Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২ শ্রাবণ ১৪২৬, বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯, ২:৩৪ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

নোনার কবলে খুলনার মাটি-পানি


০৪ এপ্রিল ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৩:৪৯  পিএম

শেখ হেদায়েতুল্লাহ, খুলনা

বহুমাত্রিক.কম


নোনার কবলে খুলনার মাটি-পানি

খুলনা : খুলনাঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা গত বছরের তুলনায় এবছর দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে বোরো চাষীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

চারা রোপেনের পর জমিতে পানি না থাকা, ভূ-গর্ভস্থ পানিতে লবনাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওযা এবং মাটিতে লবনাক্ততার কারণে অনেক রোরোক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ভচর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পানি ও মটিতে লবনাক্ততার পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি বিভাগের হিসেব মতে, চিংড়ি চাষের এলাকা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট জেলার তিন লাখ হেক্টরেরও বেশি জমি লবণাক্ত। সাতক্ষীরায় এক লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ত। এই জেলার শ্যামনগর উপজেলার ৩৮ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি লবণাক্ত।

এখানকার কৃষি জমির প্রায় ৮৮ ভাগই লবণাক্ততায় আক্রান্ত। উপজেলাগত হিসেবে এরপরই রয়েছে সাতক্ষীরার আশাশুনি এবং খুলনা জেলার কয়রা ও পাইকগাছার অবস্থান। এসব উপজেলার কৃষি জমির ৮০ ভাগই লবণাক্ততায় আক্রান্ত। শুধু নদীর পানি এবং মাটি নয়; খাল, বিল, পুকুরের পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা। এখানকার গাছপালা, পশুপাখি সবই নোনায় বিপর্যস্ত।

এ অঞ্চলের উদ্ভিদগুলি অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বিবর্ণ, ধূসর। শাক-সবজি ও মাঠের ফসল কমে গেছে। লবণাক্ততা বাড়ছে পানিতে। লবণ পানি টেনে আনা হচ্ছে ভূমিতে। ফলে ভূমিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। দিন দিন এই অঞ্চলের মাটি ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয় এমন ফসল লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতার চেয়ে মাটির লবণাক্ততা বেশি হয়ে গেছে।

গবেষকদের মতে এই অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত। এ পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করাও খুব ক্ষতিকর। মানুষ বাধ্য হয়ে এই পানি পান করে। খুলনার মৃত্তিকা গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলের এবং বিভিন্ন সিরিজের মাটির লবণাক্ততা নিরূপণ করেছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের মাটির লবণাক্ত হওয়ার প্রবণতা ভিন্ন ভিন্ন। লবণাক্ততা বাড়তে থাকে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস হতে। এপ্রিল- মে মাসে লবণাক্ততার মাত্রা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। লবণাক্ততা স্থায়ী হয় ৮ থেকে ৯ মাস।

মিষ্টি পানির প্রবাহ কম হলে এই লবণাক্ততা সারা বছর স্থায়ী হয়। তবে নিচের মাটি এবং মাটির দ্বিতীয় স্তর সারা বছরই লবণাক্ত থাকে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মতে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার গড়ে ৭৫ শতাংশেরও বেশি জমি লবণাক্ত।

মাটির লবণাক্ততা পানির লবণাক্ততার ওপর নির্ভর করে। পানির লবণাক্ততা বাড়লেই মাটির লবণাক্ততা বাড়ে। এ অঞ্চলের সকল নদীতে লবণাক্ততা কম- বেশি সমান। ডিসেম্বর/জানুয়ারি মাস থেকে নদী সমূহে লবণাক্ততা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিল/ মে মাসে তা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। বৃষ্টি তাড়াতাড়ি এলে নদীর পানিতে লবণাক্ততা কমতে শুরু করে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নদীসমূহ মোটামুটিভাবে লবণাক্ততা মুক্ত থাকে।

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে গাগড়ামারি নদীতে ১৮.২ ডিএস/মি ( ডেসিসিমেল পার মিটার; পানি পরিমাপের একক), মংলা পশুর নদ-নদীতে ১৯. ১ ডিএস/মি মাত্রা লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে পাওয়া গেছে ২২. ২ ডিএস / মিটার। জানুয়ারি মাসে পাইকগাছার শিবসা নদীতে ১৩. ১ ডিএস/মি। বাগেরহাটের মংলার পশুর নদে ছিল ৮.৫ ডিএস / মি।

মৃত্তিকা সম্পদ ইন্সটিটিউট খুলনার আঞ্চলিক কার্যায়ের সংগ্রহ করা পানি ও মাটির নমূনার তথ্য অনুয়ায়ী বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৬.৪ ইসি:ডিএস/মি ( ইলেকট্রিককনডাকটিভিটি ডেসিমেল/ মি; মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার একক। এবছর ৭. ১ ইসি:ডিএস/মি। পাইকগাছা ও বাগেরহাটের দ্বিগরাজে পাওয়া গেছে ১০.৩ ইসি:ডিএস/মি।

এ অঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানিতে লবণাক্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে এ অঞ্চলের নদ-নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা দশের উপরে থাকে। গত বছর (২০১৮) এপ্রিল মাসে নমুনা পরীক্ষা করে বটিয়াঘাটার গাগড়ামারি নদীতে ২৫ ডিএস/মি ( ডেসিসিমেল পার মিটার; পানি পরিমাপের একক ) , মংলা পশুর নদ-নদীতে ২৫.৯ মাত্রা লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে পাওয়া গেছে ২৭. ২ ডিএস/মিটার। যা যে কোনো কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে ছিল গাগড়ামারি নদীতে ১৩.২ ডিএস/মি ( ডেসিসিমেল পার মিটার; পানি পরিমাপের একক), মংলার পশুর নদ-নদীতে ১২.২ মাত্রা , সাতক্ষীরার আশাশুনিতে পাওয়া গেছে ১৬. ৬ ডিএস /মিটার।

খুলনা আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ি ২০১৬ সালে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২ হাজার ২২০ মিলিমিটার। ২০১৭ সালে বৃষ্টি হয়েছে ২ হাজার ২৮০ মিলিমিটার । ২০১৮ সালে বৃষ্টি হয়েছে ১ হাজার ১১৪ মিলিমিটার। যা ২০১৭ সালের চেয়ে অর্ধেকেরও কম।

মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) –এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শচীন চন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন সেচ উপযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পানির লবণাক্ততাকে তিন ভাগে ভাগ করেছে। এর নিরাপদ মাত্রা দশমিক ৭৫ এর কম। অধিক ক্ষতিকর ৩ এর বেশি। সাম্প্রতিককালে খুলনাঞ্চলে নদী-খাল-বিলের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণও ভিন্ন।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।