Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৫ কার্তিক ১৪২৭, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর ২০২০, ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

কর্মকর্তারা পিটিয়ে খুন করে তিন ‘বন্দি’ কিশোরকে


১৪ আগস্ট ২০২০ শুক্রবার, ১১:২৬  পিএম

কাজী রকিবুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


কর্মকর্তারা পিটিয়ে খুন করে তিন ‘বন্দি’ কিশোরকে

যশোর : যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোর ‘বন্দি’ খুনের ঘটনায় নতুন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এখানে কোন সংঘর্ষ নয়, দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ঠান্ডা মাথায় পিটিয়ে হত্যা করেছে তাদের। আহত অবস্থায় অন্তত ১৪ কিশোর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা পেলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য স্বীকার করেনি। তবে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই ঘটনাকে ‘একপক্ষীয়’ বলে মন্তব্য করে গোমর ফাঁস করে দিয়েছেন। আর আহত চিকিৎসাধীন কিশোররা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে সাংবাদিকদের কাছে।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর রাতে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যান। গভীররাত পর্যন্ত তারা সেখানে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে খুলনা রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি নাহিদুল ইসলামও আসেন। তিনি রাত তিনটার দিকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হন।

যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, ‘গত ৩ আগস্ট কেন্দ্রের হেড গার্ড (আনসার সদস্য) নূর ইসলাম তার চুল কেটে দিতে বলে। সেদিন কেন্দ্রের প্রায় দুইশ জনের চুল কেটে দেওয়ায় আমার হাত ব্যথা ছিল। এ কারণে তার চুল পরে কেটে দেওয়া হবে জানালে সে ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করতে থাকে। এক পর্যায়ে কয়েকজন কিশোর তাকে মারধর করে। বিষয়টি হেড গার্ড অফিসে জানায়। সেখানে নূর ইসলাম অভিযোগ করেন, কিশোররা মাদক সেবন করে তাকে মারধর করেছে। কিন্তু কিশোররা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে, তারা মাদক সেবন করেনি।’

পাভেলের বক্তব্য, ‘ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে আমাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। আমরা ঘটনার আদ্যোপান্ত জানানোর এক পর্যায়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্য স্যাররা আমাদের বেধড়ক মারপিট করে।’

আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর ‘বন্দি’ জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে তা বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করে। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছ তলায় ফেলে আসে। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারপিট করে।’

যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈশান বলছে, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার (রাসেলের) জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারপিট আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’ সে অভিযোগ করে বলে, ‘প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলে, ‘তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।’

আহতরা জানায়, মারধর করে তাদের এখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়। পরে একজন করে মারা গেলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর রাত আটটা থেকে ১১টার মধ্যে চার দফায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়। তবে উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রবেশন অফিসার মুশফিক আহমেদ দাবি করেন, স¤প্রতি কেন্দ্রে বন্দি কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এরই জেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। রড ও লাঠির আঘাতে মারাত্মক জখম হয় ১৭ কিশোর। প্রাথমিকভাবে উন্নয়ন কেন্দ্রের তাদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা চলে। তবে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর মধ্যে নাইম, পারভেজ ও রাসেলকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

প্রবেশন অফিসার ও নির্যাতিতদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী

এই প্রসঙ্গে খুলনা রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম বৃহস্পতিবার দিনগত গভীর রাতে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যু পথযাত্রীরা কেউ মিথ্য কথা বলে না। হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা অপরাধ নিয়ে কাজ করি, তারা ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে বিষয়টি অবহিত হয়েছি। যে কারণে মূল ঘটনা জানা জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, মামলা হবে। সেই মামলার বাদী যে কেউ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থরা বা তাদের স্বজন অথবা তৃতীয় কোনো পক্ষ; সর্বশেষ কাউকে না পাওয়া গেলে পুলিশ তো রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের এ ঘটনা একপক্ষীয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হন জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান। এসময় তিনি বলেন, ‘কী কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। আমরা তদন্ত কমিটি করে দেবো। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের মারপিটের ঘটনায় তিন ‘বন্দি’ কিশোর নিহত হয়। এসময় আহত হয়েছে অন্তত ১৭ জন। আহতদের পুলিশ উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেছে। জেনারেল হাসপাতালের ডা. অমিয় দাশ বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই তিন কিশোর মারা যায়। কী কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়া বলা যাবে না।

নিহতরা হলো, খুলনার দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিম সেনপাড়ার রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮), রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১১৮৫৫৩, বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ৭৫২৪ এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার তালিপপুর পূর্বপাড়ার নানু প্রামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭), রেজিস্টেশন নম্বর ১১৯০৭। নাঈম হোসেন ধর্ষণ এবং রাব্বি হত্যা মামলার আসামি ছিল।

দেশে ছেলেদের জন্য দুটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। যার একটি গাজীপুরের টঙ্গিতে, অন্যটি যশোর শহরতলির পুলেরহাটে। এ কেন্দ্র মোট বন্দির সংখ্যা ২৮০ জন। যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রায়ই অঘটন ঘটে। লাশ উদ্ধার, মারপিটের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম জেঁকে বসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি এই তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে চালানোর জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অবস্থার যে উন্নতি হয়নি; বরং অবনতি হয়েছে।

ময়নাতদন্ত সম্পন্ন: তদন্তকমিটি গঠন

যশোর পুলেরহাট শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি তিন কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে নিহত তিন কিশোরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম ১৪ আগস্ট স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যশোরে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ৩ বন্দি কিশোর নিহত ও ১৪ জন আহত হওয়ার সুষ্ঠু তদন্ত করার জন্য দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলো, যুগ্ম সচিব। মাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সৈয়দ মো, নুরুল বসির ও উপপরিচালক ( প্রতিষ্ঠান- ২) এস, এম, মাহমুদুল্লাহ। তিন কর্মদিবসের মধ্যে মহাপরিচালকের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে শুক্রবার দুপুরে যশোর জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার আহম্মেদ তারেক সামস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রট হাফিজুল হকের উপস্থিতে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছেন।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।