Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩ আশ্বিন ১৪২৭, শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনা সারাতে চাই দৃঢ় মনোবল: সাজিদ হাসান


২১ জুন ২০২০ রবিবার, ১১:০৮  এএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


করোনা সারাতে চাই দৃঢ় মনোবল: সাজিদ হাসান

কবি সাজিদ হাসান কামাল। বাস করেন রাজধানীর পুরান ঢাকার জনবহুল লালবাগে। লেখালেখির বাইরে এক কর্পোরেট কর্মী হিসেবেও যুক্ত। সমাজসচেতন সাজিদ চলমান করোনা মহামারীর কালে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, বাড়িয়েছিলেন সহযোগিতার হাত। আর এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিজেই আক্রান্ত হন করোনাভাইরাসে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ আর নিয়মতান্ত্রিক জীবনাচরণে ইতিমধ্যে সেরেও উঠেছেন তিনি। করোনাজয়ী সাজিদ হাসান কামালের মুখোমুখি হয়েছে বহুমাত্রিক.কম। তাঁর করোনা জয়ের গল্প শুনেছেন প্রধান সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। সেই কথোপকথনের চুম্বকাংশ প্রকাশিত হচ্ছে। 

বহুমাত্রিক.কম: করোনা উপসর্গ কিভাবে দেখা দিল?

সাজিদ হাসান কামাল: বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আঘাত হানার পরপরেই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সাহস নিয়ে পরিচিত মৃত ব্যক্তিদের লাশ দাফনের উদ্দেশ্যে কবরস্থানে যাতায়াত ও সেবামূলক কার্যক্রমে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। পাশাপাশি সরকারের সীমিত পরিসরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মস্থলেও গিয়েছি। এরই মাঝে গত ২৪ রমজানে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রচণ্ড জ্বর, ঠান্ডার পাশাপাশি সর্বশরীরে অসহ্য ব্যথা অনুভব করি। অসুস্থ বহুবার হয়েছি তবে এবার কেমন যেন লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এটা স্বাভাবিক জ্বর ও ঠান্ডার যন্ত্রণা নয়, অনেকটা ব্যতিক্রম। প্রচন্ড মাথা ব্যথার পাশাপাশি নাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোন খাবারের গন্ধ নাকে আসতো না। দু’দিন মেডিসিন নেওয়ার পরেও কোন উন্নতি দেখতে না পেয়ে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করতে যাই। নমুনা পরিক্ষা শেষে গত ২৪ এপ্রিলে আমি জানতে পারি আমার করোনা টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ ধরা পড়েছে। আক্রান্তের সংবাদে আচমকা আতঙ্কে অনেক ভয় পেয়েছিলাম। আসলে কিভাবে আমি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছি তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। তবে আমি মনে করি, কোথাও আমার কোনো অসচেতনতা বা অসাবধানতার কারণেই তা হয়েছে।

বহুমাত্রিক.কম: কিভাবে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান হয়?

সাজিদ হাসান কামাল: আসলে এটা অনুমান করে বলা কঠিন। তবে দূর-দূরান্তের যাতায়াত একেবারেই করিনি। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এলাকার বাহিরেও যাইনি। লালবাগ এমনিতেই জনবহুল জায়গা। এখন পর্যন্ত লালবাগে অন্তত আড়াই শ’ জন আক্রান্ত। 

বহুমাত্রিক.কম: পরীক্ষায় পজেটিভ আসার পরের অনুভূতিগুলো কেমন ছিল?

