Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১০ কার্তিক ১৪২৭, রবিবার ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মহাবিপন্ন শকুন: বাংলাদেশে আছে মাত্র আড়াইশ’


০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার, ১২:২১  এএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


মহাবিপন্ন শকুন: বাংলাদেশে আছে মাত্র আড়াইশ’

মৌলভীবাজার : শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস অনেকটা নীরবেই কেটে গেল। প্রকৃতির জন্য অভাবনীয় উপকারী এই শকুন পৃথিবী জুড়েই এখন মহাবিপন্ন! বাংলাদেশে আড়াইশ শকুন রয়েছে বলে বনবিভাগ দাবি করছে। সারা বিশ্বে শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহের শনিবার আন্তজার্তিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।

করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশেও এবছর বনবিভাগ সেন্ট্রাল জুম ওয়ার্কসপের মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে। এছাড়া সচেতনতা সৃষ্টিতে জেলা প্রশাসন অফিস ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার টাঙ্গানো হয়েছে।

শকুন আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পৃথিবীব্যাপী শকুন বিলুপ্ত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শকুন না থাকার কারনে বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, ক্ষোরা রোগ ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়ার এবং জলাত্মঙ্ক রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শকুন বিলুপ্ত হওয়ার আরো বড় একটি কারণ বাসস্থানের পর্যাপ্ত অভাব। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা বৃহদাকার বৃক্ষরাজিতে বসতি গড়তো শকুন। এই ধরণের বড় ও উচুঁ গাছগুলিতে শকুন বাসা বাঁধে। তবে কালের পরিক্রমায় বর্তমানে শকুনের বসতি তৈরী ও বিশ্রাম নেয়ার মতো গাছগুলো বিলীন হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে বাসস্থানের অভাব।

গরু, মহিষ, গবাধি পশুসহ মৃত প্রাণী বা পচা-গলা ও বর্জ শকুনের খাবার। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে শকুনই প্রকৃতি হতে মৃত দেহ সরানোর কাজ করে রোগব্যাধী মুক্ত পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কয়েক দশক আগেও দেশের গ্রামগঞ্জে গরু, মহিষসহ গবাধি পশুর মৃত দেহ যেখানে ফেলা হতো দলে দলে হাজির হতো শকুন। প্রাণীর মৃত দেহের রোগ জীবানু মরে না। এগুলো সংক্রমিত হয়। শকুন এগুলো খেয়ে ফেললে রোগ বিস্তার রোধ হতো। শকুনের পেটে দ্রুত ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় দ্রুত তারা মৃত গবাধি পশুর মাংস খেয়ে সাবাড় করে দেয়। তবে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনে শকুনের আবাসস্থল বিনষ্ট আর গবাধি পশু চিকিৎসায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ ও ‘কিটোপ্রোফেন’ দেয়া গরু, মহিষ, ছাগলের মৃত দেহ খেয়ে শকুনের কিডনী নষ্ট হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। তবে শকুন সংরক্ষণে গত কয়েক বছর ধরে দেশে ব্যাপক কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, সারাদেশে ২৫০ থেকে ২৬০টি শকুন রয়েছে। দেশে শকুনের এই তালিকার মধ্যে সুন্দরবনে বেশিরভাগ অংশ রয়েছে। তাছাড়া সিলেটের হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গায় ৫০ থেকে ৬০ টি ও কমলগঞ্জের দেওরাছড়া এলাকায় ৫ থেকে ৬টি শকুন রয়েছে। উঁচু গাছের উপরে নেট বসিয়ে দেয়ায় রেমাকালেঙ্গায় শকুন সেখানে বাসা বাঁধছে এবং নতুন বাচ্চাও দিচ্ছে বলে বনবিভাগ দাবি করছে। তবে শকুন মহাবিপন্নের তালিকায় হলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এর সংরক্ষণ ও গুরুত্ব বেড়েছে। বাংলাদেশ বনবিভাগ ও আইইউসিএন এর যৌথ উদ্যোগে শকুন সংরক্ষণে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আইউসিএন এর তথ্য মতে, ২০১৪ সন থেকে এ পর্যন্ত মনিটরিং এ শকুন কমে নাই।

বাংলাদেশে ৬ প্রজাতির শকুনের মধ্যে বাংলা শকুনটি-ই কোনমতে টিকে আছে। এদেশে বেশি দেখা যেত বলেই তাদের নামের শেষে বাংলা শব্দটি চলে এসেছে। দেশীয় প্রজাতির বাংলা শকুন ইংরেজি নাম White-rumped vulture। গবেষকদের মতে গত দু’দশকে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে। বর্তমানে শকুন মহাবিপন্নের তালিকায়। যে কারনে বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিলেটের রেমা-কালেঙ্গা ও সুন্দরবনকে সেভ জুন ঘোষণা করে। এরপর থেকে শকুন সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুর প্রভুতি বিশালাকার গাছে এরা বাসা বাঁধে। গুহায়, গাছের কোটরে বা পর্বতের চুড়ায় ডিম পাড়ে। গবেষকদের তথ্য মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। দেশে ৬ প্রজাতির মধ্যে ২ প্রজাতি স্থায়ী আর অন্যরা পরিযায়ী। শকুন বা বাংলা শকুন ছাড়াও এতে রয়েছে রাজ শকুন, গ্রীফন শকুন বা ইউরেশীয় শকুন-হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নাম জেপস বেঙ্গালেনসিস (Gyps bengalensis)। গলা লম্বা, লোমহীন মাথা ও গলা গাঢ় ধূসর। পশ্চাদেশের পালক সাদা। পা কালো। ডানা, পিঠ ও লেজ কালচে বাদামি। একই বাসা টিকটাক করে বছরের পর বছর ব্যবহার করে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তাদের প্রজননকাল। ৪৫-৫০ দিনে ডিম ফোটে।

আইইউসিএন-এর সহযোগী সংগঠন বার্ডস্লিস্ট অর্গানাইজেশন উল্লেখ করেছে, কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সঙ্কট, কবিরাজি ঔষধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, বিমান-ট্রেনের সাথে সংঘর্ষ, ইউরিক এসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ, বাসস্থানের অভাব প্রভৃতি কারণে শকুন বিলুপ্ত হচ্ছে। শকুন পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী পাখি। অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া, খুরা রোগ, গবাধি পশুর যক্ষ্মা, কলেরার জীবানু খুব সহজেই শকুন হজম করতে সক্ষম। তাই শকুনকে টিকিয়ে রাখতে ও প্রজনন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সিলেট বিভাগীয় বন সংরক্ষক রেজাউল করিম চৌধুরী (বন্যপ্রাণী) বলেন, শকুন সচেতনতা দিবস হিসাবে এবছর করোনার কারণে সেন্ট্রাল জুম ওয়ার্কসপের মাধ্যমে পালন করা হবে। তাছাড়া সচেতনতা বাড়াতে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন অফিসের সামনে ব্যানার টানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শকুন বছরে একবার একটা ডিম দেয়। অনেক সময় সেটিও ফুটে না। সেটি শকুনের নিজের জন্যও হুমকি। সিলেট এলাকা শকুনের সেভ জুন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেমাকালেঙ্গায় বাচ্চা ফুটানোর সময় শকুনের খাবারের জন্য গরু দেয়া হয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।