Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৬ কার্তিক ১৪২৭, বুধবার ২১ অক্টোবর ২০২০, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপে দখলদারদের আগ্রাসন


৩০ আগস্ট ২০২০ রবিবার, ১২:৪৯  এএম

সাজিদ হাসান কামাল

বহুমাত্রিক.কম


ইতিহাসের ধ্বংসস্তুপে দখলদারদের আগ্রাসন

ঢাকা: কয়েক শতাব্দির বেদনাবিদূর ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন বহন করে চলা ঐতিহাসিক জিনজিরা প্রাসাদ নিয়ে অনুসন্ধিৎসুদের আগ্রহের কমতি নেই। বাংলার মুগল সুবাদার দ্বিতীয় ইবরাহিম খানের (১৬৮৯-১৬৯৭) প্রমোদকেন্দ্র এই প্রাসাদ পরবর্তীকালের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে যে পরম্পরা বয়ে এনেছে তা সমকালেও চর্চিত হচ্ছে, আমাদের করছে পল্লবিত। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নৃপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার করুণ পরিণতির পর তাঁর হতভাগ্য পরিবারের সদস্যদের মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরের জিনজিরা প্রাসাদে অন্তরীন রাখা হয়। প্রাসাদের প্রতি ধুলিকণায়, ছত্রে ছত্রে ইতিহাসের করুণ আখ্যান। তবে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্বিক গুরুত্ব সত্ত্বেও এই স্থাপনার যথাযথ সংরক্ষণে নজর দেয়নি কর্তৃপক্ষ। জবরদখলের আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে থাকা জিনজিরা প্রাসাদের বর্তমান অবস্থা সরেজমিন ঘুরে এসে তারই অনুপুঙ্খ বর্ণনা তুলে ধরছি পাঠকদের জন্য।   

জিনজিরা প্রাসাদের এখনকার জরাজীর্ণ রূপ

সম্প্রতি জিনজিরা প্রসাদ দর্শনের তিক্ত ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা মেলে ধরার আগে বলে রাখা ভালো, পুরান ঢাকায় আশৈশব বেড়ে উঠা আমি পূর্বেও এই অঙ্গনে পা রেখেছি; তবে তা অবচেতনে, নিছক বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে। স্থাপনাটির প্রকৃত গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক মূল্য অনুধাবনের পর এই প্রথম তা চাক্ষুষ করতে এসে বিস্তর বাধা পাই। তবে নাছোড়াবান্দা আমি প্রাসাদ দর্শনের ব্যাকুল আকাঙ্খা থেকে পিছ পা হয়নি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জিনজিরা প্রাসাদে প্রবেশ করা সহজ কাজ নয়-বুঝতে পারলাম। প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর আগেকার এই স্থাপনায় সম্ভাব্য সব ঝুঁকি নিয়েই এগুতে হয় আমাদের। 

২৩ আগস্ট রোববার বিকাল তিনটায় সদরঘাট থেকে বন্ধু জুয়েল হাসানকে নিয়ে রওনা হই বেদনাসিক্ত সেই স্মৃতিচিহ্নের খোঁজে। ওয়াইজঘাট থেকে ট্রলারে করে মাত্র ১৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম জিনজিরা ঘাটে। জনপ্রতি ১৫ টাকা ট্রলার ভাড়ায় সোয়ারীঘাট থেকে নৌকায় করে জিনজিরা ঘাটে এসে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন আরেক বন্ধু আব্দুল্লাহ্ আল মাসুম। ওর তথ্যমতে, সোয়ারীঘাট থেকে জিনজিরা ঘাটে আসার জন্যে রিজার্ভ নৌকা ভাড়া ২০ টাকা। পুরনো ও বিশ্বস্ত দুই বন্ধুকে পেয়ে আরও সাহস সঞ্চয় হল। জিনজিরা ঘাটে মসজিদের পাশে একটি ছোট্ট সেতু। আমরা সেখানে একটি চায়ের দোকানে বসেছি চা পান করতে।

এখানে ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানানো হয় না। প্রতি পদক্ষেপে হুমকি আর ভীতি প্রদর্শন 

