Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ

‘লোকসঙ্গীতহীন বাংলাদেশ অনেকখানিই মৃত’


০২ জুন ২০১৪ সোমবার, ১১:০৩  এএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


‘লোকসঙ্গীতহীন বাংলাদেশ অনেকখানিই মৃত’
মুস্তাফা জামান আব্বাসী/ছবি: বহুমাত্রিক.কম

ঢাকা: লোকসঙ্গীত বিহীন বাংলাদেশ অনেকখানিই মৃত। লোকসঙ্গীত না থাকলে আমাদের নদীমাতৃক দেশ হিসেবে, ভাটিয়ালি-জারিসারির দেশ হিসেবে আমাদের যে আত্মপরিচয় তার অনেকখানিই মৃত হয়ে গেলো।
ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসনে দেশিয় লোকসংস্কৃতি ও লোকসঙ্গীতের দৈন্যদশায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ, লেখক, গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী

বহুমাত্রিক.কম-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন তিনি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী। ব্যক্তিগত ও বৃহত্তর জীবনে রয়েছে বহুমূখি পরিচয় । বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের কনিষ্টপুত্র।

সঙ্গীতভূবনে পিতার বিপুল-বিরাট যশখ্যাতির ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসীও লোকসঙ্গীতকেই বেছে নেন জীবনের একান্ত ব্রত হিসেবে। প্রায় ৫ যুগধরে তিনি লোকসঙ্গীতের শিল্পী হিসেবে মাতিয়ে রেখেছেন আমাদের সঙ্গীতভূবন।

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর জন্ম ১৯৩৭ সালের ৮ ডিসেম্বর। ওস্তাদ মুহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খানসহ বিখ্যাত অনেক সঙ্গীতগুরুর কাছ থেকে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন তিনি। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সব পর‌্যায়ে মেধার পরিচয় দেন মুস্তাফা। স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে।

আব্দুল আলীম, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, বেদারউদ্দীন প্রমুখের পরে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কণ্ঠেই বিশেষ ব্যঞ্জনা লাভ করে আবহমান বাংলা শেকড়সঙ্গীত সমূহ। এসবের মধ্যে রয়েছে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদী, চটকা, মারফতী, বাউল, হাসনসঙ্গীতসহ প্রত্যন্ত বাংলার মাঠেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানাঢঙের লোকগীতি।Abbasi

সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে দীর্ঘ সময়কালে নজরুলসঙ্গীতের কল্যাণে মুস্তাফা জামান আব্বাসী উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী ও লোকধারার গান সমূহ সংগৃহীত এবং জনপ্রিয় করতে তাঁর প্রচেষ্টা অত্যন্ত আন্তরিক ও ব্যাপক। কেবল নজরুল সঙ্গীতের প্রসারেই নয়, কাজী নজরুল ইসলাম-কে সামগ্রিক ভাবে জানতে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর গবেষণা বিরল সব তথ্যউপাত্ত জানতে সহায়তা করেছে আমাদের।

সঙ্গীতশিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন শিল্পসংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে। দীর্ঘ ৫ যুগ নিরবচ্ছিন্ন অন্বেষনে কাটিয়ে এখনো তিনি এসবের চর্চায় সমানভাবেই নিরলস-স্বতঃস্ফূর্ত।

দীর্ঘসময় ধরে তিনি দেশীয় সঙ্গীতের বিচিত্র বৈভব-বৈচিত্র্য অন্বেষণ করেছেন। নিষ্ঠাবান গবেষক হিসেবে বাংলা সঙ্গীতের হাজারো বৈচিত্র্য উদঘাটন যেমন করেছেন, তেমনি গবেষণা নিবন্ধ আকারে তা উপস্থাপন করেছেন আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মিলনীতে।

পিতার মতো করেই মুসলিম জাতিসত্ত্বার প্রকৃত সাংস্কৃতিক পরিচয় সৃষ্টিতে মুস্তাফা জামান আব্বাসী রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। সুসম্বৃদ্ধ পারস্য সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সেসবরে অন্যন্য উপস্থাপন সার্থকভাবেই করতে পেরেছেন তিনি।

জগতবিখ্যাত সূফি সাধক জালালউদ্দীন রুমির সৃষ্টিকর্মের সরল অনুবাদ করেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। মহান পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রকৃতস্বরূপ উদঘাটনে পৃথিবীর দেশে দেশে রুমির বাণী আজ কোটি মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষই গ্রহণ করছে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী একই ভাবে ইসলাম, মুহম্মদ ও আল্লাহ’কে নিবেদিত কাজী নজরুল ইসলামের চার শতাধিক প্রেমসঙ্গীত এবং অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম-দর্শন নিয়ে যেতে চান পৃথিবীজুড়ে, যেখানে মুসলিম রয়েছেন কিংবা রয়েছেন মানবতাবাদী অন্যধমের্মর অনুসারীরাও।

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ইসলাম নিয়ে নজরুলের যতো আহ্বান, তা যথাযথভাবে বিশ্বমুসলিমের কাছে পৌছে দেওয়া গেলে রুমির মতোই নজরুল সাড়ম্বরে সমাদৃত হবেন। নজরুলের প্রকৃত চেতনা পুস্তক আকারে পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল ভাষাসমূহে রূপান্তর করতে কাজ করছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী।

লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত, বিশ্বসঙ্গীত, ইসলামী দর্শন, কাজী নজরুল ইসলাম, আব্বাসউদ্দীন, সমাজ ও ইতিহাসের ক্রমবিবর্তন ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ নিয়ে এ পর‌্যন্ত অর্ধশত গ্রন্থ লিখেছেন তিনি। পাঠক, গবেষক ও শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে এসব গ্রন্থ সাদরে গৃহীত হয়েছে।

বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে এর উৎকর্ষ সাধনে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর অবদান উল্লেখযোগ্য। সুচনা থেকেই রাষ্ট্রীয় এই দুটি প্রচারমাধ্যমে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে অসংখ্য অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে তাঁর বোন ফেরদৌসী রহমান এর নামও সমানভাবে উল্লেখ্য।

সরকারি-বেসরকারি ভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে। দীর্ঘ ১১ বছর তিনি দেশের জাতীয় সঙ্গীত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ছিলেন ফোক মিউজিক রিসার্চ গ্রুপের পরিচালক।

রোটারী ক্লাব, ঢাকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিশ্বে অসংখ্য দেশে অনুষ্ঠিত রোটারী সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। দেশে-বিদেশে অসংখ্য সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও সম্মিলনীর সভ্য তিনি।

Abbasimমুস্তাফা জামান আব্বাসী একাধারে বাংলা একাডেমীর সম্মানিত ফেলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি’র জীবন সদস্য, বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান, ঢাকা ও গুলশান ক্লাবের সম্মানিত সদস্য, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য, ইন্টারন্যাশন কাউন্সিল অব ট্রাডিশনাল মিউজিক, ইউএসএ-এর সদস্য।

বর্তমানে তিনি ইনিডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার ও ডায়ালগ অব কালচারাল পলিসি’র চেয়ারম্যান।
সঙ্গীত, গবেষণাসহ সমাজ-সংস্কৃতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ভূষিত হয়েছেন অসংখ্য সম্মাননায়।

সঙ্গীতে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মুস্তাফা জামান আব্বাসী লাভ করেন একুশে পদক (১৯৯৫)। এছাড়াও তিনি লাভ করেছেন, চ্যানেল আই-রবি আজীবন সম্মাননা(২০১১), লালন পরিষদ অ্যাওয়ার্ড, সিলেট মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, নজরুল একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, মানিক মিয়া অ্যাওয়ার্ড, আব্বাসউদ্দীন স্বর্ণপদক(চট্টগ্রাম), বেঙ্গল স্যানিটারি অ্যওয়ার্ড, নাট্যসভা অ্যাওয়ার্ড।

সঙ্গীতসাধনা, গবেষণা, লেখালেখিসহ বৃহত্তর জীবনের নানাদিক নিয়ে বহুমাত্রিক.কম-এর সঙ্গে কথা বলেছেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। বিশেষ করে কথা বলেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পিতা কালজয়ী লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও আমাদের লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে।

নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় কিস্তি পত্রস্থ হলো এখানে। কথা বলেছেন বহুমাত্রিক.কম-এর সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। ছবি তুলেছেন বিশেষ প্রতিবেদক সুরেশ বড়ুয়া

বহুমাত্রিক.কম: নতুন কী লিখছেন?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: কুরআনের তাফসীর করছি। সারাদিন এ কাজই করছি। যখন এ কাজ শেষ করতে পারবো তখন আমি সবচে খুশি হবো। আরো এক বছর লাগবে হয়তো এ কাজ শেষ করতে।

বহুমাত্রিক.কম: আবহমান কাল থেকে লোকসঙ্গীতের যে ধারা তাতে এখন নানা আচড় লাগছে। অনেকে ফিউশন বা রিভিশন করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক লোকশিল্পী আজ না খেয়ে মারা যাচ্ছেন। একজন লোকসঙ্গীতের গবেষক ও শিল্পী হিসেবে কিভাবে দেখেন-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: আপনি যথার্থ বলেছেন। আমার বইতে আমি এসব কথা বিস্তারিত লিখেছি। আমি যেহেতু এ পথেরই পথিক, তাই আমার লেখাতে আমি এসব লিখেছি। এর মধ্যে ভাটির দেশের ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য বইতে লোক সঙ্গীতের নানা কথা রয়েছে। গ্রাম থেকে শিল্পী নিয়ে এসে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করে আসছি গত ৫০ বছর ধরে।

বিধায় এটা বলাবাহুল্য যে, লোকসঙ্গীত নিয়ে আমার যে বেদনা তা আপনাদের বেদনার সঙ্গেই সমতারে বাধা থাকবে। লোকসঙ্গীতের প্রতি আমার ভালোবাসা এতোটাই প্রগাঢ় ঠিক আমার গ্রামকে যতোখানি ভালোবাসি ততোখানি-যেনো ঠিক আমার রক্তের সঙ্গে মিশে আছে।Abbasi

