগুণ বৃদ্ধি পায়। প্রতিবছর মার্চ থেকে জুন অবধি বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি হলেও তাপমাত্রার ধারাবাহিক বৃদ্ধি পুরো বর্ষা মৌসুমকে প্রভাবিত করছে।

বজ্রপাত সম্পর্কে অনেকেরই বৈজ্ঞানিক ধারণা নেই। অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক চার্জ যখন আকাশের মেঘে সঞ্চিত হয় এবং উচ্চ শব্দের সাথে মাটিতে পড়ে বিপরীত চার্জের সাথে মিলিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখনই মূলত বজ্রপাত সংঘটিত হয়। বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্যহীনতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে, বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয় এবং জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে আসে, যা আয়ন কণায় পরিণত হয়ে বজ্রপাতের হার বাড়ায়। অনুমান করা হয় যে বজ্রপাতে মারা যাওয়ার সংখ্যা শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি। এর মূল কারণ গ্রামের লোকদের বজ্রপাত সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অসচেতনতা। কখন, কীভাবে এবং কেন বজ্রপাত হয় তা নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নেই। তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে উদাসীন। চারদিকে অন্ধকার আকাশে কালো মেঘ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও কৃষক এবং জেলেদের কৃষি সরঞ্জাম বা মাছ ধরার জাল নিয়ে মাঠে বা নদীতে ছুটতে দেখা যায়। বজ্রপাতকে তারা ভয় পায় না যা বজ্রপাতের দ্বারা প্রাণহানীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করছে।

এটি চিরন্তন সত্য মানুষের প্রাকৃতিক ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় নেই কিন্তু কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে ভয়াবহ এ দুর্যোগ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া সম্ভব বলে মনে করা যায়। বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রথম পদক্ষেপ হল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ করা। বায়ু এবং পরিবেশ দূষণ রোধে নিয়মিত গাছ লাগানো। বিশেষ উদ্দেশ্যে গাছ কাটা হলে প্রতিটি গাছের বিপরীতে কমপক্ষে পাঁচটি করে চারা রোপন করার মানসিকতা রাখা। তবেই পরবর্তী প্রজন্মে বজ্রপাতের দ্বারা প্রাণহানীর সংখ্যা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। কৃষি প্রধান এদেশের গ্রামে কৃষকেরা ফসলের পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বজ্রপাতের সময়ও বাইরে কাজ করে এবং এ কারনে তারাই বেশি বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের শিকার হয়।

আকস্মাৎ ঝড়বৃষ্টি এবং এরকম আবহাওয়া চলাকালীন খোলা জায়গায় কাজ করার সময় কৃষকদের আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গার পরিবর্তে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। মোবাইল ফোন দূরে রাখতে হবে। বাসা বাড়িতে অবস্থানকালীন সময় টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এসি সহ সমস্ত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বজ্রপাতের সময় অনেকে গাছের নীচে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেকে জানে না যে এ জায়গাটি তাদের জন্য নিরাপদ নয়। বজ্রপাতের সময় গাছের নীচে আশ্রয় নেয়া যাবে না।

বাড়ির বারান্দায় ব্যবহৃত ধাতব গ্রিলটি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রান্নাঘর বা টয়লেটের জলের ট্যাপগুলোর লাইনে ধাতব পাইপ ব্যবহৃত হলে সেগুলো দেয়ালের ভিতর দিয়ে করতে হবে। বাজ পড়ার সময় বাচ্চাদের কান দুহাত দিয়ে বন্ধ রাখতে বলা ভাল কারণ এটি বাচ্চাদের শ্রবণ সমস্যা থেকে রক্ষা করবে এবং মানসিক চাপ এবং ভয়কে দূর করবে। বাইরে যাওয়ার আগে কৃষক, জেলে এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের আবহাওয়া অধিদফতর ঘোষিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।

গ্রামে বা শহরে, বাড়ির পিছনে, রাস্তার দুপাশে, পুকুরের কিনারে বা খোলা জায়গায় সুপারি, নারকেল, খেজুর বা পাম জাতীয় গাছ লাগানো যেতে পারে; কারণ আবহাওয়াবিদদের মতে, এ লম্বা গাছগুলো বাজ থেকে রক্ষা করে। বছর দুয়েক আগে, সরকার সারা দেশে এক মিলিয়ন খেজুর গাছ লাগিয়েছিল যা সত্যিই প্রশংসনীয়। পাম্প, তাল এবং অন্যান্য দীর্ঘ গাছ যা গ্রামে বেশি পরিমানে ছিল বিদ্যুৎ শোষণে ব্যবহৃত হত, কিন্তু এখন এসব গাছ কমে যাওয়ায় বর্জ্রপাতের দ্বারা মানুষের মৃত্যুর হারও বেড়ে চলেছে। বজ্রপাতের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সরকারী দফতর থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপণা বিভাগের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

এছাড়াও বজ্রপাত কমানোর জন্য বিভিন্ন সেন্সর স্থাপনের কাজ চলছে, যা অচিরেই বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মতে গ্রামাঞ্চলে তাল, পাম এবং বৃহদাকৃতি গাছ গুলোর হ্রাস পাওয়ায় বজ্রপাতের মাত্রা বর্তমানে অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবছর বৃক্ষ রোপনের মৌসুমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃক্ষ রোপণ করা হচ্ছে যা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে।

পরিবেশের সুরক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণ দরকার যা দ্বারা আমরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদে থাকতে পারি। বজ্রপাতের বিষয়টিও সবার গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। নানা বিপর্যয়ের মাঝেও মানুষ বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষকে করে তোলে সংগ্রামী।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।