কিন্তু স্রেফ চা পান নয়, জিনজিরা প্রাসাদে পৌঁছানোর রাস্তার খোঁজ করাও উদ্দেশ্য। চায়ের কাপে দু’চুমুক দিয়েই আমি দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলাম- ‘জিনজিরা প্রাসাদে যাবো কীভাবে?’ দোকানি বললেন, ‘চিনি না।’ আমারো মনে হলো সে চিনে না। এরপর আমরা কয়েকজন রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জিনজিরা প্রাসাদ যাবেন?’ কোন রিকশাওয়ালা বলতে পারলেন না ও যেতেও চাইলেন না। নিরুপায় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে মাসুম গুগল ম্যাপে সার্চ করে। গুগল ম্যাপ দু’মিনিটের পথ বলে যেভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে আমরা সেভাবে হেটে চললাম। আমি জানতাম দু’মিনিটের পথই হবে। কারণ, ইতিহাস এমনভাবেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। জিনজিরা ঘাটের নদী তীরে তৈরী করা হয়েছিল জিনজিরা প্রাসাদ। সে মোতাবেক আমরা ঠিক জায়গাতেই আছি। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে যত্রতত্র ঘনবসতি ও অনেক রাস্তাঘাট হয়ে এলাকা পৃথক হয়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট স্থান মানে জিনজিরা প্রাসাদ খুঁজে পাওয়া খুব কষ্টকর হয়ে পড়ল।

প্রশাসনের দায়সারা সাইনবোর্ড ঢেকে গেছে লতা-গুল্মে 

একসময় বুঝতে পারলাম, গুগল ম্যাপের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জিনজিরা প্রাসাদ খুঁজে বের করা সম্ভব না। এমন সময় হাওলি এলাকার দেখা মিলল। তারমানে ইতিহাসের খুব কাছাকাছি আমরা। কারণ, ইতিহাসে জিনজিরা প্রাসাদকে ‘হাওলি নগেরা’ বা ‘হাবেলি নগেরা’ বলা হয়ে থাকে। আমরা যতই কাছাকাছি যাচ্ছি ততই অজানা আতঙ্ক ও ভয় চেপে ধরছে। অপরিচিত পরিবেশে অনভিজ্ঞতায় ভুগতে ভুগতে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম আমরা। কিন্তু, সংক্ষিপ্ত বিশ্রামের জন্যেও কিঞ্চিৎ পরিমাণ সময় ব্যয় করতে চাইলাম না। কারণ, সূর্যাস্তের পূর্বেই আমাদেরকে এই এলাকা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। অন্ধকার মোটেও মঙ্গলজনক হবে না আমদের জন্য। এখানে যারাই এসেছে তাদেরকে খুব ভুগতে হয়েছে। যা হোক, জিনজিরা প্রাসাদকে স্বচক্ষে দেখার ব্যাকুলতায় হেটে চললাম সম্মুখে৷ কী ঘটবে তা পরে দেখা যাবে। আমাকে ইতিহাসের সামনে দাঁড়াতে হবে- এটাই এখন মূল ভাবনা।

একসময় জিনজিরায় যাতায়াত ছিল। প্রায় ১৫-১৭ বছর আগে ছাটগাঁও, চড়াইল, হাওলি, বন্দ ডাকপাড়া, কালিন্দী, নেকরোজ বাগ এলাকায় খেলাধুলা ও আড্ডার উদ্দেশ্যে আমি বহুবার এসেছি। এখন পথঘাটের পরিবর্তনের ফলে কিছুই চিনে উঠতে পারছি না। তখন হাওলিসহ অনেক এলাকার নাম জানতাম না শুধুমাত্র কয়েকবার এই পথ দিয়ে গিয়েছিলাম। হুট করে মনে পড়লো সেই সময়কার এক বন্ধুর কথা। এতোদিন পরে ওদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে বের করা সম্ভব না।

এই সেই হাম্মামখানা। জৌলুস হারিয়ে এখন এই রূপধারণ করেছে

তা সত্বেও, আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নিলাম, জিনজিরা প্রাসাদ খুঁজে বের করার আগে সেই বন্ধুর বাড়ি খুঁজে বের করবো। এই কেরানীগঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন আমি তার বাড়ি খুঁজে বের করবোই- এমন আত্মবিশ্বাসে খুঁজতে শুরু করলাম। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুজির কারণে বিভিন্ন পথে ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিতে অনেকেই আমাদেরকে সন্দেহের চোখে মাপতে শুরু করে দিলো। অনেকের এমন আচরণ ও চাহনিতে আমরা কৌশল পরিবর্তন করে নিলাম। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করার চেয়ে আমি স্মৃতির কপাট খুলে পথ মিলাতে থাকলাম। তারপর খুঁজে পেলাম সেই বাড়ি। দূর থেকে বাড়িটিকে আগের মতোই দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু, বাড়ির চারপাশের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে।