শত শত লোকশিল্পীকে আমি এনে টেলিভিশনে উপস্থাপন করেছি। তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। এই যে আকবর, যাকে আমি বিদেশে পাঠিয়েছি, ইংল্যান্ডের রাণীর সংবর্ধনায় আমি নিজে না গিয়ে। আজকে এইযে মমতাজ এতো বিখ্যাত, এরা সবাই আমার অনুষ্ঠানে প্রথমে গান গেয়েছিলো।

বাংলাদেশে যদি নৌকা না থাকে তাহলে কী হবে, বটবট করে যেগুলো চলে সেইগুলো আসবে। যদি মাঝি না থাকে তাহলে ভাটিয়ালি কে গাইবে, ভাটিয়ালি যদি না থাকে তাহলে বিচ্ছেদি গান কত্থেকে আসবে? যদি বিচ্ছেদি না থাকে তাহলে মানুষের মনের মধ্যে যে হাহাকার সেই হাহাকার কী ভাবে বাজবে।

আমি বিদেশে আমন্ত্রিত হই, এজন্য যে আমার মধ্যে তারা লোকসঙ্গীতের স্বরূপ দেখতে পান। আমি যতোদিন বেঁচে আছি এইটুকু বলতে পারি, লোকসঙ্গীত না থাকলে বাংলাদেশের অনেকখানি মৃত হয়ে গেলো।

যদি নজরুল সঙ্গীত মরে যায় তাহলে বাংলাদেশের মানুষের যে হতাশা ক্রন্দন-রোমান্টিসিজম-ভালোবাসা-গজলপ্রেম তার অনেকখানি মরে গেলো। যদি রবীন্দ্রসঙ্গীত না থাকে, তাহলে রবীন্দ্রনাথের যে চিন্তরন ভালোবাসার আহ্বান, ইশ্বরকে পাওয়ার যে আকাঙ্খা তা মরে গেলো।

যদি উচ্চাঙ্গ সংগীত না থাকে তাহলে আমাদের মার্গ সঙ্গীতের প্রতি যে আকর্ষণ, যা দিয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি, তা মরে গেলো। এগুলো সব একসঙ্গে যুক্ত।

যদি আমরা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক স্টেট হিসেবে চাই, সেখানে এমন পরিবেশ থাকবে যেখানে সব ধর্মের-মতের পথের মানুষের সাযুজ্য থাকবে। মারামারি নয়। সঙ্গীত কখনো মারিমারির কথা বলে না। সঙ্গীত মিলনের কথা বলে। আব্বাস পরিবারের সদস্যরা কখনো চায় না, মারামারি-সন্ত্রাস-বোমাবাজি হোক। ট্রেনে-বাসে অগ্নিসংযোগ হোক। সেটা ডেমোক্রেসি না। যদি দেশে গণতন্ত্র না থাকে সঙ্গীতও থাকে।

গণতন্ত্র না থাকলে সংস্কৃতিমারা যাবে। আরেকখান থেকে উড়ে এসে বসবে। আমরা যখন ভারতে ছিলাম তখন মারোয়ারিরা আমাদের সংস্কৃতি দখল করেছে, যখন পাকিস্তানে ছিলাম তখনও তাই। আমরা যদি অন্য সংস্কৃতি সঙ্গীত আনি তবে নিজেরাই নিজেদের কবর রচনা করবো।

যদি ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া মরে গেলে আমরা সামগ্রিক ভাবেই ধিকৃত হবো। আজ এই লোকসংস্কৃতির সংকট উত্তরণে সকলকে একত্রে লড়াই করে যেতে হবে। যেভাবে পাঞ্জাবিদের-মারোয়ারিদের বিতাড়ন করেছি, সেভাবেই অন্যদেরও বিতাড়ন করবো।

বহুমাত্রিক.কম: কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাস উদ্দীন আহমদ। এই দুই কালপুরুষের যুগসূত্রকে কী ভাবে ব্যাখা করবেন।

Abbasiমুস্তাফা জামান আব্বাসী: কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দীন আহমেদ বাঙালি মুসলিম জাগরনের অগ্রদূত। তাঁদের যুগ্ম ভূমিকা জাতি ভুলবে কেমন করে? পিছিয়ে পড়া ঘুমিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে জেগে উঠেছিলেন যে দু’জনের হাত ধরে, তার প্রথম কবিকণ্ঠ কাজী নজরুল , প্রথম গীতকণ্ঠ আববাসউদ্দিন।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’। গেয়েছিলেন আববাসউদ্দিন তার দরদী কণ্ঠে। সেই গান সবার কানে চিরদিনের জন্যে অক্ষয় হয়ে রয়েছে। চারশত হামদ ও নাত লিখেছেন নজরুল। গেয়েছেন : আববাসউদ্দিন, কে. মল্লিক , বেদারউদ্দিন, গিরীন চক্রবর্তী, ধীরেন দাশ, আরও শত শিল্পী। অথচ সে গানগুলোকে আমরা অনায়াসে অবহেলা করলাম, এই বলে যে আল্লাহ্ ও রসুলকে পরিত্যাগ করলেও চলবে, আধুনিকতাকে পরিত্যাগ করা যাবে না। তারা বুঝলেন না, আধুনিকতার উপাদান একমাত্র আল্লাহ্ ও তাঁর রসুল।

নজরুল আমাদের জাতীয় কবি এই কারণে যে তিনি আল্লাহ্ ও রসুলকে চিনেছেন। তা না হলে শত প্রেমের কবিতাও কাজে আসত না। আববাসউদ্দিন-এর ক্ষেত্রেও তাই। তিনি এ দেশের প্রথম জাতীয় কণ্ঠশিল্পী। তার স্বীকৃতি জাতি দিয়েছে, সরকারের প্রয়োজন হয়নি। আজ না হোক কাল, এ স্বীকৃতি তাকে দিতেই হবে। হয়ত একশ’ বছর পরে, তাহলেও দিতে হবে। এই জমিনে যতদিন মুসলমান বাস করবে, ততদিন তারা আববাসউদ্দিনকে এই স্বীকৃতি দেবেই। নজরুল ও আববাসউদ্দিন বাঙালির জন্যে অপরিহার্য। কে না জানে, বাঁচতে হলে প্রতিদিনের নিঃশ্বাসে প্রয়োজন আল্লাহ্ ও রসুল।”

বহুমাত্রিক.কম: মানুষ, গায়ক ও পিতা-এই তিনের মধ্যে একজন আব্বাস উদ্দীন আহমেদ-কে কী ভাবে দেখেন। পিতা-পুত্রের মধ্যকার যেসব স্মৃতি আজো উজ্জল-সেসব কথা জানতে চাই-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: “পঞ্চান্ন বছর আগের কথা। পিতা রোগ শয্যায়, নিজ কণ্ঠে রেকর্ডে গাওয়া গান নানা গানের খাতা থেকে উৎকলিত করে সাজালাম। প্রতিটি গান তিনি নিজে পড়লেন ও বলে দিলেন বাণী ও সুরকারের নাম। সামনে এসে দাঁড়াল ফেলে আসা গানগুলো, সুরগুলো নেচে উঠল, পেছনে নানা সভায় তাঁর অগণিত শ্রোতার উল্লাসধ্বনি । মুহূর্তগুলো অনুভবে আজও উজ্জ্বল, যেন গতকালের ঘটনা। তাঁর দু’চোখের দিকে তাকিয়ে পুত্র, জমা হয়েছে যেখানে মুক্তোর মত অশ্রুকণা।

ছোট বেলার কথা। সাল ১৯৪৯। দার্জিলিংয়ে বাঁকানো কার্ট রোড অনেকের চেনা। দুদিক থেকে মলে গিয়ে মিশেছে রাস্তাটি । ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন সকাল বেলা, চারিদিকে কিছুই দেখা যায় না, নিজের হাতটিও নয়। স্বাস্থ্যান্বেষিরা হাঁটতে বের হয়েছেন। আগন্তুক দূর থেকে আসতে থাকলে ভয় ভয় লাগবেই, অপরিচিতি ভীতিসঞ্চারক ।সুবেশধারী একভদ্রলোক আসছেন । আরেকটু কাছে এলে পেয়ে যাই লালচে স্ট্রাইপের কোট পরে, সুস্মিত হাসির অধিকারী। আর কেউ নন। আমার পিতা, দুজন দুজনে দু’দিক থেকে এসে সামনাসামনি পিতা-পুত্র।

তিনি চলে গেলেন ১৯৫৯ এ। পঞ্চাশ বছর দূরত্ব। দূর থেকেও পিতাকে সহজ সাবলিল প্রাণবন্ত দেখতে পাই। বিমলকামিত্ম, বাবরী চুলের বিন্যাস, তেমনি মুখের হাসিটি, হাসি এত নির্মল হতে পারে। দিলদরিয়া প্রাণবন্ত মানুষ, মমতায়, ভালবাসায় পরিপূর্ণ। তাঁকে পেয়েছি কুড়ি বছর, বিরহে পঞ্চান্ন। কত সামান্য সময় পেয়েছিলাম তাঁকে।

বাংলার অবিসংবাদিত স্বর্ণকণ্ঠ, আদরের পল্লী দুলাল, আববাসউদ্দিন। যে গান তাঁর সোনালী কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছিল সে দিন, তা আর তেমনটি শোনা যায় না। যে রেকর্ডগুলো গানগুলোকে ধারণ করেছিল, কালের অমোঘ অস্ত্র রেকর্ডগুলো ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলল, কেউই পারল না তার ভঙ্গুরতা রোধ করতে। রয়ে গেল গানের বাণী। তাঁর লেখা নয়, নয় তাঁর সুর, শুধুমাত্র কণ্ঠের যাদুই গানগুলোর নামকরণ করে গেছে চিরকালের জন্যে: ‘আববাসের গান’, ‘আববাসউদ্দিনের গান’। আর এখানে ওখানে রেকর্ডের ভগ্নাংশ: ‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরারে, কোন দিন আসিবেন বন্ধু, কয়া যাও কয়া যাও রে’।