সাজিদ হাসান কামাল: গত ২৪ এপ্রিল চাঁদরাতে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে ইফতারের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার নাম্বারে মেসেজ আসে আমার করোনা পজিটিভ। পরক্ষণেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করলে সে আমার শারীরিক অবস্থান জেনে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেন। আমি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে একটি রুমে আইসোলেটেড হয়ে যাই। নিমিষেই ঈদের আনন্দ হারিয়ে বিষাদে ভরে উঠে আমার চারপাশ। মা ও পরিবারের সকলের চোখ টলমল করছে। হঠাৎ মেঘে ঢাকা ঘুটঘুটে আঁধারের সম্মুখে দাঁড়াবার জন্যে আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। বারবার বুকের বামপাশে আনমনা ব্যথায় ছটফট করছিল। স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের আড়ালে কিভাবে নিঃশব্দে দম বন্ধ হয়ে আসে তা ওইদিন খুব কাছ থেকে বুঝতে পেরেছিলাম। খবরটা মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়লে মুঠোফোনে কল ও অনলাইনে নক দিয়ে অনেকেই আমার সাথে কথা বলেন। সকলের সমবেদনা ও উৎসাহ আমার শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। সকল অহেতুক চিন্তাভাবনাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে মনোযোগ দিলাম মনোবল বৃদ্ধিতে। একমাত্র মনের শক্তির মাধ্যমেই জয় করা সম্ভব বিষাক্ত করোনা ভাইরাসকে। একটি ঘরের মধ্যে বন্ধি হয়ে ১৪ দিন কাটানো খুব কষ্টকর। সন্তানদের বুকে না নেওয়ার ব্যথা, দূর থেকে মায়ের মলিন মুখের দিকে তাকাতে না পারার কষ্ট, ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত দগ্ধ করেছে আমাকে। মুক্ত আকাশ, লোকালয়, পরিচিত মুখ ও পথঘাট আবার দেখতে পারবো কিনা এমন অনেক সংশয়ে সবসময় মানসিক চাপ সহ্য করা খুব কঠিন হয়ে উঠতো। তবু, বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিলাম দৃঢ়প্রত্যয়ী। এককথায় একেবারে ত্যক্ত অনুভূতির ভিতরেও আমি নিজের প্রতি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।

বহুমাত্রিক.কম: যেসকল পীড়া অনুভব করেছিলেন-

সাজিদ হাসান কামাল: জ্বর, ঠান্ডা, মাথা ব্যথা, বুক ব্যথা, সারাশরীরে ব্যথাসহ বেশকিছু পীড়াদায়ক যন্ত্রণায় ছিলাম তিন থেকে চারদিন। তবে যন্ত্রণা একেবারে অসহ্য ছিলো না, সহ্য করতে পারতাম। প্রতিদিন গরম জল দিয়ে গোসল করতাম। এক পোষাক একদিনের বেশি পড়তাম না। সম্পূর্ণ রুমকে দিনে দুইবার পরিস্কার করে নিতাম। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ফ্লোর মুছে নিতাম। কোন কিছু ধরার ক্ষেত্রে প্রতিবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতাম। বিভিন্ন সমস্যায় মাঝেমধ্যে খুব ভয় পেয়ে যেতাম। তবে, খুব দ্রুতই আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তাই, খুব একটা শারীরিক পীড়নে পড়িনি।

বহুমাত্রিক.কম: চিকিৎসকের পরামর্শ নেন কখন?

সাজিদ হাসান কামাল: আমার করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে তা জানার সাথে সাথেই আমি চিকিৎসকের পরামর্শ নেই। হোম কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলোতে আমি একবারই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলাম। এবং নিজেই নিজের চিকিৎসক হিসেবে সবসময় নিজেকে সঠিক পর্যবেক্ষণে পরিচালনা করার চেষ্টায় ছিলাম। যেহেতু, করোনাভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ভ্যাক্সিন নেই যা সেবনের মাধ্যমে মানুষ সুস্থ হবে সেহেতু সাধারণ নিয়মগুলোকে সবসময় খুব বেশি মনোযোগে চিকিৎসকের পরামর্শ মনে করে মেনে চলেছি। নিজেকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তাঁর পক্ষে অসাধ্যকে সাধ্য করা কষ্টকর হলেও সম্ভব।

বহুমাত্রিক.কম : কী ব্যবস্থাপত্র ও অনুশাসন দিয়েছিলেন চিকিৎসক?

সাজিদ হাসান কামাল: চিকিৎসক D-rise, zithrox, napa, xinc, cavic c মেডিসিনের বাহিরে আর কোন মেডিসিন তাঁর পরামর্শ ব্যতীত নিতে নিষেধ করেছিলেন। আমি মোট ২৪০ টাকার ওষুধ সেবন করেছি। যদি শারীরিক অবনতি হয় তাহলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। আমার নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুকে সকলের সংস্পর্শের বাহিরে রাখার অনুশাসন করেছিলেন। পাশাপাশি লেবুর রস, গরম পানি, গরম দুধ, কালোজিরা, রসুন, লং ও আদা চা বেশিবেশি খেতে বলেছিলেন। যেগুলো খুব বেশি কাজ করে করোনা থেকে উদ্ধার হতে। একটি পাত্রে আদা, রসুন, লং দিয়ে জল গরম করে তোয়ালে দিয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে দিনে দুইবার সেই জলের ভাপ দিতে হয়। করোনা গলাতে অবস্থান করলে এইসকল গাইডলাইনের কারণে তা ফুসফুসে যেতে না পেরে পেটে চলে যায়৷ আর পেটের ভিতরে যে এসিড আছে তাতে করোনা ভাইরাস নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এতে করে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে আতঙ্কিত না হয়ে সকল দুঃশ্চিন্তা বাদ দিয়ে মনোবলকে শক্তিশালী করে এইসকল কাজগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারলে করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব। আমি নিজের উপরে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং জয়লাভের আকাঙ্খায় প্রাণপণ লড়াই করেছি।