বাসা থেকে ওকে ডেকে আনার জন্যে একটি কিশোর ছেলের সাহায্য নিলাম। ছেলেটির সাথে ও বাইরে আসার সাথে সাথে আমাকে নাম ধরে ডেকে জড়িয়ে ধরলো, আমিও নাম ডেকে জড়িয়ে ধরলাম। দীর্ঘ অনুপস্থিতির অতৃপ্ত চাহনির তৃষ্ণা নিবারণে দু’জন দু’জনকে কিছুক্ষণ দেখে নিলাম। তারপর, বন্ধু জুয়েল ও মাসুমের সাথে বন্ধুর পরিচয় করিয়ে দিলাম। সময় খুবই কম। তাই, চা পর্ব বাদ দিলাম। বন্ধুকে সবকিছু খুলে বললাম। ওই সবকিছু শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রাসাদ দর্শন থেকে আমাকে বিরত হতে বলল। 

তবে কোনো কিছু আমলে না নিয়ে তাকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম। তারপর ৪ বন্ধু মিলে রওনা দিলাম সেই কাঙ্খিত গন্তব্যে। কিছুটা ভয়, কিছুটা উন্মাদনা নিয়ে ছুটে চলেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চলে এলাম জিনজিরা প্রাসাদের টিকে থাকা তিন খণ্ড অস্তিত্বের এক খণ্ডে। ছোট্ট একটি চিপা গলি দিয়ে এই খণ্ডে প্রবেশ করতে হবে। স্থানীয় বন্ধুটি ভিতরে গিয়ে বাড়ির লোকের সাথে কথা বললেন। কিছুক্ষণ পরে সে বাহিরে এসে বলল, ‘শুধুমাত্র আমি একা প্রবেশ করতে পারবো। তিন জনের প্রবেশ করা সম্ভব না।’ আমরাও আর এই বিষয়ে কোনো কথা বাড়ালাম না। ও যতটুকু করেছে এটাই অনেক। আমি ওর সাথে রওনা দিলাম। ভিতরে প্রবেশ করতেই এক মধ্যবয়সী লোককে (স্থানীয় দখলদার কেউ হবেন) দেখে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, ‘খুব দ্রুত যেন চলে যাই। আর ছবি তুলতে নিষেধ করলেন। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে উনার কথায় সম্মতি জ্ঞাপন করলাম। কিন্তু, তাতে কী! ছবি যে আমাকে তুলতেই হবে। তা যেকোনো পন্থায় হোক।

এবার আমি এক নজরে জিনজিরা প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধতা ও বিষন্নতায় হারিয়ে গেলাম নির্মম ইতিহাসে। মেলাতে পারছিলাম না ইতিহাসের সেই প্রাসাদকে। যেকোনো সময় বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসতে পারে- তাই আবেগকে সংযত করে সময়কে কাজে লাগানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ভিতরে প্রবেশ করে বুঝতে পারছি টিকে থাকা তিন খণ্ডের এই খণ্ডটি হচ্ছে হাম্মাম খানা। পরিত্যক্ত হাম্মাম খানার ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইলের আলোতে দেখতে হচ্ছে। আলোর জন্যে মোবাইল হাতে রাখার সুযোগে ছবি তোলা সহজ হয়েছিল। বাহির থেকে একজন বৃদ্ধ মহিলা উচ্চস্বরে জানাচ্ছেন, ‘এখানে যারা ঢুকেছে তাদের অনেকে মারা গিয়েছে। অনেকে বাকশক্তি হারিয়ে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছে। সাপ ও ভূতের আক্রমণে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি যেন খুব দ্রুত বের হয়ে আসি’ ইত্যাদি। কথাগুলো শোনার পরে খুব ভয় পেয়ে গেলাম; তবে ভূতের নয় সাপের। এখানে যে সাপ আছে তা নিশ্চিত বুঝতে পারছি। কিন্তু, কিছুই করার নেই। ভয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে চললাম ইতিহাসের খোঁজে। সাপ বা যেকোনো কিছুর আক্রমণে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে তাই বিন্দুমাত্র বেখেয়ালি মনোভাব বাদ দিয়ে অত্যন্ত সচেতনতা অবলম্বন করে আরো ভিতরে প্রবেশ করছি।