গানগুলো গেয়ে ফিরেছি সারা বাংলায়, ফেরদৌসী, আমি, বেদারউদ্দিন, সোহরাব হোসেন, রথীনরায়, ইন্দ্রমোহন, রুনা, সাবিনা, নাশিদ, সামিরা ও আরো অনেকে, বাঙালিরা যেখানে কথা বলে সেই আসরগুলোতে, আমেরিকায়, লন্ডনে, প্যারিসে, জাপানে, রাশিয়ায়, অষ্ট্রেলিয়ায়, আরব দেশে, পৃথিবীর সব প্রামেত্ম। যখন গেয়ে উঠেছি ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’, শ্রোতা বুঝে নিয়েছে এ আর কারো গান নয়, এ গান আববাসউদ্দিনের।

সামান্য লেখক। নানা লেখায় ভাস্বর পিতার স্মৃতি। সম্পাদনার আর প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ছিল বাঁচিয়ে রাখার। তা আমরা করেছি এবং করে যাব আমৃত্যু, আমরা, ছেলেমেয়েরা, নাতি নাতনিরা, ছাত্র-ছাত্রী ও দুই বাংলায় পিতার অসংখ্য অনুরাগি। বাংলাদেশের সবগুলো জেলাতে, পশ্চিম বাংলায় আববাসউদ্দিন স্মরণ সমিতির মাধ্যমে, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, বলরামপুর, আসাম ও দিল্লীতে, নানা অনুষ্ঠানে হয়েছে তাঁর স্মৃতিতর্পণ।

বহুমাত্রিক.কম: আব্বাস পরিবারের প্রায় সকলেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে নিজ যোগ্যতায় সমাসীন। কারো পরিচয় অতি উজ্জ্বল। আপনার বোন ফেরদৌসী রহমান, ভ্রাতুষ্পুত্রী নাশিদ কামাল-এঁরা সকলেই আসীন হয়েছে যশখ্যাতির চূড়ায়। কী ভাবে দেখেন-

Abbasiমুস্তাফা জামান আব্বাসী: ‘সে আমার ছোট বোন’ প্রবন্ধটি পড়ার জন্যে অনুরোধ করছি। ফেরদৌসী সম্পর্কে যে বৃহৎ গ্রন্থটি সমস্ত লাইব্রেরিতে শোভা পাচ্ছে, তার মধ্যে বলেছি আমার বোনের কথা। আমার পিতার গানগুলোকে যে জীবন্ত করেছে সে আর কেউ নয়, আমার ছোট বোন ফেরদৌসী রহমান, বাংলার কিংবদন্তি শিল্পী।

এই মুহুর্তে মনে পড়ছে মান্নাদে’র গাওয়া গানটি: সে আমার ছোট বোন। আর মাহমুদুল হকের লেখা উপন্যাস: জীবন আমার বোন। বোনকে নিয়ে মহৎ শিল্প সৃষ্টি হয়েছে, হয়েছে গান, কারণ জীবনের একটি মহত্তম উপাদান এটি। আমি আমার জন্যে যা চাই তা কি আমার ভাইবোনের জন্যে চাই? যদি আমি মিথ্যাচার না করে বলি হ্যাঁ, তা হলে আমি সত্যবানের মধ্যে পরিগণিত।

আর যদি বলি আমি সবার জন্যেই তাই চাই যা নিজের জন্য চাই। তা হলে আমি মহৎদের একজন। ছোট্ট বোনটিকে আবিষ্কার করার জন্যে আমার রেডিও টেলিভিশনের চত্বরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, নেই প্রয়োজন জলশায় গিয়ে তার মহৎ সংগীতের আসরে যোগ দেওয়ার। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই ফেলে আসা হিমালয়ের কোলের শাশ্বত শুভ্র সমুজ্জল একটি শহর, যেন ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, যেন মহারাজার একশত ব্যান্ড বিউগেলের সংগে জেগে উঠছে সমস্ত শহর।

আর আমি ছোট্ট বোনটির হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি কুচবিহার রাজপ্রাসাদের সামনে মহারাণী ইন্দিরা দেবী স্কুলে, ইনফ্যান্ট ক্লাশে। এই ছোট্ট মেয়েটি আমার বোন বইতো কেউ নয়। সে যে কোন দিন মহারাণী হবে কে জানত। মহারাণী না হলেও সে যে আমার অংশ, তাকে ভালবাসি মহারাণী না হলেও, তাকে ভালবাসি সেই প্রথম দিনের মত আজও। শেষ হল মহারাজা মহারাণীদের দিনকাল। এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে সেরা সাহিত্যিক, কবি, শিল্পী, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী।
ওর চিবুকের নীচে একটা দাগ। ঐ দাগটির জন্যে আমি দায়ী। খেলতে গিয়ে একটি ছিম গাছের লতা তার চিবুকে আটকে গিয়ে থাকবে। ইচ্ছাকৃত নয় সে অপরাধ। দাগটা এখনও আছে। ছোট বোন হিসেবে সবচেয়ে আদর পেয়েছে সে ভাইয়ের। তাকে ডাকত গুজুমণি, আদরের ডাক।

আমার বোনের মত বোন ক’জন পেয়েছে? সারা জাতির ভালবাসায় সিক্ত সে। সংগীত, যা জীবনকে করে আলোকিত, তার মধ্যেই সমর্পিত তার জীবন। তার জীবন স্বার্থকতায় ভরে উঠেছে।

