Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১২ বৈশাখ ১৪২৬, শুক্রবার ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

শীতে ফুল থেকে মধু আহরণ ও লাভজনক কৃষি


২৬ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ০১:১২  এএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


শীতে ফুল থেকে মধু আহরণ ও লাভজনক কৃষি

 

মধু আহরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হলো শীতকাল। মধু একটি সুস্বাদু এবং অধিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার। এটি শুধু সাধারণ একটি খাবার হিসেবে পরিচিত নয়, তা বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবেও ব্যবহূদ হয়। তাছাড়া খাঁটি মধু পাওয়ার নিশ্চয়তা আজকাল বেশ কঠিন। এখন কথা হলো কীভাবে পাওয়া যায় এ মধু- তাই আলোচনা করব আজকের এ নিবন্ধে।

দুই উপায়ে মধু উৎপাদিত হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে একটি হলো প্রাকৃতিকভাবে আহরিত মধু এবং অপরটি হলো কৃষক পর্যায়ে চাষকৃত মধু। বিভিন্ন বন-জঙ্গলে, গাছ-গাছরার ডালে ডালে মৌমাছি কর্তৃক যে মধু আহরিত হয়ে জমাকৃত হয় সেগুলো হলো প্রাকৃতিক। আর মাঠে-ঘাটে ফসলের মাঠ থেকে চাষ করে যে মধু আহরিত হয় তাকে চাষকৃত মধু বলা হয়ে থাকে।

বন-জঙ্গল থেকে যারা মধু সংগ্রহ করে তাদেরকে মৌয়াল বলা হয়। আবার যারা মধু চাষ করে তাদেরকে মধু চাষী বলা হয়। সারাদেশের বন-জঙ্গলের গাছ-গাছালিতে মধু সারাবছরই কমবেশি পাওয়া যায়। তবে শীতকালে এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কারণ এসময় চারিদিকে বিস্তৃত ফসলের মাঠ ফুলে ফুলে ভরা থাকে। সেসব ফুল থেকেই মধু আহরণ করে থাকে মৌমাছির দল। একক বন হিসেবে সুন্দরবন থেকেই মৌয়ালরা প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে মধু সংগ্রহ করে থাকে। আর প্রাকৃতিক মধুর একটি বিরাট অংশ আহরিত হয় সেই সুন্দরবন থেকেই।

মৌমাছি নামের এক ধরনের কীট-পতঙ্গ এভাবেই মধু সংগ্রহ করে গাছের ডালে কিংবা বাড়িঘরের চালে একত্রে জমা করে। মৌমাছি একটি সামাজিক পতঙ্গ হিসেবে পরিচিত। তারা একসাথে দলবেধে চলে। তাদের একজন গৃহকর্তৃ থাকে যাকে কেন্দ্র করেই মৌমাছিরা সবাই দলে দলে চলে। সেই গ্রহকর্তৃকে রাণী বলা হয়। রাণীই সকল মাছির মা। রাণী সুবিধাজনক একটি স্থানে অবস্থান নেয়, আর তাকে কেন্দ্র করে তার দলের সরবাই বাসা বানাতে থাকে। একসময় তাদের থাকার জন্য একটির পর একটি তাক-তাক করে ঘর বানায়। সেটিকে বলা হয় মৌচাক। আর মৌচাকেই মৌমাছির দল তাদের মায়ের নির্দেশে মধু এনে জমিয়ে রাখে। মৌমাছিরা দুঃসময়ে খাবারের জন্য আসলে মধু এনে জমিয়ে রাখে। সেখান থেকে মৌয়াল কিংবা তাদের প্রয়োজনের মধু আহরণ করে থাকে।

দিনে দিনে মধুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রতিবছর এখন সারাদেশে শীতকালে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়ভাবে মধুর আবাদ হয়ে থাকে। কৃত্রিমভাবে কৃষক পর্যায়ে মধু চাষ করতে হলে যেসব জায়গায় বা যেসব এলাকায় বেশি ফুলেল শীতকালীন ফসল আবাদ করা হয়ে থাকে সেসব এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়। সব ধরনের ফুলেল ফসলই মৌমাছির মধু আহরণের জন্য উপযোগি। তবে সরিষা ফুল মধু আহরণের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগি এবং গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই দেখা যায় দেশের যেসব অঞ্চলে সরিষার আবাদ সবচেয়ে বেশি সেসব এলাকায় মধুর আবাদও বেশি।

মধু চাষ করার জন্য মধু চাষীর বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। কারণ মৌমাছি একটি বিষাক্ত প্রাণি। এর শুংয়ে বিশেষ ধরনের বিষ থাকে। সেই বিষ মানুষকে কামড়ানোর সাথে সাথে সে স্থান বিষাক্ত হয়ে ব্যাথায় ফুলে উঠে। একসাথে অনেক মৌমাছি কামড়ালে ব্যাথায় মানুষ মারাও যেতে পারে। কিন্তু মৌয়াল এবং মধু চাষীরা যাতে এসব সমস্যার মধ্যে না পড়েন সেজন্যই তাদের বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ থাকে। কারণ মধু চাষীরা একটি বিশেষ ধরনের বাক্সে মধু চাষ করার জন্য সেটিতে প্রথমে একটি রাণী মৌমাছি বন্ধী করে রাখে। সেখানে তখন রাণীকে ঘিরে হাজার হাজার মৌমাছি এসে বাসা বাধে। তারা প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে ফুলে ফুলে চলে যায় এবং ফুলের নির্যাস মধু আহরণ করে নিয়ে এসে মৌচাকে জমা রাখে। এভাবে কিছুদিন পরপর বাক্সে কিংবা মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়।

যেসব এলাকায় সরিষা বেশি আবাদ করা হয় সেসব এলাকায় মধুর চাষ বেশি হয়ে থাকে। আগাম আমন ধান কাটার পরপর জমিতে অল্প চাষ দিয়ে সরিষা বুনে দেওয়া হয় এবং স্বল্প মেয়াদি জাতের সরিষা আবাদ করে সেই সরিষার জমির পাশে বাক্স রেখে মৌমাছির মাধ্যমে মধু আহরণ করে একসাথে দুটি বাণিজ্যিক ফসল ও মধু তোলা সম্ভব। আর মধু এখন অন্যতম একটি লাভজনক পণ্য হওয়ায় মধু আহরণকে উদ্দেশ্য করে আগাম জাতের আমন ধান, স্বল্প মেয়াদি জাতের সরিষা এবং সরিষা উঠানোর সাথে সাথেই আবার বোরো আবাদের ব্যবস্থা রেখে সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে মধু চাষ হচ্ছে। দেশের সব জায়গাতেই তা সম্ভব হচ্ছে। তবে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে এর আবাদ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

এখন এভাবে মধু আহরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে প্রশিক্ষিত কৃষক এবং আবাদের পরিমাণ ও উৎপাদন সবই বাড়ছে। এক সময় শুধু দেশের চাহিদার কথা চিন্তা করে তা উৎপাদন করা হতো। কিন্তু বর্তমানে তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির জন্যও উৎপাদিত হচ্ছে। আশাকরি সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে এখাতে আরো সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই ভবিষ্যতে এটি যেমন একটি অপ্রচলিত রপ্তানি পণ্যে পরিণত হচ্ছে, ঠিক তেমনি একনাগারে এটি একটি কৃষি ও বাণিজ্য পণ্যের মর্যাদা লাভ করছে এবং আরো করবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected]

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।