অন্ধকারে হাতপা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলো। পায়ের নিচের মাটি প্রতি কদমে ডেবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টির পানি জমে আছে। যদি আমি ডেবে যাই তাই বেশিদূর আগে বাড়লাম না। মোবাইল ফোনে সামনে এগিয়ে নিয়ে সবটুকু জায়গার ছবি নিয়ে নিলাম। হাম্মাম খানার পাশেই ছিল বিশ্রাম খানা। সেই কক্ষটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। এবার সিড়ি দিয়ে উপরে যাচ্ছি। সিড়িটি পরবর্তীতে করা হয়েছে ছাদকে ব্যবহারের জন্য। ছুয়ে ছুয়ে দেখলাম সবকিছু। স্পর্শের অনুভবে মনে হচ্ছিল- এই দেয়ালের সব জায়গায় নবাবের পরিবারের স্পর্শ রয়েছে। আমি যেন তাদের অশান্ত চিত্তকে কিছুটা পরশ বুলাতে স্পর্শ করে যাচ্ছি। ছাদে একজন কাপড় রোদে দিচ্ছিলেন। তিনি আমাকে ছবি তুলতে কোনো বাধা দিলেন না। খুবই আন্তরিক। শুধু দ্রুত বের হতে বললেন। আমি তাদের এমন আচরণে স্পষ্ট বুঝতে পারছি এরা কেউই দখলদার নয় এরা ভাড়াটিয়া। মহিলাটি আমাকে জানালেন- ওই পাশে যে বাড়িটি দেখতে পাচ্ছেন ওইখানে বন্দী ছিল বাংলার শেষ নবাবের বংশধরেরা।

ইতিহাসের প্রতি চরম উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ। 

উনার আরো কিছু তথ্যের সাথে চোখের আন্দাজে আমি ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্যার মতে হাম্মাম খানার আয়তন আয়ত্তে নিয়ে নিলাম। ঢাকাতে মুঘল সাম্রাজ্যের দু’টি হাম্মাম খানার অস্তিত্ব টিকে আছে। একটি লালবাগ কেল্লায় আরেকটি এই জিনজিরা প্রাসাদে। জিনজিরা প্রাসাদের হাম্মাম খানা পূর্ব-পশ্চিমে ৭৪ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে ৩৮ ফুট। এই হাম্মামের ছাদ গম্বুজ আকৃতির। হাম্মামের ভিতরে রয়েছে কিছু কিছু ছিদ্রের চিহ্ন। যা সূর্যের আলো প্রবেশের জন্যে রাখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

অন্যান্য হাম্মামের মতোই এখানে রয়েছে সদর কক্ষ, বিশ্রাম কক্ষ, স্নান কক্ষ, গরম পানি সংরক্ষণ কক্ষ, কোষাধন কক্ষ ইত্যাদি। স্নান কক্ষের যে অংশটুকু টিকে আছে তার আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ১৫ ফুট পূর্ব-পশ্চিমে ১২ ফুট। হাম্মামের বিশ্রামাগারের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ২৪` ৯" পূর্ব-পশ্চিমে ১৩ ফুট। কক্ষটি এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে তাই ছাদে এই কক্ষের অংশটুকু সিমেন্ট দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। এবার আমাদের বের হতে হবে। কারণ, আরো দু`টি খণ্ড এখনো বাকি রয়েছে। আবার কখন এরাই বা ক্ষেপে উঠে। সময়তো অনেকটা গড়িয়ে গেলো। আমরা হাম্মাম খানা থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম নবাবের পরিবার যেই কক্ষে বন্দী ছিলেন সেখানে। দুই থেকে তিন মিনিট হেটে পৌঁছে গেলাম। এখানে একই হাল, কোনো ক্রমে একা প্রবেশের অনুমতি পেলাম। বাড়িটিতে মোট চারটি কক্ষ এর যেকোনো একটিই সুড়ঙ্গ পথের দ্বার। যা এখন আর সনাক্ত করা সম্ভব না। অন্যান্য কক্ষগুলোতেই বন্দী ছিলেন নবাবের মা, স্ত্রী ও কন্যা।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপেক্ষিত। জরাজীর্ণ প্রাসাদ

যেন এখনো বন্দীদের অশান্ত অন্তরের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। সেদিনের বন্দীদের মতো আজ এই বন্দীশালা নিজেই মুক্তির ফরিয়াদ করছে। খুব দ্রুত আমাদের এখান থেকে বের হতে হলো। বাইরে থেকে ভবনটি দেখে মনে হচ্ছে খুব দ্রুতই ভবনটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বহুতল ভবনের মোড়কে। পৃথিবীর ঐতিহাসিক নিদর্শন বিবেচনায় ঢাকা কোনো অংশে কম নয়। নিদর্শনগুলোর অস্তিত্ব যদি না থাকে তাহলে আর কী থাকবে আমাদের অস্তিত্বে।

এবার চললাম আমরা তৃতীয় খণ্ডে, মানে জিনজিরা প্রাসাদে প্রবেশের মূল দরজার যে অংশটুকু টিকে আছে সেখানে। এই অংশটুকুতে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় বন্ধু আমাকে আবারও নিষেধ করল। কারণ, ধ্বংসস্তূপের এই অংশটুকু যাদের দখলে তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। আমি অনেক অনুনয় বিনয় করে তাকে রাজি করিয়ে রওনা দিলাম। দুই মিনিটের পথ হেটে চলে এসেছি জিনজিরা প্রাসাদের প্রবেশ দ্বারে। এই গেইট দিয়ে প্রবেশ করেছেন ইতিহাসের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ। আজ সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে গেলাম। দরজার প্রত্যেকটি ইট যেন ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। তিনতলা থেকে একজন মহিলা আমাকে ধমকের সুরে বলল, ‘এই তুমি এখানে ছবি তুলছো কেন? তোমাকে এখানে কে ঢুকতে দিয়েছে? তুমি কী কলকাতার লোক নাকি সাংবাদিক? এখানে প্রবেশের সাহস হলো কীভাবে?’ এমন সময় বন্ধুটি কাছে গিয়ে বলল, ‘আমিই নিয়ে এসেছি। কোনো সমস্যা নেই। আমার খুব ভালো বন্ধু।’ সুন্দর করে বোঝানোর পরেও ওই নারী যাচ্ছেতাই নোংরা ভাষা ব্যবহার করে কথা বলতে শুরু করলো।

তাদের কথোপকথনের ফাঁকে মূল দরজায় প্রবেশ করে গেটের আয়তন বুঝে নিলাম। দরজাটি আনুমানিক ১০ স্কয়ার ফিট। এমন সময় উপর থেকে একজন ভদ্রলোক অত্যন্ত ক্ষোভে’র বশে নিচে নামতে শুরু করলো। বন্ধু বলল, ‘চলো এবার আমরা বের হয়ে যাই।’ আমিও আর এক সেকেন্ড সময় নিলাম না। দু’জনে বেরিয়ে পড়লাম। খুব দ্রুত আমরা হাওলি এলাকা ত্যাগ করে জিনজিরা বাজারের সামনে একটি বহুতল শপিংমলের সামনে এসে দাড়িয়ে চা খাওয়ার জন্যে বসলাম। তখন জানতে পারলাম এই মার্কেটটিও জিনজিরা প্রাসাদের জায়গায় নির্মিত। দখলদারেরা এতোই প্রভাবশালী যে, একারণে কারো পক্ষে কিছু বলা সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রাসাদের মালিক ও তত্ত্বাবধায়ক পরিবারের পূর্বপুরুষ হাজী ওয়াজিউল্লাহ্ ব্রিটিশ আমলে ১৪ শতক জমি সাব-কবলা মূলে খরিদসূত্রে মালিক। ওয়ারিশ সূত্রে বর্তমান মালিক ও পরিবার প্রধান জাহানারা বেগম। হাজী ওয়াজিউল্লাহ্ ছিলেন জাহানারা বেগমের শশুর।

ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সংরক্ষণে আইন থাকলেও এভাবেই বেহাত হচ্ছে জিনজিরা প্রাসাদ

এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে জিনজিরা প্রাসাদ গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন-শোষণের সূচনালগ্নে জিনজিরা প্রাসাদকে ঘিরে যে বিয়োগান্ত ঘটনা পরবর্তীকালে মানুষের মনে রেখাপাত করে আছে তা পরম্পরায় আজও আমাদের নাড়া দেয়। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় জিনজিরা প্রাসাদের যেটুকু ধ্বংসাবশেষ টিকে রয়েছে তা সংরক্ষণে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এখনো।

আমরা জানি, জিনজিরা প্রাসাদ নিয়ে প্রতিবেদন করতে সরেজমিন অনেক গণমাধ্যমকর্মী একাধিকবার হুমকি ও হামলার সম্মুখীন হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে, ভাঙচুর করা হয়েছে ক্যামেরা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কয়েকটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য অন্যতম আগ্রহের এই স্থাপনাটিকে ঘিরে যে সম্ভাবনা রয়েছে সরকার তা কাজে লাগাতে পারছে না। ২০১৮ সালে সরকার জিনজিরা প্রাসাদ সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় দখলদারদের দৌরাত্ম্যে ও অদৃশ্য প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে তা এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। 

ঐতিহাসিক পরম্পরা

জিনজিরা প্রাসাদের নির্মম ইতিহাস বাদ দিয়ে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নৃপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার করুণ পরিণতি বা পলাশী ট্রাজেডি পূর্ণতা পায় না। ১৭৫৭ সালে ভাগীরথীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পরে নবাবের হতভাগ্য পরিবারকে এই প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়। নবাব আলিবর্দি খাঁ’র স্ত্রী সরফ-উন-নিসা বেগম, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মা আমিনা বেগম, স্ত্রী লুৎফ-উন-নিসা বেগম, কন্যা উম্মে জোহরা এবং ইতিহাসের কলঙ্কিত নারী কুচক্রী খালা ঘসেটি বেগমকে জিনজিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

মুর্শিদাবাদে ভাগীরথীর তীরে খোশবাগের যাওয়ার নির্দেশক

বাংলা মুক্তবিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া জানাচ্ছে, জিনজিরা প্রাসাদ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাওলি এলাকায় অবস্থিত। জিনজিরা শব্দটি আরবী শব্দ জাজিরার অপ্রভংশ। যার অর্থ হচ্ছে আইল্যান্ড বা দ্বীপ। অনেকের মতে, ভৌগোলিক অর্থে জিনজিরা বুড়িগঙ্গার মধ্যে একটি প্রাচীন দ্বীপ ছিল। মতান্তরে, ১৬৮৯-৯০ খ্রিস্টাব্দে মুগল সুবাদার নবাব দ্বিতীয় ইব্রাহীম খাঁ জিনজিরা প্রাসাদ ‘নওঘরা’ নির্মাণ করেন। ঢাকার সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ইব্রাহীম খাঁ কাষ্মীরের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাঘ শিকার ও পশু শিকারে পারদর্শী ছিলেন।

এক ইংরেজ ব্যবসায়ীর ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৬৯০ সালের ৪ই ডিসেম্বর ইংরেজ ব্যবসায়ীদের সাথে জিনজিরা প্রাসাদে সুবেদার ইব্রাহীম খাঁ একটি ব্যবসায়ীক আলাপ আলোচনা করেন। ১৬৮৯ সালের জুলাই মাসে ৬৯ বছর বয়সে তিনি বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। সেই মোতাবেক ধারণা করা যায়, তিনি এক বছরের মতো সময় নিয়ে নদী তীরে এই প্রাসাদটি তৈরী করেছিলেন।

এখানেই শায়িত বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নৃপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা

জিনজিরা প্রাসাদের নির্মাণ শৈলী বড়কাটরার আদলে গড়া হলেও এর আয়তন ছোটকাটরার চাইতেও কম। এই প্রাসাদ মুঘল সাম্রাজ্যের সুনিপুণ কারুকাজ শৈলীর অনন্য নিদর্শন ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা এই জায়গাটিকে `হাবেলি নগেরা` বা `হাওলি নগেরা` বলে। হাবেলি শব্দের অর্থ দেয়াল আর নগেরা শব্দটি `নওঘরা` শব্দের বিকৃত রূপ। ধারণামতে, `নওঘরা` শব্দটি `নগেরা` বলে উচ্চারিত হচ্ছে। তৎকালীন সময়ে সুবেদার ইব্রাহীম খাঁ বুড়িগঙ্গা নদীর উপর দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ ও পারাপারের জন্য একটি কাঠের সেতু তৈরী করেন।

