Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ

‘মা’ হয়ে বেঁচে থাক মিহি


২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ শনিবার, ০৬:৩০  পিএম

ড. নিয়াজ পাশা

বহুমাত্রিক.কম


‘মা’ হয়ে বেঁচে থাক মিহি

ঢাকা: উচ্চ শিক্ষার্থে মালয়েশিয়ায়। সাথে স্ত্রী-আশা, ছোট্ট মেয়ে-মিহি আর দেশে মা। মিহিকে আমি আম্মু বলে ডাকি। আমার শ্বশুর মিহিকে আমার মা’র নামে ‘নেক বানু’ বলে ডাকেন। তার শানে নজুল হচ্ছে, মিহির জন্মের পর পর আশা মেয়েকে আমার কোলে তুলে দিয়ে বলেছিল, ‘তুমি চেয়েছিলে মেয়ে তোমার শ্বাশুড়ির মতো হোক-এই দেখ, মেয়ে আমার শ্বাশুড়ির মতো হয়েছে।’ অর্থাৎ মেয়ে আমার মা’র মতোই হয়েছে। তাই এ ক্ষেপানো।

ছেলে ফাহিম দেশে থাকে। মিহিকে নিয়ে আমাদের সব কর্মকান্ড। কিছু নিয়ে রাগ করলে, মিহি’র হুমকি, ‘তোমাকে আমি আর ঔষধ, পানি দেব না।’ আমি বলি, ‘আমার দু’টি মা, তুমি না দিলেও সে দেবে!’

কোথায়, তোমার আর একটা মা ? তার জিজ্ঞাসু প্রশ্ন। ‘তাঁকে তুমি দেখতে চাও?’ মিহি’র হ্যাঁ সূচক জবাবে আমি বড় একটা আয়না তার সামনে ধরে বলি, দেখতে পাচ্ছ ? তার সহজ সরল উক্তি ‘এ তো আমি, আমার মুখ।’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ! তুমি যে আমার মা, মায়ের ছায়া, মায়ের মুখ-প্রতিছবি।’ ভাবি, আমি মা’র রক্তে মাংসে গড়া, আর মেয়ে আমার। এখন মেয়েই আমার তদারকি করে। মেয়েই হয়ত মা হয়ে ফিরে আসে !

দেশে ফিরে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পরি। বাইপাস অপারেশনের পর কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়। ডাক্তারের পরামর্শ, কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে, চলছে হেমো ডায়ালাইসিস। এজন্য প্রচুর অর্থ ও একটি সুস্থ কিডনি দরকার। আমি অত্যন্ত সুভাগ্যবান। আমি কৃতজ্ঞ। আশা জাগানিয়া ভালবাসা নিয়ে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত আমার বন্ধুরা এগিয়ে আসেন।

সব ক’টি মহাদেশে আমার জন্য মোনাজাত-দোয়া হয়। অন্যদিকে আত্মীয়স্বজন খোঁজ করছেন কিডনিদাতার। তাঁদেরও যে কিডনি রয়েছে, সেটা তাঁরা ভুলে গেলেন! ভূলেননি একজন। আর তিনি হচ্ছেন- আমার মা! এ বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর নাড়িছেড়া ধন, প্রথম সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে গ্রাম থেকে ছুটে আসেন।

আমি অবারও মা’র অফেরতযোগ্য, নিঃস্বার্থ ভালবাসায় সিক্ত হই। মনে পড়ে, আমার মা, হাওরাঞ্জলের সাধারণ এক কৃষকবধূ, ছেলেকে পড়ানোর কী অদম্য সাধনা তাঁর। পড়িয়েছেনও দেশের সেরা স্কুল-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। যৌথ পরিবারে মা আমার- ভাল খাবার, মাছের মাথা, দুধের সর, দই এর ডাইলা (হাড়ি) আগলা করে রাখতেন; গোপনে ’বৈশাখে’ ধান বিক্রিতে নিরব থাকতেন; হাঁস পালন ও মুরগীর ডিম বিক্রি করে টাকা জমাতেন, ঘি তুলে রাখতেন, ছেলেকে দেবেন বলে।

মা’র দেয়া ডিম বিক্রি করে বাজারে গিয়ে মামলেট আর বাদাম খেতাম। গ্রামের মেঠো পথে এখনো পথ পানে চেয়ে থাকেন। প্যান্ট , শার্ট পরা কেউ আসতে দেখলেই ভাবেন, এই বুঝি আমার ছেলে আসলো। আমি ডায়াবেটিকস জনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছি। মা, নিয়মিত ফোন না পেলে কান্না সঙ্গী। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও তিনি সন্তানের আরোগ্য কামনা করেন।

Mihiমানুষের দোয়াতেই আমি বেঁচে আছি, আমি তাঁদের কাছে ঋণী। আমার কামনা, হে আল্লাহ! এ ঋণ শোধের; মা, মানুষ আর মাতৃভূমির সেবা; তাঁদের ভালবাসার প্রতিদানের শক্তি, সামর্থ, সাহস ও মানসিকতা দাও।

আমার মা, আর সব মায়ের মতো, সব বিলিয়ে নিজের নামটাও মিশিয়ে দিয়েছেন, ’নিয়াজ’র মা’র মাঝে। মানুষ বাঁচে কর্মে, বয়সে নয়, সন্তানের মাঝে! এ ক্ষেত্রেও তেমন ব্যতিক্রম নয়। ১লা মার্চ, মিহির জন্মদিন, তাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা, মা হয়ে বেঁচে থাক, মেয়ে মিহি, অনেক অনেক দিন।

ড. নিয়াজ পাশা: কৃষি প্রকৌশলী, হাওর ভূমিপুত্র,
সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকায় কর্মরত।
০১৭২ ৭০৭৪ ৫৮৪, niazpasha@yahoo.com

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।