Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
৪ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮, ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

কালীপূজা ও দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু


২০ অক্টোবর ২০১৭ শুক্রবার, ০৫:৫৫  পিএম

উৎপল আইচ

বহুমাত্রিক.কম


কালীপূজা ও দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু

সারা ভারতে আজ যখন দীপাবলি উৎসব, আমাদের অর্থাৎ হিন্দু বাঙ্গালীদের আজ কালী পূজাও। স্বাধীনতা যুদ্ধের সমস্ত বিপ্লবীদের মত নেতাজী সুভাষচন্দ্রও ছিলেন শক্তি-উপাসক। সুভাষচন্দ্রের পুণ্যশীলা এবং ধর্মপ্রাণা মাতৃদেবী প্রভাবতী বসুর প্রভাবে রামকৃষ্ণদেবের প্রতি তিনি ছেলেবেলাতেই আকৃষ্ট হন। আর তার সাথেসাথে মা-কালী হলেন তাঁর আরাধ্য দেবী। স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণের আদর্শে অনুপ্রাণিত নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু সেই ছেলেবেলা থেকেই।

১৯১৪ সনের অক্টোবরের ৩ তারিখে প্রিয় বন্ধু হেমন্ত সরকারকে লেখা একটা চিঠিতে সুভাষচন্দ্র ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবি এঁকেছেন এভাবে :- “মনে পড়ে একটি চিত্র – কালীমন্দির দক্ষিণেশ্বরে। সন্মুখে খড়্গহস্তা মা-কালী – আনন্দময়ী – শিবের আসনের উপর অধিষ্ঠাতা – শতদলবাসিনী – তাঁর সন্মুখে একটি বালক – বালক হইতেও বালপ্রকৃতি – আধ-আধ স্বরে কাঁদিতেছে, এবং কাকে যেন ডেকে-ডেকে বলিতেছে – ‘মা, এই নাও তোমার ভালো, এই নাও তোমার মন্দ। এই নাও তোমার পাপ, এই নাও তোমার পুণ্য।’ করালমুখী ভীষণদ্রংষ্ট্রা মা অল্পেতে সন্তুষ্ট নয় – সব গ্রাস করিতে চায় – তাই ভালোও চাই, মন্দও চাই – পুণ্যও চাই, পাপও চাই, বালককে সবই দিতে হইবে – না দিলে শান্তি নাই – মা ছাড়িবে না। // বড় কষ্ট। মাকে সব দিতে হইবে। মা কিছুতেই সন্তুষ্ট না – তাই কাঁদিতেছে এবং বলিতেছে – ‘এই নাও, এই নাও’। দেখিতে দেখিতে অশ্রুধারা বন্ধ হইল – গণ্ডস্থল ও বক্ষ শুকাইল – হৃদয় জুড়াইল – হৃদয়ে আর কিছু নাই – যেখানে ভীষণ কণ্টক যন্ত্রণা দিতেছিল, তার চিহ্নও নাই – সবই শান্তিময়। হৃদয় মধুতে ভরিয়া গেল। বালক উঠিল। // বালকটি রামকৃষ্ণ।”

এরপর আমরা শুনি সুভাষের অন্য আরেক বন্ধুর স্মৃতিচারণের কথা। বন্ধু দিলীপ কুমার রায় লিখেছেন, “আমরণ ছিল সে শক্তিসাধক – কৈশোরেও গঙ্গাজলে নেমে আবৃত্তি করত স্বামী বিবেকানন্দের Kali the Mother থেকে :-
Who dares misery, loves
And hugs the form of Death,
Dances in Destruction’s dance,
To him the Mother comes.
নির্ভয়ে যে বরি’ যন্ত্রণায়
প্রেমে করে মৃত্যু আলিঙ্গন,
নাচে মহাকাল-নৃত্য সাথে
তারে করে জননী বরণ।

শ্রী সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ সুভাষচন্দ্রের সাথে বার্মার মান্দালয়ে কারারুদ্ধ ছিলেন। তিনি বলেছেন যে সুভাষচন্দ্র মান্দালয়ে রোজ মা-কালীর ধ্যান করতেন।