১৭০২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজধানী মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নিয়ে যান। ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ মুর্শিদাবাদে চলে যান। তারপর কিছুদিন হোসেন কুলি খাঁ এখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তারপরে তিনিও চলে যান। এর ফলে জিনজিরা প্রাসাদে বসবাস বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে পরে থাকতে থাকতে প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হতে শুরু করে।

নবাব আলীবর্দি খাঁ’র কাছে পরাজিত হয়ে নবাব সরফরাজ খানের পরিবার নির্বাসিত এই জিনজিরা প্রাসাদে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! পরবর্তীতে নবাব আলীবর্দি খাঁ`র বংশদেরকে এই প্রাসাদে বন্ধি জীবনযাপন করতে হয়। নবাব আলীবর্দি খাঁ`র শাসনামলে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা একবার জিনজিরা প্রাসাদে এসেছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, জিনজিরা প্রাসাদের যেকোনো একটি কক্ষে ছিল সুড়ঙ্গ পথ। সেই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে আসা যেতো লালবাগ কেল্লায়। বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ পথে যাতায়াত করতেন। ইতিহাসের এই অংশটুকু আমার কাছে একেবারেই অলৌকিক এবং অসম্ভবপ্রায় মনে হয়। কারণ, বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ পথ তৈরী করা এবং সে পথে যাতায়াত করে নদী পারাপার সত্যিই খুব বিস্ময়কর। আবার লালবাগ কেল্লায় আমরা যে সুড়ঙ্গ পথ দেখতে পাই তা কিন্তু বুড়িগঙ্গা বরাবর জিনজিরা প্রাসাদের দিকেই দিক নির্দেশনা দেয়। জিনজিরা প্রাসাদের ভগ্নাংশের ধ্বংসস্তূপে মূল দরজার ভিতরে যে চারটি কক্ষের নামমাত্র চিহ্ন দেখে উপলব্ধি করা যায় এর যেকোনো একটি সুড়ঙ্গ পথের কক্ষ ছিল। তাও লালবাগ কেল্লার দিকেই দিক নির্দেশনা দিয়ে আসছে। এসব থেকে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়, সত্যিই কোনো এক অজানা শতশত বছর ধরে রহস্য এখনো লুকিয়ে আছে।

১৭৫৪ সালে হোসেন কুলি খাঁকে হত্যা করার পরে তাঁর পরিবারকে জিনজিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হলে নবাবকে হত্যার পরে তাঁর পরিবারকে এই প্রাসাদে ৮ বছর বন্দী করে রাখা হয়। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের কুপুত্র মীরন মুর্শিদাবাদ থেকে নিয়ে এসে জিনজিরা প্রাসাদে তাদেরকে বন্দী করে রাখে।

অন্য স্বজনদের পাশে শায়িত হতভাগ্য নাবাব সিরাজ-উদ-দৌলা

সত্যতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও জনশ্রুতি রয়েছে, কোনো বেগমকে হত্যা করা যাবে না-লর্ড ক্লাইভের এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বাসঘাতক মীরন নতুন ছক তৈরী করলেন। ১৭৬০ সালে জমাদার বকর খাঁকে দিয়ে নবাবের মা আমেনা বেগম ও পলাশী যুদ্ধের আরেক চক্রান্তকারী ঘষেটী বেগমকে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ডুবিয়ে মারা হয়।

