Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪৩১, রোববার ২৬ মে ২০২৪

উৎসব কথন

সৈয়দ মোকছেদুল আলম

প্রকাশিত: ১১:৫৯, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

আপডেট: ১২:০২, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

প্রিন্ট:

উৎসব কথন

-লেখক

উৎসব কেবল আনন্দ ঘটায় না, প্রাণের স্ফুরণ ঘটিয়ে শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে সতেজ রাখে; দেয় নব নব কর্মপ্রেরণা। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের সৃজনশীলতারও নানা প্রকাশ ঘটে। রচিত ও নির্মিত হয় সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র সহ কতো না সমৃদ্ধির সম্ভার।

উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধনকে সুদৃঢ় করে; হৃদয়কে করে প্রসারিত। উৎসব মানুষের চৈতন্যে বিস্তার ঘটায় সুরুচি ও শিল্পবোধের। মানুষের জীবনের ক্লান্তি, হতাশা, নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও দুঃখ ঘোচাতে উৎসবের উপযোগিতা অসামান্য। আমাদের জীবন ক্রমে কর্মব্যস্ত ও একঘেয়ে। আনন্দের একটুকরো জমিনও বিলীন প্রায়। 

মানুষ কেন চিরিয়াখানার শ্বাসরুদ্ধকর বন্দী জীবন নিয়ে ছটফট করবে? জীবজন্তুর মতো ঘর আর কর্মস্থলের সীমানা প্রাচীরে দমবন্ধ সময় কাটাবে? কিংবা ভার্চুুয়াল জগতে আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক আনন্দের উৎসগুলো দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াবে সারাক্ষণ?

উন্নয়নকে প্রকৃতির রক্ষাকবচ বিবেচনা না করে উপেক্ষা করাটাই বিপদকে ডেকে আনছে। প্রকৃতিও প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ করছে। রুষ্ট হয়ে উঠা সেই প্রকৃতি প্রতিবাদ জানাচ্ছে মানবসৃষ্ট ধংসলীলার বিরুদ্ধে। বদলা নিচ্ছে ভূমিকম্প, দাবানল, সুনামি, ঘূর্ণিঝড় কিংবা টর্পেডো রূপে!

প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি বারবার আমাদের সাবধান হবার সংকেত দেয়। কিন্তু ভুলে যাই সেই বার্তা। পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলার এই মন্দ পথ থেকে আমাদের ফিরতে হবে সুপথে। সুপথে ফেরার ওই পথটাই সবসময় আগলে রাখে সংস্কৃতিকর্মী ও সংস্কারমুক্ত মনের মানুষেরা।

বাংলাদেশ হচ্ছে উৎসবের দেশ। মানুষের বেদনাবিধুর, কর্মব্যস্ত, একঘেয়ে জীবনে ‘উৎসব’ আনন্দের সঞ্চার করে। অবসাদ ও গ্লানি দূর করে আমাদের এক নতুন জীবন দান করে। তাই মানুষের জীবনে উৎসবের প্রয়োজন আছে। তবে উৎসব মানে উল্লাস নয়; আনন্দ মানে যথেচ্ছাচার নয়। পরিমিতিবোধ ও নান্দনিকতার মধ্যে বাস করে সুন্দর. শান্তি ও পরিতৃপ্তি। সেটাই বলতে চায় ‘অন্যস্বর’। একস্বর, একতা, একসুর- ভিন্ন ভিন্ন পরিবারে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধের দামামা বাজায়। মানব শিশুর করুণ কান্না সে ডামাডোলের আড়ালে চাপা পড়ে মারা যায়। ভিন্ন ভিন্ন সুর, তাল, লয় থেকে একটি অভিন্ন মানবিক সমাজ গড়ার মানসে প্রাণ কাঁদে ‘অন্যস্বর’ সংগঠকদের। তারা চায়- অসংগতিগুলো সংগতির-কাননে শয্যা পাতুক।

তাই যে কাজটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সুচারুরূপে সম্পন্ন হবার পথ খুঁজে পায় না, অনিয়ম-দুর্নীতির যাতাকলে নিষ্পেষিত সে মানবিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথ দেখাতে চায় ‘অন্যস্বর’ স্বেচ্ছাসেবীরা। এ পথ যে কঠিন তা জানে তারা। তবুও সত্যরে যে ভালোবাসে তারা। নাটমন্দির, শহীদ মিনার, মুক্তমঞ্চ, খেলার মাঠ, নদী, খাল-বিল, জলাশয়গুলো দখল-ভরাট-দূষণ ও অবরুদ্ধ হবার বিরুদ্ধে কথা বলে। কখনো গানে, কখনো নৃত্যের ছন্দে ছন্দে, কখনো নাটকের নাটকীয়তায়, কখনো ‘কবিতার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হতে হতে ...। বলে- “গাহি সাম্যের গান-/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,/সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।"

যুগ যুগ ধরে আমাদের উৎসবের যে মহান মূল্যবোধ আমাদের চলতে সাহায্য করেছে, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছে- তাকে আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা সবাই এই কবিতা উৎসবের ভেতর দিয়ে সচেতন হলেই গড়ে উঠবে এক জাতি, এক প্রাণ, সাম্য ও শান্তি।

মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘কবিতা উৎসব-২০২৩’ সবার সহযোগিতায় সাফল্যমণ্ডিত হয়ে উঠুক। 

লেখক: সভাপতি, অন্যস্বর

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer