Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ


২৬ মার্চ ২০১৪ বুধবার, ০৮:১১  এএম

তারাপদ আচার্য্য

বহুমাত্রিক.কম


হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ

ঢাকা: মেয়েটির বয়স নয়। তার এই বয়সে বিয়ে হলো ৬২ বছরের এক বৃদ্ধর সঙ্গে। বৃদ্ধের হার্টের প্রব্লেম। ক’মাস যেতে না যেতে হঠাৎ করে মারা গেলেন তিনি। চিতা সাজানো হলো। চিতার সাথে জীবিত নয় বছরের মেয়েটিকেও চিতায় দগ্ধ করার আয়োজন চলছে।

মেয়েটিকে সতী-সাদ্ধী প্রতীয়মান করার জন্য বাকি অন্যদের এই ধর্মীয় অনুশাসন মান্য করা। মেয়েটি সেই ধর্মীয় অনুশাসন মানতে নারাজ। তার বাঁচার প্রবল ইচ্ছে। কান্নাকাটি করছে সে। কিন্তু প্রতিবেশী তাকে বুঝাচ্ছে, স্বামী হচ্ছে দেবতা, তার সাথে মরার সৌভাগ্য ক’জনের হয়। চিতায় স্বামীর সাথে সহমরণ না হলে সে নির্ঘাত নরকবাসী হবে। মেয়েটি নরকবাসী হতে রাজী। সে কিছুতেই সহমরণে যাবে না। শেষ পর্যন্ত, মেয়েটির কোন কথা না শুনে তার হাজারো বাঁধা উপেক্ষা  করে প্রতিবেশী ধর্ম রক্ষার্থে মেয়েটিকে সহমরণে বাধ্য করল।

সুধী পাঠক, এটা ছিল আমাদের সতীদাহ প্রথা। একবার আপনারা ভেবে দেখুনতো  কী নির্মম এই প্রথা!
সময় এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের সাথে পা রেখে এগিয়ে যাচ্ছে সভ্য মানুষ। চাঁদের বুকে পা রাখছে, মঙ্গলে চলছে প্রাণের  অস্তিত্ত্ব খোঁজার চেষ্টা। রোবটে করছে মানুষের অসাধ্য কাজ। এই সময়ের সাথে তাল মেলাতে অনেক আগেই সতীদাহ প্রথা লোপ পেয়েছে,  বিধবা বিবাহ চালু হয়েছে।

সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে হিন্দু আইনের অনেক ধারা। সমাজ সংস্কারক হিসেবে আমরা যাঁদেরকে পাই তাঁরা হলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ।
সুধী পাঠক, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য। ধর্মীয় আইন যদি মানবতার পরিপন্থী হয় তা অবশ্যই বর্জনীয়। এ প্রসঙ্গে আমি হিন্দু বিবাহের কথা বলবÑ তার আগে আমার বাস্তব অভিজ্ঞার ছোট্ট একটি ঘটনা যা না বললেই নয়।

আমার জেটতুতো বোন। তাকে আমি নিজে থেকে বিয়ে ঠিক করি। ছেলে দেখতে সুন্দর, টাকা-পয়সা আছে অনেক, জমিজমাও কম নেই। বিয়েও হয়ে যায় মহা ধুমধামের সাথে। বিয়েতে যৌতুকও দিতে হয় অনেক। অবশ্য হিন্দু বিবাহে বাবার সম্পত্তি মেয়ে পায় না বলে এই যৌতুকের মাত্রাটাও অনেক বেশি। যৌতুক ও সম্পত্তি বিষয়ে আলোচনার ইচ্ছে থাকলেও ইচ্ছেটাকে দমন করতে হচ্ছে। তো যা-ই হোক বিয়ের কদিন পর

আমি আমার এক ছোট বোনের মুখে যা শুনলাম তাতে আমার বিবেক বুদ্ধি যেন থ হয়ে গেল।
বাসর রাত প্রত্যেক নারী-পুরুষের জীবনে এক মধুময় রাত। অনেক স্বপ্ন আর সাধ থাকে এই রাতকে ঘিরে। অথচ এই রাতে আমার জেটতুতো বোনের স্বামী মদ্যপ অবস্থায় বাসর রাত করে। আর একজন মাতাল কিনা করতে পারে তা সাধারণ মানুষের বুঝার বাইরে। সেই যে অশান্তি শুরু হয় বিবাহের রাত থেকে তা আমৃত্যু তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে। কেন এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হয়েছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। কেননা হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ নেই। বিবাহ বিচ্ছেদ থাকলে হয়তো আমার বোনের জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো।

হিন্দু বিবাহ। বাংলাদেশে সনাতন ধর্ম মতে বিবাহ। বিবাহ অর্থ (হিন্দু আইনে) পুরুষ ও নারীর মধ্যে একটি পবিত্র ধর্মীয় সংস্কার। বিবাহের প্রথম অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হল দুটি বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে বন্ধন, সংযোগ বা নিবীড়ত্ব, অর্থাৎ দুটি আত্মার মিলনাত্মক রূপান্তর-ই বিয়ে।

প্রত্যেক ধর্মের আইনই ধর্ম থেকে সৃষ্টি। হিন্দু আইনের আদি ও মূল উৎস হল বেদ। ১৫০০-১০০০ অব্দের  মধ্যে এই বেদ লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। হিন্দুদের মতে বেদ মানুষের লেখা নয়, ঈশ্বরের বাণী। বিদ শব্দের অর্থ (জ্ঞান) হতেই বেদ কথাটির উৎপত্তি। প্রাচীন ঋষিগণ বেদ ঈশ্বরের কাছ থেকে শ্র“তি সাহিত্য বলে অবিহিত করেছেন। এই জন্য বেদের অপর নাম শ্র“তি।
হিন্দু আইনের উৎস হল তিনটি- শ্রুতি, স্মৃতি এবং প্রথা।

আক্ষরিক অর্থে শ্রুতির অর্থ হল যা শোনা হয়েছিল। শ্রুতি দেবতাদের মুখের বাণী। একে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে, ঋগ, যযু, সাম এবং অর্থব। স্মৃতির অর্থ হলো, যা মনে রাখা হয়েছিল। এটি প্রাচীনকালে ঋষি বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা ঐশ্বরিক নির্দেশাবলী থেকে পেয়েছিলেন। আর প্রথা হচ্ছেÑ এমন একটি নিয়ম যা একটি বিশেষ পরিবারে অথবা শ্রেণীতে অথবা অঞ্চল বিশেষে বহুকাল প্রচলিত হওয়ার জন্য আইনের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

এ ছাড়া হিন্দু আইনের অন্যান্য শাস্ত্রীয় উৎস হল ধর্মসূত্র। যাঁরা এই সব ধর্মসূত্র সংকলন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে গৌতম, হরদত্ত, বৌধায়ন, অপন্তন্ব, বশিষ্ট, বিষ্ণু, হরিত, বৃহষ্পতি ও কাত্যায়ণ।
বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে আমার উপরোক্ত বিষয়ের অবতারণা।

এবার আমি আলোচনা করব হিন্দু পরিবারের বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে। সাধারণত হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ এর প্রচলন নেই। এর কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক অতএব বিবাহের কোন পক্ষ অপরের সাথে বিচেছদ ঘটাতে পারে না যদি তা প্রথাগতভাবে সিদ্ধ হয়। এমনকি স্ত্রী যদি পতিতাও হয়, তারপরও না। অপরদিকে স্বামী যদি দুঃশ্চরিত্রও হয় তাহলেও সতী-লক্ষ্মী নারীর সেই দুঃশ্চরিত্র স্বামীকে নিয়ে ঘর করতে হবে। অবশ্য নিুবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ -এর কিছু হদিস পাওয়া যায়। নারদ এবং কৌটিল্যের গ্রন্থসমূহে হিন্দু সামাজিক প্রথার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পূণবিবাহের উল্লেখ আছে। নারদের মতে, স্বামীর অবর্তমানে মৃত্যু বা যৌন অক্ষমতার জন্য হিন্দু মহিলাদের ভেতর দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের রেওয়াজ ছিল। অবশ্য মনু এটা মোটেই স্বীকার করেননি। স্মৃতির যুগে দেখা যায় কোন কোন শাস্ত্রকার বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের বিবাহ বিচ্ছেদ -এর  বিধান দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে নারদ এবং পরাশরের বিখ্যাত শ্লোকটি উলে¬খযোগ্য- নষ্ট মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ পঞ্চেষাপৎসু নারী নাং পতিরণ্যঃ বিধীয়তেঃ।     

বৃটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত আইনে বলা হয়েছে যে, কোন হিন্দু যদি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে এবং সে কারণে তার স্বামী কিংবা স্ত্রী যদি পরিত্যক্ত বা প্রত্যাখ্যাত হয় তবে ধর্মান্তরিত ব্যক্তির আবেদন ক্রমে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করা যেতে পারে এবং পূনবিবাহ করতে পারে। তবে এই আইনটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।

১৯৫৫ সালে প্রবর্তিত ভারতীয় হিন্দু বিবাহ আইনে বলা হয়েছে যে, কেউ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করলে আদালত তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারে। ১৯৭৬ সালে ভারতীয় বিবাহ আইন সংশোধনীর পূর্বে ও একই নিয়ম বহাল ছিল।

ভারতে আইনগত পৃথক অবস্থান ও আছে। এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা বিবাহকে ভঙ্গ করে না বরং সাময়িকভাবে স্বামী-স্ত্রীর পৃথক অবস্থান বুঝায়। আদালত থেকে এ ধরণের ডিগ্রি পাওয়ার পর পারস্পারিক দৈহিক মিলনে বাধ্য নয়। তবে পৃথক অবস্থানের  ডিগ্রি পাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী কেউ কোন তৃতীয় ব্যাক্তির সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। কারণ এরূপ দৈহিক সম্পর্ক ব্যাভিচার হিসাবে গণ্য হবে।

বাংলাদেশে এমন বিধান থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে কেউ কেউ মনে করেন থাকেন। বিচারপতি দেবেশচন্দ্র ভট্রাচার্য বলেন, আমাদের হিন্দুশাস্ত্রে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ সম্পর্ক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, পবিত্র বন্ধন এবং সামাজিক কল্যাণের জন্য এই বন্ধনকে অক্ষুন্ন রাখার সার্বিক প্রয়াস আমাদের সকলের দায়িত্ব। কিন্তু নৈতিকতার এই মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আইনের বাধ্যতামূলক বিধানের সামঞ্জস্য স্থাপন করা ও আমাদের সামাজিক কর্তব্য। কোন কোন ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর চরিত্র আচরণ এমন হতে পারে যে, তাদের পক্ষে এক পরিবারে দম্পতি হিসাবে বাস করা ব্যাক্তিগত, পরিবারগত এবং সমাজগত কারণে অত্যন্ত অকল্যাণকর এবং সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যবস্থা হিসাবে স্বামী-স্ত্রীর পৃথক বসবাসের এবং কোন কোন চরম অবস্থায় বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণ অবসানের অধিকার একটি সামাজিক প্রয়োজন বলে মনে হয়।

বিচারপতি দেবেশ বাবুর সাথে আমিও একমত পোষণ করি। আমাদের দেশে হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন মাতাল দুঃশ্চরিত্র স্বামীর অত্যাচার সয়ে অনেক হিন্দু মেয়েরা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘর করে যাচ্ছে। আবার এমনকি যন্ত্রণায় আত্মহত্যার দৃষ্টান্তও বিরল নয় আমাদের সমাজে। পক্ষান্তরে, স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ক কিংবা স্বামী, সন্তান, সংসারের প্রতি উদাসীনতাকে ও মুখ বুজে সহ্য করতে হয় অনেক স্বামীকে। আমার প্রশ্ন- ভারতে যদি বিবাহ বিচ্ছেদ আইন থাকতে পারে তাহলে আমাদের দেশের জন্য তা কেন প্রযোজ্য নয়? একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কেন আমরা মান্ধাতা আমলের আইন সংস্কার করতে পারি না? মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আজ আমাদের দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ অত্যন্ত জরুরি। সভ্য সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আজ হিন্দু পরিবারে বিবাহ বিচ্ছেদ অত্যাবশকীয় বলে মনে করি।

সমস্যা আমাদের, সমাধান আমাদেরই করতে হবে। আমাদেরকেই বলতে হবে আমাদের প্রয়োজনের কথা। তাই উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে চাই হিন্দু আইন সংস্কার আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন মানুষের কল্যাণের জন্য, অকল্যাণের জন্য নয়।
লেখক: কলামিষ্ট ও সিনিয়র আইনজীবী

বাংলাদেশ সময়: ০১০১ ঘণ্টা, মার্চ ২৬, ২০১৪

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

আইন -এর সর্বশেষ

Hairtrade