যদিও ঐতিহাসিক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’ শীর্ষক আকরগ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগমকে জলে ডুবিয়ে হত্যা করার কাহিনির সত্যতা নিয়ে সঠিকভাবে কিছু বলা কঠিন। কারণ, মুর্শিদাবাদ শহরের কাছে ভাগীরথী নদীর তীরে ‘খোশবাগ’ নামক স্থানে সবাব আলিবর্দি খানের সমাধিসৌধে মোট যে আটটি কবর আছে, সেগুলো স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয় এভাবে: সমাধিসৌধের কেন্দ্রন্থলে নবাব আলিবর্দি খানের কবর। এই কবরের বাম পাশে পুব দিকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার কবর, সিরাজ-উদ-দৌলার কবরের বাম পাশে সিরাজের কনিষ্ঠ ভ্রাতা মির্জা মেহদির কবর। নবাব আলিবর্দি খানের কবরের নিচের দিকে (দক্ষিণ দিকে) তাঁর মহিষী শরফ-উন-নিসা বেগমের কবর। সিরাজের কবরের নিচের দিকে সিরাজের মহিষী লুৎফ-উন-নিসা বেগমের কবর। মির্জা মেহদির কবরের দক্ষিণ দিকের কবরটিকে তাঁর স্ত্রীর কবর বলা হয়ে থাকে।’’

‘‘মুর্শিদাবাদে প্রচলিত প্রবল জনশ্রুতি মতে, আলিবর্দি খানের কবরের ডান দিকের কবরটি তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগমের এবং ডান পাশের কবরটি আমিনা বেগমের। সিয়ার  এর মত অনুসারে বুড়িগঙ্গা নদীতে যদি তাঁদের ডুবিয়ে মারা হয়েই থাকে, তবে সেখানে তাদের ভেসে ওঠা পচা-গলা লাশ মুর্শিদাবাদে আনা সম্ভব ছিল না’’ (মেহের-উন-নিসা ওরফে ঘসেটি বেগম: নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, পৃষ্ঠা ১৯১)   

এদিকে, মৃত্যুর পূর্বে সিরাজ জননী আমিনা বেগম ঘাতক মিরনকে বজ্রাঘাতে মৃত্যুবরণের অভিশাপ করেছিলেন বলে যে জনশ্রুতি শোনা যায়, সেবিষয়ে অনেক ঐতিহাসিক ভিন্নমত পোষণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেইসময়কে ধারণ করে রচিত অন্যতম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’ রচয়িতা সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ি ইংরেজদের আনুগত্য করতে গিয়ে ফরমায়েশি ইতিহাস লেখেন। যাতে অসংখ্য কল্পিত কাহিনি সন্নিবেশিত হয়েছে। পরবর্তীকালের বহু ঐতিহাসিক তুলনামুলক গবেষণা ও প্রামাণ্য তথ্যের আলোকে সেইসব কল্পিত কাহিনিকে নস্যাৎ করেছেন। পরবর্তীতে মীরনের মৃত্যু বজ্রাঘাতে হয়েছিল এমন দাবিও প্রমাণিত হয়নি। তবে মীরনকে যে করুণ মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিল তাতে কোনো দ্বিমত নেই।

খোশবাগে নবাব আলিবর্দি খান ও নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাসহ স্বজনদের সমাধিসৌধ

পরবর্তীতে ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের হস্তক্ষেপে ১৭৬৫ সালে নবাবের স্ত্রী ও কন্যাকে জিনজিরা প্রাসাদ থেকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সামান্য ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। ৮ বছরের কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে জীবনের বাকী দিনগুলো নবাবের স্ত্রী লুৎফ-উন-নিসা বেগম মুর্শিদাবাদে কাটিয়ে দেন। জীবদ্দশায় অত্যন্ত কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমান, লান্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল। নবাবের কবরের পাশে বসেই কেটে যেতো তাঁর দিনের অনেকটা সময়। ১৭৯০ সালে লুৎফ-উন-নিসা বেগম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি কিছুটা তৃপ্তি পেয়েছিলেন পলাশী যুদ্ধের অনেক চক্রান্তকারীর মর্মান্তিক মৃত্যু দেখে। পাপের বোঝায় মুখ লুকাতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন ক্লাইভ। ক্লাইভের আত্মহত্যার খবরে নবাবের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা বেগম পশ্চিমাকাশে মুখ তুলে বহুদিনের দমবন্ধ চিত্তে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন।

কালের বিবর্তনে সভ্যতার পরিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছে অনেক কিছু। ইতিহাসের যে স্থানগুলো আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে দিনের পর দিন অবহেলায়, অযত্নে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়া হয়েছে। জিনজিরা প্রাসাদকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে বাংলার ইতিহাসের এক বিরাট অধ্যায়ের সঙ্গে প্রজন্মের প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটতে পারতো।

লেখক: কবি 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।