লেখক
একজন মানুষ অসুস্থ বোধ করলে এখন অনেক সময় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ হয় ইন্টারনেটে খোঁজ করা। রোগের লক্ষণ কী, কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায় কিংবা কোন হাসপাতালের কী ধরনের সেবা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তিনি অনলাইনে খুঁজতে পারেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য খোঁজার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমের গুরুত্ব বাড়ছে। অনলাইন সংবাদ, হাসপাতালের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক পেজ মানুষের সামনে তথ্যের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এই পরিবর্তন ইতিবাচক, কারণ প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া গেলে মানুষ নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—অনলাইনে তথ্য পাওয়া আর সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।
ইন্টারনেটে কোনো রোগের লক্ষণ খুঁজলে অনেক ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসতে পারে। একই লক্ষণ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির অভিজ্ঞতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। ফলে অসম্পূর্ণ তথ্য দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা, অযথা আতঙ্কিত হওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আমার দৃষ্টিতে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু তথ্যের অভাব নয়; বরং কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি প্রাসঙ্গিক এবং কোন পর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—তা বুঝতে পারা। এখানে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হাসপাতালের ওয়েবসাইটে শুধু চিকিৎসকের নাম, বিভাগ ও সেবার তালিকা থাকলেই যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা, চিকিৎসকের যোগ্যতা ও বিশেষজ্ঞতার পরিচয় পরিষ্কার রাখা এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার পদ্ধতি সহজ করে দেওয়াও জরুরি।
একজন মানুষ যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগ সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে তিনি এমন তথ্য চান যা তাঁকে বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে। কোন লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন এবং কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—এসব বিষয় দায়িত্বশীলভাবে ব্যাখ্যা করা গেলে অনলাইন তথ্য মানুষের জন্য আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট তৈরির সময় একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ভয় দেখানো, অতিরঞ্জিত দাবি করা কিংবা চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া দায়িত্বশীল যোগাযোগের অংশ হতে পারে না। স্বাস্থ্যতথ্যের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে সচেতন করা, বিভ্রান্ত করা নয়।
এখানে চিকিৎসকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান যখন সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছায়, তখন জটিল স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় বোঝা সহজ হয়। তবে সহজ করে বলতে গিয়ে তথ্যের যথার্থতা যেন নষ্ট না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠককে জানাতে হবে যে অনলাইন তথ্য সাধারণ ধারণা দিতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্তের জন্য যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
ডিজিটাল মাধ্যমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো চিকিৎসাসেবা খুঁজে পাওয়ার পথ সহজ করা। একজন রোগী হয়তো জানেন না তাঁর সমস্যার জন্য কোন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া প্রয়োজন, অথবা কোনো নির্দিষ্ট সেবা কোথায় পাওয়া যায়। হাসপাতালের ওয়েবসাইট, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সহজ যোগাযোগব্যবস্থা তাঁকে পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
এ কারণে ডিজিটাল কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ একটি পোস্ট দেখেছেন, কতটি ক্লিক এসেছে কিংবা কতজন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছেন—এসব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষ প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছেন কি না, তথ্যটি বুঝতে পেরেছেন কি না এবং সঠিক সেবার সঙ্গে যোগাযোগের পথ খুঁজে পেয়েছেন কি না।
একজন ডিজিটাল, ব্র্যান্ড ও জনসংযোগ পেশাজীবী হিসেবে আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল যোগাযোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করা। হাসপাতালের প্রচারণা মানুষের কাছে সেবা সম্পর্কে ধারণা পৌঁছে দিতে পারে, কিন্তু দায়িত্বশীল স্বাস্থ্য যোগাযোগের কাজ আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে সঠিক তথ্য দেওয়া, ভুল ধারণা কমাতে সাহায্য করা এবং মানুষকে প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার চিকিৎসাসেবা নিতে উৎসাহিত করা।
ভবিষ্যতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা আরও বিস্তৃত হবে। অনলাইন পরামর্শ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্য এবং সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্যের গোপনীয়তা এবং মানুষের ডিজিটাল দক্ষতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা যেন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত, একজন মানুষ অনলাইনে স্বাস্থ্যতথ্য খোঁজেন কোনো পেজের দর্শক হওয়ার জন্য নয়; তিনি নিজের প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। কখনো নিজের জন্য, কখনো পরিবারের কোনো সদস্যের জন্য। তাই স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল উপস্থিতির প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে মানুষকে কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য ও কার্যকর দিকনির্দেশনা দেওয়া যাচ্ছে তার ওপর।
অনলাইনে তথ্যের পরিমাণ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষকে সঠিক তথ্য চিনতে এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু মানুষের কাছে পৌঁছানো নয়—মানুষকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।
লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম




