Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৮ আশ্বিন ১৪২৮, বৃহস্পতিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:২২ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

উড়াল পথে বন্যপ্রাণীর চলাচলে লাউয়াছড়ায় বন সেতু


১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ শুক্রবার, ০৯:২০  পিএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


উড়াল পথে বন্যপ্রাণীর চলাচলে লাউয়াছড়ায় বন সেতু

১২৫০ হেক্টর আয়তনে বন ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য বিখ্যাত এ বনের ভেতর দিয়ে রয়েছে রেল ও সড়ক পথ। ঝুঁকিপূর্ণ এ দু’টি পথে প্রতি বছর যানবাহন ও ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকসহ বন্যপ্রাণীর চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সম্প্রতি পাঁচটি বন সেতু (ক্যানোপি ব্রিজ) করা হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল যৌথভাবে বন সেতু স্থাপনের কাজ করে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে অনন্যতায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া উদ্যানের পুরনো নাম পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯২৫ সালে বৃটিশ সরকার বৃক্ষরোপন করলে সেটি বনে পরিণত হয়। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ, সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। উচুঁ নিচু টিলা জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানে দেখা মিলে বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর। উদ্যান ঘোষণাকালীন সময়ে সার্ভে অনুযায়ী ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণীর কথা বলা হয়। এরমধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপাীয় প্রাণী। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বনটি বিখ্যাত। তবে বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়কপথ এবং শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে প্রধান বৈদ্যুতিক লাইনে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বন্যপ্রাণী। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল।

এ অবস্থা বিবেচনায় লাউয়াছড়া বনের ভেতর উল্লুকসহ অন্যান্য প্রাণীর চলাচল নির্বিঘœ করতে দঁড়ি দিয়ে পাঁচটি বিশেষ বন সেতু করা হয়েছে। উদ্যানকে দ্বিখ-িত করে চলে যাওয়া সড়ক ও রেলপথের দু’পাশের গাছের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই সেতু। সড়কের দু’পাশের উঁচু দু’টি গাছের ডালপালার সঙ্গে নাইলনের মোটা রশি বেঁধে টানা হয়েছে সেতুগুলো। সেতুগুলোর দূরত্ব ২২ থেকে ২৫ মিটার। লাউয়াছড়ায় এই প্রথম ব্যতিক্রমী বন সেতু স্থাপন করা হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুন নাহারের নেতৃত্বে ছয়জনের গবেষক দল বন সেতু স্থাপনের কাজ করেন। তাদের সহযোগীতায় স্থানীয়ভাবে ছিলেন আরও তিনজন। এই গবেষক দলে কাজ করেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবির বিন মোজাফফর, ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের বন্যপ্রাণী গবেষক সাবিত হাসান, গবেষক হাসান আল-রাজী, নেকমের ফিল্ড ম্যানেজার গবেষক তানভির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র সজিব বিশ্বাস ও তানিয়া আক্তার। বন অধিদপ্তরের অর্থায়নে তারা বনের ভেতরের রেললাইনের ওপর ৪টি এবং সড়ক পথে একটি সেতু তৈরি করেন। সেতুগুলো মূলত ১০ সেন্টিমিটার ব্যাসের দঁড়ি। সেই সেতু কতটুকুু কাজে লাগবে তা জানতে বসানো হয়েছে ক্যামেরাও।

বন্যপ্রাণীর চলাচলের সুবিধার্থে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্যানোপি ব্রিজ রয়েছে। তবে এমন সেতু ধরে চলাচলে অভ্যস্ত হতে বন্যপ্রাণীর কয়েক মাস সময় লাগে বলে গবেষক দলের সদস্যদের ধারণা। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর সড়ক ও রেলপথের বিভিন্ন স্থান অনেক প্রশস্ত। এতে অনেক প্রাণী এক পাশের গাছ থেকে অন্য পাশের গাছে লাফ দিয়ে যেতে পারে না। কিছু প্রাণী নিচে নেমে সড়ক ও রেলপথ পাড়ি দেয়। এভাবে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেক প্রাণী মারা যায়।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সড়কে চিত্রা হরিণ, বানর, মেছো বিড়াল, মুখপোড়া হনুমান, চিতা বিড়াল, সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু হয়। করোনার কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এই সময়ে রেললাইনে বন্যপ্রাণী কাটা পড়ার ঘটনা নেই। সড়কপথেও যান চলাচল কম ছিল। তিনি আরো বলেন, ‘সেতুগুলো লাউয়াছড়া বনের বানর জাতীয় প্রাণী, বিশেষ করে উল্লুুকের জন্য খুবই উপকারী হবে বলে আমরা আশা করছি। একমাস পর পর ক্যামেরা দেখে বন্যপ্রাণীর চলাচলের বিষয়ে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যাবে।’

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।