Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৪ শ্রাবণ ১৪২৭, শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০, ১১:০২ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনায় কৃষি ব্যবস্থায় নজরদারি প্রয়োজন


১৭ জুলাই ২০২০ শুক্রবার, ১২:৩২  এএম

মাকামে মাহমুদ চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


করোনায় কৃষি ব্যবস্থায় নজরদারি প্রয়োজন

কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি এখন বিশ্বব্যাপী। এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশের মাটিতে সোনার ফসল ফলে। কৃষিই এদেশের মানুষের প্রধান উপজীবীকা। এখানকার শতকরা আশি জন লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল।

আমাদের কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য উৎপন্ন করে। দেশের চাহিদা মেটানোর পর সেসব পণ্যের যা উদ্বৃত্ত থাকে, তা আমরা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি এবং শিল্পোন্নয়নের জন্য কলকারখানার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও ভোগ পণ্য আমদানি করি। বাংলাদেশের প্রতি বর্গকিলোমিটার অঞ্চলে প্রায় ৯৫৩ জন লোক বসবাস করে অর্থাৎ অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ যেখানে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি পরিমাণ কেবলমাত্র ০.০৫ হেক্টর। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমানে এটি দেশের জন্য একটি বড় সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মোট ভৌগলিক অঞ্চল প্রায় ৫৬,৯৮০ বর্গমাইল (১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার) হলেও, আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কেবলমাত্র ৯ মিলিয়ন হেক্টর। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার বহুগুণ বৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু আবাযোগ্য জমির পরিমাণ কমপক্ষে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তারপরেও আমাদের দেশের কৃষকেরা খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিয়মিত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তাদের কঠোর পরিশ্রম খাদ্য খাতে স্বনির্ভরতা সুরক্ষায় সবুজ বিপ্লবের সূচনা করছে। তবে দুঃখের বিষয় ব্যয়বহুলতার জন্য কৃষি কাজের নিমিত্তে উৎভাবিত নতুন কৌশল এবং যান্ত্রিক সরঞ্জামগুলো ক্রয় করা থেকে এখনো তারা অনেকাংশে বঞ্চিত। আর আধুনিক যন্ত্রপাতি থেকে বঞ্চিত থাকার বিষয়টি করোনা পরিস্থিতিতে এক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদুপরি, উচ্চ ফলনশীল বীজের ফসল উদ্ভাবন এবং ব্যাপক হারে কয়েকটি আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রবর্তন কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, কৃষি খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এমনকি স্বল্প-উন্নত অনেক দেশ যেখানে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদ নিচ্ছে সেখানে উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষকদের অজ্ঞতা, অনভিজ্ঞতা, ব্যয়বহুলতা এবং ব্যবহারে অনীহা প্রকাশের কারণে আমাদের দেশের কৃষকেরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষির সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কৃষি খাতে যথেষ্ট আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামাদি না থাকায় বাংলাদেশের কৃষকেরা একটি কঠিন সময় পার করছে। এছাড়া আমাদের দেশের কৃষি খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে তার মধ্যে শ্রমের অভাব অন্যতম যা ফসল কাটার সময় কৃষকদের ফসল তোলার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজপোর্টাল এবং টিভি চ্যানেলগুলো শ্রমের অভাব সংবাদে প্লাবিত হয়। কৃষকদের যখন তাদের ফসল সংগ্রহ করার দরকার হয় তখন শ্রমের অভাবে তাদের পাকা ধান জমিতে রাখতে বাধ্য হয়। এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একজন কৃষককে তার ধানের জমিতে আগুন লাগাতে দেখা যায়। আমাদের দেশের কৃষকরা বীজ বপনের সময়ও একই ধরণের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। ফলস্বরূপ শ্রমের ব্যয় বৃদ্ধি পায় যা উৎপাদন ব্যয়কে বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করে। ফসল কাটার পরেও আমাদের দেশের কৃষকেরা স্বস্তি বোধ করে না। ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য তাদের আবার লড়াই করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের দেশের কৃষকেরা ফসল উৎপাদনে ব্যয়িত অর্থ সংগ্রহেও ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতির কারণে কিছু কৃষক, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কৃষকেরা কৃষিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। সুতরাং বলা যায়, কৃষিক্ষেত্র যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন, সে লাইফ লাইনকে বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে শত শত আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার চালু হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর কৃষকেরা এগুলো বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করছে। তবে আমাদের দেশের কৃষকদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি এবং সরঞ্জামাদির আগমন সম্পর্কে খুব একটা আগ্রহ নেই। তাই এ জাতীয় সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার সীমিত থাকে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ কৃষক নিম্ন-আয়ের গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তারা অর্থের অভাবে এসব যন্ত্রপাতি কিনতে এবং তাদের খামারে সেগুলোর প্রয়োগ করতে পারে না। এছাড়া তারা এগুলো ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসীও নয়। তাই তারা ম্যানুয়ালি অর্থাৎ পূর্বের নিয়ম অনুসরণ করে ফসলের চাষ চালিয়ে যান, যা শেষ পর্যন্ত তাদের উৎপাদনের হার হ্রাস করে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সরকারের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কৃষি ক্ষেত্রের এসব দিক বিদিক গুলো বর্তমানে ভাল নজরদারির আওতায় এনেছে। তারা বিভিন্ন ধরণের উচ্চ ফলনশীল ফসল উদ্ভাবন করে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছে যা আমাদের কৃষিক্ষেত্রকে উন্নত করতে সহায়তা করছে। এটি উল্লেখযোগ্য যে সরকার বর্তমানে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সরকার কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিকারকদের আর্থিক অনুদান প্রদান করছে। তবে আমরা যদি আধুনিক আধুনিক যন্ত্রপাতি সম্পর্কে তাদের সচেতন না করি তবে কিছুতেই কৃষকদের পরিস্থিতি বদলাবে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মূল-স্তরের কর্মকর্তাদের উচিত কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির আশীর্বাদ সম্পর্কে অবহিত করা এবং বাস্তবে তা প্রয়োগ করতে সহায়তা করা।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।