বহুমাত্রিক.কম: আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়ার পরবর্তী দিনগুলির উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা যদি বলেন-

সাজিদ হাসান কামাল: করোনায় আক্রান্ত নিশ্চিত হওয়ার পরে একটি রুমে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে যাই আমি। তখন খুব মনে পড়ে, রুদ্র’দার (রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্) অমৃত বাণী- ‘আমি সেই অনিচ্ছা নির্বাসন বুকে টেনে নেয়া ঘোলাটে চাঁদ!’ যে কথাটি বাস্তবিক অর্থে আমার সাথে একেবারে মিলে গিয়েছিল। একাকিত্বের যন্ত্রণার মাঝে সুস্থ হওয়ার ব্যাকুলতায় প্রায়ই খুব বেশি ছটফট হয়ে পড়তাম। আবার প্রিয় মানুষগুলোর মাঝে ফিরে যাবার জন্যে উদগ্রিব হয়ে থাকতাম। মাঝেমধ্যে শারীরিক যন্ত্রণায় মনে হতো হয়ত আর আমি বাঁচবো না। পরক্ষণেই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সাহসী চিত্তে বই পড়ে, গান শুনে এবং প্রিয়জনদের সাথে অডিও-ভিডিও কলে কথা বলে সময়টিকে উপভোগ করতাম। এভাবেই কেটেছে বাঁধভাঙা কান্না জড়িত দিনগুলোর মাঝে কিছুটা হাসোজ্জ্বল মুহূর্তের অন্বেষণে। যখন খুব বেশি খারাপ লাগতো তখন নেতাজি ও নজরুল জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা মনে করে মনের শক্তি সঞ্চয় করেছি। পাশের রুম থেকে প্রায়ই সন্তানদের কাছে আসার আবদার আমাকে অন্যমনস্ক করে তুলতো। দূর থেকে ওদেরকে দেখে তৃপ্তি খোঁজার মধ্যে যে অতৃপ্তির অনুভূতি অন্তরকে দগ্ধ করেছিল তা ভাষায় বোঝানো মুশকিল। যাপিত যন্ত্রণার মাঝে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছি। এভাবেই কেটেছে আমার কোয়ারেন্টাইন সময়।

বহুমাত্রিক.কম: পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ দুরত্ব কিভাবে নিশ্চিত করেছেন?

সাজিদ হাসান কামাল: আমার পরিবারের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। যখন আমার করোনা ধরা পড়েছে তখন সর্বপ্রথম আমার স্ত্রী সায়মা আক্তারকে জানাই। ও খুব কষ্ট করেছে আমার এই হোম কোয়ারেন্টাইন সময়ে। তারপরে পরিবারের সবাইকে নমুনা পরীক্ষা করতে বলি, কিন্তু কারো কোন লক্ষণ না থাকায় টেস্টের ব্যাপারে কেউই আগ্রহ প্রকাশ করেননি। আমিও সকলের স্বাভাবিক সুস্থতার কারণে খুব একটা জোর দেইনি। যেহেতু, আমার পজিটিভ ধরা পড়েছে তাই মুহূর্তের মধ্যেই পরিবারের সকলের সাথে দূরত্ব তৈরী করেছি। আমরা শেষ রোজার ইফতারে বসে আযানের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। আযানের আগেই এই দুঃসংবাদ পৌঁছার কারণে আর ইফতার করা হয়নি একসাথে বসে। কারণ আমি বরাবরই সচেতন। আমার দ্বারা আমার পরিবারের কেউ যেন আক্রান্ত না হয় সেদিকে আমি খুব মনোযোগী ছিলাম। ছোট ছেলে সাফিদ হাসান সিফাত কাছে আসার জন্যে বড্ড বিরক্ত করতো। খুব খারাপ লাগা সত্ত্বেও সকল আবেগ ও মায়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছি আমার সন্তান ও আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। এভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলোতে আমি পারিবারিক দূরত্ব তৈরী করে চলেছি।  

বহুমাত্রিক.কম : ওষুষের সঙ্গে খাদ্য তালিকায় কী কী ছিল?