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আমার একমাত্র ভাই। মেধাবী ছাত্র, তুখোড় বক্তা, পেশাবরেণ্য ব্যারিষ্টার, সূক্ষ্মদৃষ্টি লেখক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রধান বিচারপতি। অনেকের জানা নেই, তিনি পিতার গানগুলোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা, সব গান তার জানা, সুর, গায়কি সমেত। আববাসউদ্দিনের প্রথম সন্তান শুধু নন, তাঁর সমগ্র কৃতিত্বের প্রধান উত্তরাধিকার। গান করেন নি কারণ তাঁর দাদাজির পেশায় জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু আববাসউদ্দিনের গানগুলো যদি তাঁর কণ্ঠে শোনা যেত, তা হলে পাওয়া যেত আরেক আববাসউদ্দিন। আমাদের আরেক উত্তরাধিকার, যাকে নিয়েও আমি গর্বিত-আহ্লাদিত-নাশিদ কামাল। ভ্রাতুষ্পুত্রী নাশিদ কামাল কেবল সঙ্গীতেই নয়, অধ্যয়ন-শিক্ষকতায়, সব ক্ষেত্রেই প্রখর মেধার স্বাক্ষর রেখে চলছে। এঁরা সবাই উজ্জ্বল করেছে আব্বাস উদ্দীনের নাম, তাঁর মান।

আমার দু’টি সন্তান । সামিরা ও শারমিনী। আমার চেয়েও তারা অনেক ভাল হয়েছে, কারণ তারা মেধাবী, মানুষের প্রতি দরদী ও যার যার ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। বড় মেয়ে আমেরিকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাষ্টার্স, কয়েকটি গ্রন্থ ও সিডির প্রণেতা, আমেরিকা ভিত্তিক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পাখি’-র সম্পাদিকা, দু’টি সন্তানের জননী। ছোট মেয়ে ‘ল ইয়ার’। সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী বড় কোম্পানীতে বড় চাকরী করেছে। কয়েকটি বই লিখেছে। দু’টি সন্তানের জননী। দু’জনই সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী। দাদুর গানগুলো গাইতে ভালবাসে। আসল ভালবাসা ক্লাসিক্যাল গানের প্রতি। দু’জনই ক্লাসিক্যাল শিখেছে বড় ওস্তাদের কাছে।

বহুমাত্রিক.কম: মুস্তাফা জামান আব্বাসী দেশের অগণিত গুণীজনের বন্ধু-সুহৃদ। জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাঁদের পরিচিতি ব্যাপক। তাদের কথা শুনতে চাই, জানতে চাই কিছু স্মৃতিকথাও-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে আমার পড়াশোনা । স্কুলের বন্ধু ছিল দোদুল, ভালো নাম হোসেন। পরিণত বয়সে ইংরেজীর শিক্ষক। আমেরিকায় ছিল বহুদিন। দোদুল ও আমি কার্জন হলে নাটকের অভিনয়ে অংশ নিয়েছি।

দীন মুহাম্মদ খান আমার সবচেয়ে পুরনো সাথী। ছোটবেলা থেকেই বন্ধুবৎসল ও মেধাবী। এখন বড় কোম্পানীর এডভাইজার। প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই আমার খোঁজ নেয় টেলিফোনে। দীন মুহাম্মদ ভাল অভিনয় করত এবং শেষ জীবনে ওকালতিতে সমর্পিত হয়। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে দীনু একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। কার কোথায় কখন কি দরকার, কে পৃথিবী থেকে চলে গেল, কবে তার স্মরণ দিবস এ খবরগুলো দেবে আর কে? দীনু। দিনরাত আল্লাহর ধ্যানে পড়ে থাকে, অথচ কাউকে তা জানতে দেয় না। কোথায় যেন তার সঙ্গে আমার নাড়ীর যোগাযোগ।

মওদুদ খুব ভালো বন্ধু আমার। তখনও, এখনও। রাজনীতিতে সফল। যখন জেলে থাকে, তখন আমি নানা ছলে তার সঙ্গে দেখা করি। শুধু পুরনো বন্ধুত্বের টানে। যখনই তার বিপদ, আমি এগিয়ে যাই। সবাই পরিত্যাগ করেছে, আমি করিনি। তেমনি আমার দুঃখের দিনে সবচেয়ে বেশী কাছে এসেছে মওদুদ। তার পারিবারিক সব অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত। তার বিয়ে আমি দিয়েছি, আমারটাতেও তার হাত ছিল বৈকী। তাকে উপদেশ দেওয়ার একজন লোকই সংসারে আছে, তা হলো আমি।
মওলানা মমতাজউদ্দিনের ছেলে হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এ কথাটাই তাকে বার বার বুঝাতে চেয়েছি।

স্কুলের বন্ধুদের মিলন সভা হয় মাঝে মাঝে মুহাম্মদ সলিমুল্লার বাসায়। অনেক খাওয়া দাওয়ার শেষে অতীত স্মৃতির পাতার উন্মোচন। ওয়াদুদ, আনোয়ারুল, আলী আখতার কুতুব উদ্দীন, আব্দুল আজিজ, মকসুদুস সালেহীন, হাবিবুল হক, আমির হোসেন, নুরুদ্দীন আল মাসুদ, রাকিব চৌধুরী, এম জহির (বাবলু), আনিসুজ্জামান খান (টুটুল), রশিদুল হাসান (বীরু), রঞ্জন, অমিতাভ, হিতেন মজুমদার, অজয় চক্রবর্তী, আরিফ হোসেন রিজভী, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আজিজুল ইসলাম সবাই উঁকি দিয়ে যায়।

