Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৯ ফাল্গুন ১৪২৬, শুক্রবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬:৪০ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

কৃষিবিদ আবদুল মান্নানের প্রয়াণ: এক তারকা রাজনীতিকের পতন


১৯ জানুয়ারি ২০২০ রবিবার, ১১:৩৭  এএম

কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


কৃষিবিদ আবদুল মান্নানের প্রয়াণ: এক তারকা রাজনীতিকের পতন

জনাব আবদুল মান্নান একজন প্রথিতযশা কৃষিবিদ। এ নামটির সাথে একটি ত্যাগের মহিমা নিহিত রয়েছে। তিনি ১৯৫৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার হিন্দুকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবার নাম মরহুম জালাল উদ্দিন সরদার।

গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়ে তিনি পড়তে আসেন বাংলাদেশের কৃষি শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে তাঁর ডাকে তিনি শৈশবে ছাত্রাবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে গড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। তারপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর তিনি ছাত্রলীগের একজন বিশ্বস্থ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন। তিনি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। তাঁর সাংগঠনিক গুণের কারণেই এরপর তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যখন সারাদেশে বঙ্গবন্ধু, ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের নাম নেওয়াটাই অনেক দুঃসাহসের কাজ ছিল ঠিক সেই সময়েই তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগকে একটি বড় সংগঠন হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) নির্বাচন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মনোনয়নে মান্নান-প্রদীপ প্যানেল বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় যেখানে জনাব আবদুল মান্নান ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি শুধু বিশ^বিদ্যালয় নয় হয়ে উঠতে থাকেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা সারাদেশের একজন ছাত্রনেতা। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর সাথে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তাঁরা ১৯৮৩-৮৫ সময়ে এ গৌরবময় সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় সেসময়কার স্বৈরাচার বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন।

আজীবন পুরাদস্তুর এ রাজনীতিক পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন পাট সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তিনি নিজেকে পুরোপুরি রাজনীতিতে নিয়োজিত করেন। এরপর তাঁর নেতৃত্ব শুরু হয় মূলদল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে। শুরু করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে। পরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন করেন সহ-প্রচার সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং সর্বশেষ সাংগঠনিক সম্পাদক পদে। আওয়ামীলীগ ও স্বাধীনতা বিরোধী এলাকা হিসেবে পরিচিত বগুড়াতে নিজ বাড়ি হওয়ার কারণে তিনি দুবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিফল হলেও নিজ যোগ্যতা ও কর্মগুণে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অসাধ্য সাধন করে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সালে দশম এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমপি নির্বাচিত হয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রমাণে সমর্থ হন।

আমৃত্যু তিনি এমপি হিসেবে নিজ এলাকার ভোটারদের জন্য তো বটেই সারাদেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। বগুড়ার মানুষ হলেও ময়মনসিংহের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ টান। তাছাড়া কৃষিবিদ কমিউনিটি বলতে একেবারে অজ্ঞানই বলা চলে। যখনই কোন কৃষিবিদ যেকোন কাজে তাঁর কাছে যেতেন নিজ এলাকার চেয়েও বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখতেন তাদের সমস্যা। সমাধানও দিতেন সেভাবেই। পেশাগত জীবনে তিনি আমাদের সকলের প্রিয় পেশাজীবী সংগঠন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের দুইবারের মহাসচিব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক কৃষিবিদদেরকে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা আদায়সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কৃষিবিদদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করেছেন সর্বদা এ কৃষিবিদ নেতা।

তিনি এমপি হিসেবে প্রতিবারই কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়নে অবদান রেখেছেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে স্থাপিত কৃষি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে তিনি সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে থেকে কৃষিবিদদের কর্মসংস্থানসহ পেশাগত উৎকর্ষতা সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি সর্বদাই চেয়েছেন মানুষের কীভাবে কল্যাণ হয়। সেজন্য তিনি নিজে একটি বেসরকারি ব্যাংক ‘এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক (এক্সিম)’ এর পরিচালনা পর্ষদের সাথে যুক্ত থেকেও শিক্ষাবৃত্তি দানসহ আন্যান্য দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

সর্বদা সদালাপী, নিরলস, সরলপ্রাণ, পরোপকারী, নির্লোভ, চেতনাবাদী নিবেদিত প্রাণ এমন রাজনীতিক আজকের দিনে বিরল। অনেকে বলে থাকেন ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগকে এমন নিরলসভাবে সংগঠিত করার পুরস্কার হিসেবে তিনি হয়তো আরো কিছু রাষ্ট্রীয় সম্মানজনক অবস্থান পাওয়ার অধিকারি ছিলেন। কিন্তু কেন আমরা তাঁকে তা দিতে পারিনি সময়েই হয়তো এর জবাব দেবে। হয়তো যাওয়ার আগে এমন কষ্ট নিয়েই তিনি অকালে চলে গেলেন। যেসব পদ-পদবী ব্যবহার করে তিনি নিজ এলাকা, কমিউিনিটি, দেশ ও জাতির জন্য যা করে গেছেন, আরেকটু বেশি ক্ষমতা কিংবা পদধারী হলে হয়তো আমরাই এর সুফলভোগী হতে পারতাম। কাজেই আফসোস তো একটু আছেই। তবে যাই হোক তিনি পরপারে ভাল থাকুন এ প্রত্যাশাই করি। আর তাঁকে হারানোর এ অপূরণীয় ক্ষতি কখনোই পোষনীয় নয়। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
বসধরষ: শনফযঁসধুঁহ০৮@মসধরষ.পড়স

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।