সাজিদ হাসান কামাল: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যে ঔষধ সেবন করেছি তার নাম আগেই বলেছি। ওষুধ  আমার খুব একটা খেতে হয়নি। কারণ, দৈহিক অসুস্থতার দরুণ তেমন ছিলো না। মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বাভাবিক থেকে স্বাভাবিক সকল খাবারই খেয়েছি। চিকিৎসকের পরামর্শে শুধু ঠান্ডা পানি ও ঠান্ডা জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। আমিও তা শতভাগ মেনে চলেছি। প্রচণ্ড গরমের ভিতরেও গরম পানি পান করেছি। খাবারের তালিকায় চিকিৎসক তেমন কোনো পরিবর্তন না আনলেও আমি কিছুটা পরিবর্তন এনেছিলাম। সকালে কিছুই খেতাম না, মাঝেমধ্যে হালকা খাবার খাওয়া হতো। দুপুরে কখনো ভাত, মাছ, কখনো ভাত, মাংস বা সবজি দিয়ে ভরপেট খেয়েছি। সারাদিনে ৮-১০ গ্লাস গরম পানি খেয়েছি। গরম পানি দিয়ে গলগলা কুলি করেছি দিনে কয়েকবার। রঙ চা`র পাশাপাশি খাদ্য তালিকায় লেবুর রস ছিল প্রচুর পরিমাণ। বিকেলে কলা ও মাল্টা খাওয়া হতো। এরপরে রাতে দুধ দিয়ে পাউরুটি বা বিস্কুট ভিজিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। তেমন কোনো পরিবর্তন ছাড়া এই খাবার গুলোই নিয়মিত ছিল আমার খাদ্য তালিকায়। অতিরিক্ত খাবার শরীরের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে বলে মনে করে খুব কম খাবার চেষ্টা করেছি।

বহুমাত্রিক.কম:  সেরে উঠতে শুরু করেন কবে থেকে? পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার পরের অনুভূতি জানাবেন-

সাজিদ হাসান কামাল:  আক্রান্ত হওয়ার ৪-৫ দিনের মধ্যেই আমি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করেছি। তবুও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ১৪ দিন আইসোলেটেড হয়ে থেকেছি। ১৪ দিন পরে যখন আমি দ্বিতীয়বার নমুনা পরিক্ষা করতে যাই তখন নিজের প্রতি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখে হাসতে হাসতে বলছিলেন- "আপনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। টেস্ট না করালেও চলবে।" আমিও প্রাণখোলা হাসি হেসে বললাম-‘তারপরেও আমার আত্মতুষ্টি খুব জরুরি। আর টেস্ট বহির্ভূত দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলাফেরা করা আমার জন্যে মোটেও স্বস্তিদায়ক ও সুখকর হবে না।’

তারপর টেস্ট করিয়ে বাসায় চলে এসে আবার হোম কোয়ারেন্টাইন হয়ে গেলাম। কারণ, এখনো আমার সুস্থতার সনদ হাতে আসেনি। তাই, অজানা আতঙ্ক থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারছিলাম না। দু`দিন পরে মোবাইলে মেসেজ আসলো আমার করোনা নেগেটিভ। সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে আমার চেয়ে আনন্দিত হয়ত আর কেউ ছিলো না। অদ্ভুত জীবনের করুণ বাস্তবতায় সুসংবাদের চেয়ে দুঃসংবাদে ঘিরে রাখে আমায় সর্বদা। করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত হওয়া মানে মৃত্যুর থেকে মুক্তি পাওয়া নয়। তবে এবারের মতো বেঁচে যাওয়াটা ছিল সত্যিই খুব আনন্দদায়ক। এরচেয়ে সুখী ও আনন্দিত মুহূর্ত আমার জীবনে কখনো আসেনি। সন্তানদের বুকে জড়িয়ে এতোটা সুখ আমি কখনো পাইনি সেদিন যে সুখ আমি পেয়েছিলাম। মায়ের মুখে সন্তানের সুস্থতার বিজয়িনী হাসিতে বিশ্ব জয়ের আনন্দ-আবেগে উদ্বেলিত হয়ে পড়েছিলাম। পরদিন আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত করে এসে আমি দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিকভাবে কর্মব্যস্ততায় যোগদান করেছিলাম।