সেন্ট গ্রেগরীর শত বার্ষিকী অনুষ্ঠানে ছিলাম প্রধান শিল্পীদের অন্যতম, বক্তা ও সুভিনির লেখক। সঙ্গে সমর দাস। একশত পঁচিশ বছরের বিশেষ অনুষ্ঠানে আমি প্রধান অতিথি। গত বছর। জীবনের একটি স্মরণীয় দিন। প্রায় দুহাজার ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক আমার কথা ও গানে পুরনো সময়কে স্মরণ করলেন। এই স্কুলের ছাত্র নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, তাজ উদ্দীন আহমেদ, ডক্টর বদরুদোজ্জা চৌধুরী, ডক্টর কামাল হোসেন, ডক্টর রশিদ উদ্দীন, সাহিত্যিক শাহরিয়ার কবির ও অনেকে। দুষ্টুদের মধ্যে আমি।

হিতেন মুজমদার আমাকে ভোলেনি। সারা জীবন হংকং, কোলকাতা থেকে আসার অনুসরণ করেছে। হংকং এ তার বাসায় গিয়েছি। কোলকাতায় তার স্ত্রী মৈত্রেয়ী মজুমদার, অতুলপ্রসাদের গানের নামকরা শিল্পী। এছাড়া কোলকাতার লব্ধ প্রতিষ্ঠ আইনজীবি আমার বাল্য বন্ধু অজয় চক্রবর্তীর সঙ্গেও আছে যোগাযোগ। আরিফ হোসেন রিজভী লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কার। তার ও স্ত্রী মুইনার সঙ্গে যোগাযোগ এখানো অক্ষুন্ন।

বহুমাত্রিক.কম: বেসরকারি ইনডিপেন্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র রিসার্চ স্কলার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, ধনী-দরিদ্রদের অসমতা, শিক্ষার মান ইত্যাদি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: পঞ্চাশটিরও বেশি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে দেশে। নতুন অনুমোদিত: সতেরটি। সবার মান এক রকম নয়।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত, বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা যেমন পড়ে, তেমনি মধ্যবিত্তদের ছেলেমেয়েরাও। ওদের মধ্যে মেধাবী আছে এবং বেশ কষ্ট করে তারা অর্থ সংগ্রহ করে এখানে পড়ছে। কাছ থেকে দেখেছি ওদেরকে। গরীব মেধাবীদের স্থান কম, একেবারে নেই তাও নয়। কোনভাবে কষ্টসৃষ্টে ওদের লেখাপড়া। ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি দু’বছর। এর কর্মকান্ড যথেষ্ট বিস্তৃত, বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলণীয়।

আমেরিকার জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছ’মাস পড়িয়েছি। সেটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় শহর, পাঁচ মাইল ধরে বিস্তৃত সে এলাকা। কী নেই সেখানে? পড়িয়েছি যা, শিখেছি তার থেকে বেশি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বইগুলো তো সেখানে। আমার ছোট মেয়ে শারমিনী ‘মাষ্টার অব ল’জ’ পড়তে গিয়েছিল, এমনি আদুরী মেয়ে, সঙ্গে নিয়ে গেছে বাবা-মা’কে।

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি তুলনায় পরিসরে অনেক ছোট হলেও সাত হাজার ছেলেমেয়ে মুখরিত করে রেখেছে খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, কমনরুম ও লেকচার থিয়েটার। ওরা আমার সন্তানের মত, আমাকে দেখছে পিতার মত। খেলাধূলা, নাট্যচর্চা, শিল্পকলাচর্চা, বিতর্ক সভা, গান-বাজনা, দেশ-বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ, কোনটাতেই পিছিয়ে নেই।

ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরিদের সঙ্গে তুলণীয়। শুনে খুশি হবেন, মৎপ্রণীত সব বই [৪১] সেখানে পাওয়া যাবে। উভয় বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকদের বই সেখানে সংরক্ষণ থাকবে বলে একটি প্রজেক্ট নিয়েছি। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, রাজনীতি দূরাগত বংশীধ্বনির মত। মসজিদে যারা নামাজ পড়ে তারা শুধু আল্লাহতে আগ্রহী, অন্য কিছুতে নয়। তবে গরীব মেধাবীদের ব্যাপারে আরো সুযোগ তৈরির ব্যবস্থা থাকলে খুশি হতাম।

বহুমাত্রিক.কম: পুরোদস্তুর গবেষক-লেখক হিসেবে নানামাত্রিক পরিকল্পনা রয়েছে আপনার। সেসবের অংশ বিশেষ জানতে চাই-

Abbasiমুস্তাফা জামান আব্বাসী :
ক) নজরুল সম্পর্কে যে গ্রন্থটি ইংরেজিতে রচনা করেছি, তা নজরুল ভক্তদের কাছে যাতে পোঁছে যায় তার জন্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। নজরুল-আববাসউদ্দিন সম্পর্কে চারটি জার্ণাল বেরুচ্ছে ফিবছর, যাতে তা নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে যায় তার ব্যবস্থা করছি। আববাসউদ্দিন সম্পর্কে যে বইটি লিখছি, তাও একই পদ্ধতিতে।

খ) . পৃষ্ঠপোষক পাওয়া গেলে নজরুল সম্পর্কে একটি প্রামাণ্য ছবি করতে আগ্রহী। ফরিদুর রেজা সাগর ও খ্যাতনামা পরিচালক গৌতম ঘোষের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে। সেই সঙ্গে কয়েকটি সিডি মারফত নজরুলকে পৃথিবীর সংগীত মহলে পরিচয় করাবার জন্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

গ) . লিখে চলেছি যতদিন মন সজীব থাকবে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মুসাফির: আমি। মন খেলা করে কলমের সাথে, পকেটে যা সর্বমুহুর্তে, সম্মুখে উপস্থিত: পাঠক-পাঠিকা।

ঘ) . গান গেয়ে চলেছি সকাল-সন্ধ্যা, নিজের ঘরে। ২০+১৭ টিভি চ্যানেল। কদাচিৎ আমন্ত্রণ, সুন্দর একটি পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে জম্পেস করে গাইতে চেষ্টা করি নানা ফেলে আসা গান: রবীন্দ্র-নজরম্নল-পুরনো বাংলা গান-ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি-চটকা-সারি-মারফতি-মুর্শিদি, এমন কি গীত গজল। ফি বেশি বিধায় আমন্ত্রণ কম।

ঙ) . সর্বমুহুর্তে সন্ধান যাঁর, দেখা নেই তাঁর। তাঁরই অন্বেষণ।

বহুমাত্রিক.কম: আসমা আব্বাসী। আপনার সহধর্মীনী। একজন আদর্শ নারী, মা, লেখিকা-ইত্যাদি পরিচয়ের ভেতরে কী ভাবে আবিষ্কার করেন তাকে-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: আসমার কথা অনেকবার বলেছি। যারা পাঠ করতে ইচ্ছুক, তাদেরকে আহবান জানাই বইটি সংগ্রহ করতে: ‘জীবন নদীর উজানে’। আসমা আমার জীবন সঙ্গিনী। ৫০ বছর অতিক্রান্ত । অনেকগুলো তাঁর অর্জন, মা হিসেবে, লেখক হিসেবে, সমাজ সেবক হিসেবে । এছাড়া টেলিভিশন রেডিওতে উপস্থাপিকা । লেডিস ক্লাবের চালিকাশক্তি । তাঁকে ছাড়া ওখানকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্ফূর্তি পায় না । সৈয়দ মুজতবা আলির ভাস্তি । অনেকগুলো বই লিখেছেন । এখনো লিখে চলেছেন ।

বহুমাত্রিক.কম: আপনার লেখা গ্রন্থসমূহের বিষয়ে জানতে চাই-

মুস্তাফা জামান আব্বাসী : পরিবারের প্রত্যেকেই বই লিখেছেন, তালিকা ‘আববাসউদ্দিনের গান’ বইয়ের ‘পরিশিষ্টে’ দেয়া। তাদের সুকৃতি বর্ণিত হয়েছে আত্মজীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’ গ্রন্থে। যারা পড়বেন, সবাইকেই পাবেন। মা বেগম লুৎফুন্নেসার লেখা ‘আমার মা’য়ের মুখ’ আমার সম্পাদনায় এবার বইমেলায়। এ রকম গ্রন্থ ইতিপূর্বে আর কেউ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। আমার স্ত্রী আসমা আববাসীর গ্রন্থ সংখ্যা: ৯, কন্যা সামিরা আববাসীর গ্রন্থ সংখ্যা: ৪, কন্যা শারমিনীর গ্রন্থ সংখ্যা ৫।.

Abbasiএখন পর্যন্ত আমার প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা ৫০ । মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জীবনী ভিত্তিক বই “মোহাম্মদের নাম” । অনুবাদ গ্রন্থ-জালালুদ্দিন রুমির, নিফারি, সুলতান বহু এর কবিতা । প্রশংসিত হয়েছে মাওলানা রুমির বই “রুমির অলৌকিক বাগান”। ইতিমধ্যে অধিকাংশ বইয়ের অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ।

আমার প্রকাশিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে, গোধুলির ছায়াপথে, কালজানির ঢেউ, রুমির অলৌকিক বাগান, যে নামেই ডাকি, জীবন নদীর উজানে, গালিবের হৃদয় ছুঁয়ে, জাপানঃ সূর্য উঠেছ যেখানে, ভাওয়াইয়ার জন্মভুমি, ভাওয়াইয়ার জন্মভুমিঃ দ্বিতীয় খণ্ড, ভাটির দেশের ভাটিয়ালি, লঘু সংগীতের গোড়ার কথা, রবীন্দনাথ্র প্রেমেরগান, পুড়িব একাকী, হরিণাক্ষি, স্বপনেরা থাকে স্বপ্নের ওধারে প্রভৃতি ।

প্রথম কিস্তি: ‘নজরুলের নির্বাক জীবন রসূলের কাছে ফেরারই সোপান’

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।