এবার আমরা আসব কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ী থেকে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান পর্বে। সুভাষচন্দ্র ২রা জুলাই ১৯৪০ সনে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের দাবীতে সত্যাগ্রহ করার অপরাধে এলগিন রোডের বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেলে কারারুদ্ধ করা হয়। রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবার ১০ ডিসেম্বর ১৯২১ সনেও তাঁকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছিল এই প্রেসিডেন্সি জেলেই। ২

৯ নভেম্বর ১৯৪০ – কালীপূজার দিন সকাল থেকে অনশন শুরু করলেন কালীসাধক সুভাষচন্দ্র। জোর করেও তাঁকে কিছু খাওয়ানো গেল না। তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে ৫ ডিসেম্বর ১৯৪০-এ বাংলার রাজ্য সরকার বিনা শর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হ’ল এবং এ্যম্বুলেন্সে তাঁকে এলগিন রোডের বাড়ীতে পৌছে দিল। কিন্তু বাড়ীর বাইরে থাকলো সশস্ত্র প্রহরী আর সাদা পোষাকের অগুন্তি সি-আই-ডি।

এ সময়ে অন্তর্ধানের জন্য খুবই অল্প কয়েকজনার সাহায্য নিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। নিজের মাকেও ঘুণাক্ষরে জানতে দেন নি। কিন্তু একজন তাঁকে সেবা-শুশ্রূষায় এবং সবরকম সাহায্যে মুগ্ধ করেছিল। অন্তর্ধানের ঠিক আগে সেজদার কন্যা স্নেহধন্যা সেই ইলা-কেই সুভাষচন্দ্র পাঠিয়েছিলেন এক জ্যোৎস্না-ভরা সন্ধ্যায় দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে মা ভবতারিণীর কাছে, গোপনে, তাঁর এই ঐতিহাসিক অভিযানের সফলতা কামনা করতে। এর পরের ইতিহাস আমাদের সকলের জানা।

ইলা-দেবীকে সেদিন যিনি গাড়ী চালিয়ে দক্ষিনেশ্বরের কালীমন্দিরে নিয়ে যান এবং পরে সুভাষচন্দ্রকে বারারি হয়ে গোমো স্টেশনে পৌছে দেন, সেই ডাঃ শিশিরকুমার বসু আমাদের জানাচ্ছেন, “১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সিঙ্গাপুর থেকে আমি তাঁর এক গোপন বার্তা পাই। তাঁর নিজের হাতে লেখা বার্তাটির ওপরে লেখা ছিল ‘শ্রীশ্রী কালিপূজা, ২৯শে অক্টোবর ১৯৪৩’। দেশের দশের কাজে আরাধ্য দেবীর কাছে নীরবে ও নিভৃতে আত্মনিবেদনের নিশ্চয়ই খুব গভীর তাৎপর্য আছে।”

আমরা এছাড়া জেনেছি যে আজাদ হিন্দ্ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র সিঙ্গাপুর থাকার সময় প্রায়ই যেতেন সেখানকার রামকৃষ্ণ মিশনে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গভীর রাতে। পোষাক বদলে পরে নিতেন পট্টবস্ত্র এবং এক দুই ঘন্টা বসে ধ্যান করতেন। সেই মিশনের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী ভাস্বরানন্দ বা বুদ্ধ মহারাজ গবেষক-লেখক শ্রী শঙ্করীপ্রসাদ বসুকে বলেছিলেন যে নেতাজী তাঁর কাছে তখনকার বহুল জনপ্রিয় ‘মা-কালীর পায়ের কাছে বসা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের’ ছবিটি চেয়ে নিয়েছিলেন।

কালীপূজা খুব কঠিন। অনেক নিয়ম কানুন। তাই বোধহয় কালী বা মাতৃসাধক সুভাষ চন্দ্র কালীপূজা না করে কালীর আরেক রূপে মা-দুর্গার আরাধনা বা পূজা করেছিলেন কারাগারে।

১৯ অক্টোবর ২০১৭ সনে আরেক শ্রীশ্রী কালীপূজার পুণ্য সন্ধ্যায় তাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্মদাতা, আমাদের দেশনায়ক নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু-কে শতকোটি প্রণাম জানাতে ইচ্ছে হল। জয়তু নেতাজী। লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
ভাগ হয়নি ক' নজরুল
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

ইতিহাস -এর সর্বশেষ

Hairtrade