বহুমাত্রিক.কম: করোনাজয়ী একজন হিসেবে আক্রান্ত অন্যদের প্রতি কী পরামর্শ বা অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন-

সাজিদ হাসান কামাল: বর্তমান বিশ্ব স্মরণকালের বৃহৎ সংকটের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। করোনার প্রভাবে পৃথিবী আজ নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মহামারী করোনা ভাইরাস দূরীকরণে মানুষ ব্যাপক পরিশ্রম করে চলেছে। এমন মহামারী পৃথিবীতে বহুবার এসেছে, প্রতিবারই মানুষ জয়লাভ করেছে। এবারও করবে এমনটাই আশা করছি।

একজন করোনাজয়ী হিসেবে আক্রান্ত অন্যদের উদ্যেশ্যে আমি বলতে চাই, মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমেই করোনা জয় করা সম্ভব। আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। গরম পানি ও গরম খাবারের পাশাপাশি উপরে আমি যে মেডিসিন ও খাবারের কথাগুলো বলেছি তা নিয়মিত খাওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মধ্যদিয়ে করোনাকে জয়লাভ করা সম্ভব। আক্রান্ত হওয়ার পরে একদম ভেঙে পড়া যাবে না। প্রতি মুহূর্তে হৃদয়ে জয়লাভের দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক গাইডলাইন ও সাবধানতার মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সম্ভব। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আক্রান্ত সকলের উদ্যেশ্যে আবারও বলছি, কোয়ারেন্টাইন সময়ে অবসাদকে বাদ দিয়ে দুঃশ্চিন্তা মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। পারিবারিক দূরত্ব তৈরী করে চলুন। ডাক্তারের পরামর্শ ও পাশাপাশি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে করোনা জয়ে সাহসী ও সংগ্রামী হয়ে উঠুন। করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া একজন বিজয়ী যোদ্ধা হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আপনারাও সুস্থ হয়ে উঠবেন।

বহুমাত্রিক.কম : জীবনের এই যুদ্ধজয়ে কেমন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন? নূতন স্চিারিত এই অভিজ্ঞতাকে কিভাবে কাজে লাগাবেন?

সাজিদ হাসান কামাল: জীবনের এই যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে খুব সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখি। সুন্দর ও ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজানোর জন্যে নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। অন্তরের হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শ্রেণি- বিন্যাসের ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্য সম্পর্ক করে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে মনুষ্যত্ব অর্জন ব্যতীত আর কোনো অর্জনে পৃথিবীকে অধিক লাভবান করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র মনুষ্যত্বের দ্বারা মানব সেবার মাধ্যমেই জগতের কল্যাণ সাধন সম্ভব। ভোগে নয় ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে জীবনকে উপভোগ করতে হবে। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়- তাই আমাদের স্বদিচ্ছায় সম্ভব পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরে সুস্থ হওয়ার এই অভিজ্ঞতাকে আমি করোনায় আক্রান্ত মানুষের সেবায় ব্যবহার করতে চাই। আমার প্লাজমা দানের মাধ্যমে অসুস্থ কেউ সুস্থ হলে তা হবে আমার আরো একটি বিজয়। সবসময় একজন সেবক হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। সেবার মাঝে আপন সত্ত্বাকে খুঁজে নিতে চাই।

সাজিদ হাসান কামাল সম্পর্কে

সাজিদ হাসান কামালের জন্ম রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ থানার শহীদ নগরে। তাঁর পৈতিক নিবাস মুন্সিগঞ্জে। মরহুম এম. এ. মোতালেব ও মোসাঃ হাজেরা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান সাজিদ। 

বাবা ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। মূলত বাবার কাছ থেকেই তিনি কবিতা আবৃত্তি ও কবিতা লেখার উৎসাহ অর্জন করেন। পিতামাতার নবম সন্তানের মধ্যে সাজিদ হাসান কামাল সর্বকনিষ্ঠ। ছিলেন সকলের বেশ আদরের। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে শিখেছেন কিভাবে জীবনে বিপুল অর্থের মোহ ত্যাগ করে মাথা উঁচু করে অতি সাধারণ জীবনযাপন করা যায়। ছেলেবেলায় খুব উন্মাদনা ও বাউন্ডেলে চলাফেরার জন্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বেশিদূর অগ্রসর করতে পারেননি। কিন্তু, কবিতা ও সাহিত্যের মাঝে বিচরণ তাঁর সর্বদা। গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ‘করুণ চোখের চাওয়া’। 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।